জানাজায় সুরতহালের সময় হামলা

গুরুদাসপুরের ২ শতাধিক গ্রামবাসীর বিরুদ্ধে পুলিশের মামলা

আপডেট : ২৮ আগস্ট ২০২৬, ১১:৪৪

নন্দকুঁজা নদীতে ডুবে মারা যাওয়া দুই শিশুর সুরতহাল প্রতিবেদন প্রস্তুতের সময় হামলার শিকার হন পুলিশের দুই সদস্য। ওই দুই পুলিশ সদস্যকে ঘটনার রাতেই প্রত্যহারের পর এবার ২৭০ গ্রামবাসীর বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছে পুলিশ।

সরকারি কাজে বাধাদানের অভিযোগ এনে বুধবার (২৬ আগস্ট) মধ্যরাতে গুরুদাসপুর থানায় মামলাটি দায়ের করেন থানার উপপরিদর্শক (এসআই) এমদাদুল হক।

ওই মামলার এজাহারে উপজেলার নাজিরপুর ইউনিয়নের ওয়াপদা বাজার এলাকার ২০ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে আরো ২৭০ জন গ্রামবাসীকে। মামলায় সরকারি কাজে বাধা দিয়ে পুলিশের ওপর হামলার অভিযোগ করা হয়েছে।

তবে এই মামলায় এখনো কেউ গ্রেপ্তার হয়নি। মামলাটির তদন্তভার দেওয়া   হয়েছে থানার উপপরিদর্শক মো. রাকিবুল ইসলামকে।

মামলা দায়েরের বিষয়টি নিশ্চিত করে বাদি গুরুদাসপুর থানা পুলিশের উপপরিদর্শক এমদাদুল হক বলেন, দায়িত্ব পালনের সময় পুলিশের ওপর হামলা ও সরকারি কাজে বাধা দেওয়া হয়েছে। বিষয়টি পুলিশের স্বাধীন আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে চরম হুমকির। প্রকৃত অপরাধীরা যেন পার না পায় সে জন্য উর্ধতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা মোতাবেক মামলা দায়ের করা হয়েছে।

পুলিশের দায়ের করা এই মামলায় দুটি অভিযোগ তুলে ধরা হয়। বলা হয়-২৫ আগস্ট এক সঙ্গে দুই শিশু নন্দকুঁজা নদীর পানিতে ডুবে মারা যায়। ওইদিন সন্ধ্যার দিকে গুরুদাসপুর উপজেলার চন্দ্রপুর ইউনিয়নের শ্যামপুর গ্রামে দুই শিশুর সুরতহাল প্রতিবেদন প্রস্তুত করতে যান এসআই আবুল বাশার ও কনস্টেবল আবু রাকিব। প্রথমে নিহত শিশু লামের বাড়িতে গিয়ে মরদেহের সুরতহাল প্রতিবেদন প্রস্তুত করা হয়। এরপর নিহত শিশু ফরহানের সুরতহাল তৈরি করতে চন্দ্রপুর ওয়াপদা বাজারসংলগ্ন ঈদগাহ মাঠে যান। সেখানে ওই শিশুর মরদেহেরও সুরতহাল প্রতিবেদন প্রস্তুত করা হয়। এরপর ওই মাঠে এক সঙ্গে দুই শিশুর জানাজা অনুষ্ঠিত হয়।

পুলিশের দাবি- জানাজা শেষে আইনি প্রক্রিয়া মেনে লিখিতভাবে দুই শিশুর মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করতে চেয়েছিল পুলিশ। একই সঙ্গে বিষয়টি লিখতভাবে থানায় অবহিত করার কথা বলেন এসআই আবুল বাশার। তবে এই প্রস্তাবে রাজি না হয়ে উপরন্তু পুলিশের ওপর চড়াও হন গ্রামের মানুষ জন। মুহূর্তেই পুরো পরিস্থিতি পুলিশের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। এক পর্যায়ে পরিস্থিতি বেগতিক হওয়ায় পুলিশের দুই সদস্য  স্থানীয় একটি দোকানে আশ্রয় নেন। ওই দোকান ঘিরে একদল লোক অশ্লীল ভাষায় গালিগালাজ করতে থাকেন। ঘন্টাখানেক অবরুদ্ধ থাকার পর রাত আটটার কিছু পরে দোকান থেকে বেরিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। এ সময় এক আসামি বাঁশের লাঠি দিয়ে এসআই আবুল বাশারের মাথায় আঘাত করেন। আঘাতে তিনি গুরুতর আহত হন। পরে অন্য আসামিরা বাঁশের লাঠি, কাঠের বাটাম ও লোহার রড দিয়ে পুলিশের ওপর হামলা চালান। এতে দুই পুলিশ সদস্য আহত হন।

অভিযোগে আরো বলা হয়- এক পর্যায়ে পুলিশ সদস্যরা স্থানীয় একটি মাদ্রাসায় আশ্রয় নেন। সেখানে গিয়েও হামলাকারীরা পুলিশের ওপর চড়াও হন। খবর পেয়ে অতিরিক্ত পুলিশ গিয়ে আহত দুই পুলিশ সদস্যকে উদ্ধার করে। রাতেই তাদের গুরুদাসপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়।

