যুক্তরাষ্ট্রের নতুন করে আরোপ করা শুল্কের জবাবে প্রতিশোধ (রিটালিয়েশন) হিসেবে দেশটির পণ্যের ওপর সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ পর্যন্ত পাল্টা শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছে কানাডা। আগামী ৮ সেপ্টেম্বর থেকে এসব শুল্ক কার্যকর হওয়ার কথা রয়েছে।
মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) কানাডা সরকার জানায়, প্রায় ২ হাজার ৮০০ কোটি কানাডিয়ান ডলার (প্রায় ২ হাজার কোটি মার্কিন ডলার) মূল্যের মার্কিন পণ্য এই পাল্টা শুল্কের আওতায় আসবে। ইস্পাত থেকে শুরু করে আসবাবপত্র, তাজা টুনা মাছ ও কটন টি-শার্টসহ বিভিন্ন মার্কিন পণ্যে এ শুল্ক কার্যকর হবে।
কানাডা জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র যেসব কানাডীয় পণ্যের ওপর শুল্ক আরোপ করেছে, তার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই পাল্টা শুল্কের তালিকা তৈরি করা হয়েছে। দেশটির অর্থমন্ত্রী ফ্রাঁসোয়া-ফিলিপ শ্যাম্পেন বলেন, মার্কিন শুল্কের কারণে কানাডার শ্রমিক, ব্যবসা ও বিভিন্ন কমিউনিটি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই এর জবাব দেওয়া প্রয়োজন।
কানাডার পাল্টা শুল্ককে ‘কৌশলগত’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন শ্যাম্পেন। একইসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত শুল্কের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও শ্রমিকদের সহায়তায় অতিরিক্ত ৭৫০ কোটি কানাডিয়ান ডলার দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন তিনি। এসব অর্থ কর্মসংস্থান হারানোর ঝুঁকি কমানো এবং প্রতিষ্ঠানগুলোকে টিকিয়ে রাখতে বিভিন্ন সহায়তা কর্মসূচিতে ব্যয় করা হবে।
গত সপ্তাহে কানাডার বিভিন্ন পণ্যে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপ করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এর আগে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পর নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়। আলোচনার ভেস্তে যাওয়ার জন্য ওয়াশিংটন ও অটোয়া একে অপরকে দায়ী করেছে।
কানাডার পাল্টা পদক্ষেপে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও উত্তপ্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। কয়েক দশক ধরে গড়ে ওঠা সরবরাহব্যবস্থায় অতিরিক্ত ব্যয় বাড়তে পারে। এর প্রভাব ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি সাধারণ ভোক্তাদের ওপরও পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এদিকে কানাডার সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি শুল্কযুদ্ধ নিয়ে দেশটির ব্যবসায়ী মহলে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। বিভিন্ন জনমত জরিপে দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়ার পক্ষে অধিকাংশ কানাডীয় নাগরিকের সমর্থন রয়েছে। তবে বাণিজ্য আলোচনা ঠিক কী কারণে ভেঙে পড়ল, তা নিয়ে এখনো প্রশ্ন রয়েছে। বিরোধী কনজারভেটিভ পার্টি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে হওয়া প্রস্তাবিত চুক্তির খসড়ার পূর্ণাঙ্গ পাঠ প্রকাশের দাবি জানিয়েছে।
এদিকে কানাডার ব্যবসায়ী মহলেও উদ্বেগ বাড়ছে। দেশটির সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি বাণিজ্যযুদ্ধ হলে ব্যবসা-বাণিজ্যে বড় ধরনের ক্ষতি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।
কানাডার পাল্টা শুল্ক ঘোষণার পর হোয়াইট হাউস দাবি করেছে, সাম্প্রতিক আলোচনায় কানাডাকে অত্যন্ত সুবিধাজনক বাজার-সুবিধা দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। তবে কানাডা সেই সুযোগ গ্রহণ না করে ‘অযৌক্তিক দাবি’ ও প্রত্যাখ্যানের পথ বেছে নিয়েছে বলে অভিযোগ করেছে ওয়াশিংটন।
মঙ্গলবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যাল-এ ধারাবাহিক পোস্টে কানাডার বিরুদ্ধেও তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন ট্রাম্প। তিনি অভিযোগ করেন, কয়েক দশক ধরে কানাডা যুক্তরাষ্ট্রকে ‘ঠকিয়ে আসছে’ এবং মার্কিন কৃষকদের ওপরও ব্যাপক শুল্ক আরোপ করছে।
ট্রাম্প লেখেন, ‘আমি অনেক দেশের সঙ্গে কাজ করি, কিন্তু কানাডাই সবচেয়ে কঠিন ও অযৌক্তিক। তারা নিজেদের বিশেষ অধিকারপ্রাপ্ত মনে করে। কিন্তু তারা কোনো অঙ্গরাজ্য নয়, তাই আর তাদের সেই অধিকারও থাকবে না।’
এমনকি যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার সীমান্তবর্তী গ্রেট লেকসের অন্যতম লেক অন্টারিওর নাম পরিবর্তন করে ‘লেক আমেরিকা’ রাখার ইঙ্গিতও দিয়েছেন ট্রাম্প। এক পোস্টে তিনি লিখেছেন, ‘অন্টারিওর সঙ্গে আমরা আর খুব বেশি ব্যবসা করার প্রত্যাশা করছি না।’
এরই মধ্যে কানাডা থেকে আমদানি করা গাড়ির ওপর আগামী বছরের ১ জানুয়ারি থেকে শুল্ক ৫০ শতাংশে উন্নীত করার হুমকি দিয়েছেন ট্রাম্প। জবাবে কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি অভিযোগ করেছেন, কানাডার গাড়ি, ইস্পাত ও অ্যালুমিনিয়াম শিল্পকে দুর্বল করাই যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশ্য।
জবাবে কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি অভিযোগ করেন, ট্রাম্পের লক্ষ্য কানাডার শিল্পখাত ধ্বংস করা। বিশেষকরে দেশটির গাড়ি উৎপাদন, ইস্পাত ও অ্যালুমিনিয়াম শিল্পকে লক্ষ্য করে যুক্তরাষ্ট্র চাপ সৃষ্টি করছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
দুই দেশের নেতাদের পাল্টাপাল্টি বক্তব্যে সোমবার পরিস্থিতি বেশ উত্তপ্ত হয়ে উঠলেও পরেরদিন কিছু কর্মকর্তা তুলনামূলক কূটনৈতিক অবস্থান নেন। এতে আবারও আলোচনার টেবিলে ফেরার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
সোমবার এক সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্পকে ‘পরাজিত’ বলে মন্তব্য করেছিলেন অন্টারিওর প্রিমিয়ার ডগ ফোর্ড। তবে মঙ্গলবার সিএনএনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি স্বীকার করেন, পরিস্থিতি কিছুটা উত্তপ্ত হয়ে উঠেছিল।
ফোর্ড বলেন, ‘আমরা একটি চুক্তি করতে চাই—যে চুক্তি আমেরিকান জনগণের জন্য ভালো হবে, কানাডীয়দের জন্যও ভালো হবে।’
নতুন এই বাণিজ্য বিরোধে উত্তর আমেরিকার মুক্তবাণিজ্য কাঠামো নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র ও মেক্সিকোর মধ্যে কার্যকর ইউএসএমসিএ চুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
অন্যদিকে কানাডার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পর পরিস্থিতি নিয়ে ওয়াশিংটনের সঙ্গে আলোচনায় বসতে মেক্সিকোর অর্থমন্ত্রী মার্সেলো এব্রার্ডকে পাঠিয়েছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট ক্লডিয়া শেইনবাম।