ফারহান ইসলাম (৮) চন্দ্রপুর গ্রামের ফজলুর রহমানের ছেলে ও লাম ইসলাম একই গ্রামের বাবুল ইসলামের ছেলে। তারা দু'জনেই চন্দ্রপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী।

স্থানীয়রা জানান, ফারহান ও লাম দুপুরে খাওয়ার পর নদী তীরের আমবাগানে খেলা করছিল। খেলার ছলে নন্দকুঁজা নদীর কিনারায় গোসল করতে নামে তারা। দুই জনারই কেউই সাঁতার জানত না। নদীর স্রোতে তারা দুই জনই তলিয়ে যায়। নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে থাকা এক ব্যক্তি শিশু দুটিকে তলিয়ে যেতে দেখে চিত্কার করতে থাকেন। কিছু সময় পরে দুই শিশু পানিতে ভেসে ওঠে। আশপাশের লোকজন তাদেরকে উদ্ধার করে নাটোর জেনারেল  হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে কর্তব্যরত চিকিত্সক দুই শিশুকেই মৃত ঘোষণা করেন।

এদিন সন্ধ্যায় দুই শিশুর মরদেহ গ্রামের ওয়াপদা বাজারসংলগ্ন ঈদগাহ মাঠে নেওয়া হয়। সেখানে জানাজার প্রস্তুতি চলছিল। ওই জানাজায় স্থানীয় বিএনপির নেতা ইউপি চেয়ারম্যান প্রার্থী সামসুল হকসহ গ্রামের বিপুলসংখ্যক মানুষ উপস্থিত ছিলেন।

বিএনপি নেতা সামসুল হক জানান, জানাজার প্রস্তুতির সময় দুই পুলিশ সদস্য সেখানে গিয়ে সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরির জন্য মরদেহ দুটি থানায় নিতে চান। একপর্যায়ে মৃতদেহের ওপর থেকে কাফনের কাপড় সরিয়ে অনাবৃত করা হয়েছে—এমন অভিযোগ করেন উপস্থিত কয়েকজন। পুলিশের এমন আচরণে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন জানাজায় উপস্থিত লোকজন।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, এক সঙ্গে দুই শিশুর অকালমৃত্যুতে পরিবার ও গ্রামজুড়ে শোকের ছায়া নেমে আসে। ফলে পুলিশের ওপর বিক্ষুব্ধ হন এলাকার মানুষ। তাছাড়া দুই শিশুর মরদেহ নিয়ে পুলিশের প্রশ্ন বিদ্ধ তৎপরতায় পরিস্থিতি জটিল আকার ধারণ করে। একপর্যায়ে উত্তেজিত কয়েক ব্যক্তি দুই পুলিশ সদস্যের ওপর চড়াও হয়ে কিল-ঘুষি ও ইটপাটকেল নিক্ষেপ করেন।

বুধবার রাতে মামলার নথিভুক্ত হওয়ায় ওয়াপদা বাজার, শ্যামপুর ও আশপাশের কয়েকটি গ্রামের মানুষের মধ্যে গ্রেপ্তার আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। গ্রেপ্তার এড়াতে গ্রামগুলো পুরুষশূন্য হয়ে পড়েছে বলে স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন।

তারা মামলাটিকে হয়রানিমূলক উল্লেখ করে বলেন, দুই পুলিশ সদস্য সুরতহাল প্রতিবেদনের নামে মৃতদেহের সঙ্গে অমানবিক আচরণ করেন। এ জন্য জানাজায় অংশ নেওয়া প্রায় দেড় হাজার মানুষ ক্ষুব্ধ ছিলেন। সঠিক তদন্ত ছাড়া গণহারে গ্রামবাসীকে আসামি করা উদ্বেগজনক।

নাজিরপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আয়ুব আলী বলেন, পুলিশের ওপর হামলার ঘটনাটি খুবই দুঃখজনক। তবে বিপুল সংখ্যক অজ্ঞাত নাম রেখে এজাহার দায়ের হওয়ায় গ্রামবাসীও চরম আতঙ্কে রয়েছেন। জনপ্রতিনিধি হিসেব তার দাবি-প্রকৃত অপরাধীরা আইনের আওতায় আসুক। কোনো নিরাপরাধ ব্যক্তি যেন হয়রানির শিকার না হন।

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা মো. রাকিবুল বলেন, দায়িত্ব পাওয়ার পর তিনি ইতিমধ্যে মামলার তদন্ত শুরু করেছেন। এই মামলায় পুলিশ কোনো নিরাপরাধ মানুষকে হয়রানি করবে না বলেও তিনি আশ্বস্ত করেন।

গুরুদাসপুর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আব্দুল হান্নান বলেন, পুলিশের পক্ষ থেকে যে মামলাটি দায়ের করা হয়েছে তাতে অন্যায়ভাবে কাউকে গ্রেপ্তার বা হয়রানি করা হবে না। সুনির্দিষ্ট তথ্য-উপাত্ত যাচাই-বাছাই করে ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ইত্তেফাক/এএইচপি