চারদিকে নদীঘেরা, চরাঞ্চল সমৃদ্ধ ও বছরে ৪ শতাধিক মানুষ সাপে কাটার শিকার চাঁদপুরের সেই মতলব উত্তর উপজেলায় বিষধর সাপে কাটা রোগীদের অ্যান্টিভেনম কেনার জন্য উপজেলা থেকে বরাদ্দের তিন লাখ টাকার বেশি গায়েব হওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে।
আর এই অভিযোগ খোদ মতলব উত্তর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মাহবুবুর রহমানের বিরুদ্ধে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বছরে দুই শতাধিক সাপে কাটা রোগী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা নিতে আসেন এমন তথ্যের ভিত্তিতে দৈনিক ইত্তেফাকের অনলাইনে ২০২৫ সালের ২ সেপ্টেম্বর একটি সংবাদ প্রকাশিত হয়। পরে সংবাদটি উপজেলা নির্বাহী অফিসার মাহমুদা কুলসুম মনির নজরে আসে।
সংবাদ প্রকাশের জেরে বিষয়টি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে এর সত্যতা নিশ্চিত হলে তিনি দ্রুত উপজেলা পরিষদ থেকে ৩ লাখ টাকা বরাদ্দ দেন সাপে কাটা রোগীদের ভ্যাকসিন অ্যান্টিভেনম কেনার জন্য। দ্রুত সময়ের মধ্যে টাকা পাওয়ার জন্য উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. মাহবুবুর রহমানের নামেই চেকটি বরাদ্দ হয়।
পরে ১২ অক্টোবর উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. মাহবু্বুর রহমানের নামে সাপে কাটা রোগীদের ভ্যাকসিন কেনার চেকটি বুঝে নেওয়া হয়। সোনালী ব্যাংক, ছেংগারচর বাজার শাখার সেই চেক নম্বর- ৮৬২৫৮৩৯১২১০২৫। অন্যদিকে, ২০২৫ সালের ১০ সেপ্টেম্বর ২ লাখ ৯০ হাজার টাকার সাপে কাটা রোগীদের ভ্যাকসিন অ্যন্টিভেনম কেনার রশিদও জমা দেন উপজেলা পরিষদে।
এমনকি উপজেলা নির্বাহী অফিসার মাহমুদা কুলসুম মনিকে সঙ্গে নিয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. মাহবুবুর রহমান সাপে কাটা রোগীদের ভ্যাকসিন অ্যান্টিভেনম বেশকিছু বাক্স সামনে রেখে ফটোসেশনও করেন। এরপর ২০২৬ সালের ৩ মার্চ ডা. মাহবুবুর রহমান এই কর্মস্থল থেকে বদলি হয়ে লক্ষ্মীপুরের ৫০ শয্যা বিশিষ্ট কমলনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যোগদান করেন।
এ বিষয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের হিসাব রক্ষক আনোয়ার হোসেনের সঙ্গে কথা হলে তিনি জানান, উপজেলা পরিষদ থেকে সাপে কাটা রোগীদের ভ্যাকসিন কেনার জন্য যে ৩ লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে সেই চেক উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. মহবুবুর রহমান স্যারের নামের চেক। উপজেলা থেকে বরাদ্দকৃত ৩ লাখ টাকায় কোনো ভ্যাকসিন কেনা হয়নি। এমনকি আমাদের হাসপাতালে অ্যাকাউন্টেও জমা হয়নি।
অন্য এক প্রশ্নের জবাবে হিসাবরক্ষক আনোয়ার হোসেন জানান, উপজেলা নির্বাহী অফিসার স্যারকে হাসপাতালে এনে ডা. মাহাবুবুর রহমান স্যার সাপে কাটা ৩০ ভায়াল ভ্যাকসিন সামনে রেখে ছবি তুলেন। ৩০ ভায়ালে ৩ ডোজ। এই ভ্যাকসিনগুলো আমাদের হাসপাতালের রানিং ক্যাশ থেকেই কেনা হয়। ডা. মাহাবুব স্যারের নির্দেশে এই টাকা রানিং ক্যাশ থেকে আমিই দিয়েছি। যা অফিশিয়াল রেকর্ডেও লিপিবদ্ধ রয়েছে।
অন্যদিকে, সোনালী ব্যাংক ছেংগারচর বাজার শাখায় হাসপাতালের অ্যাকাউন্টে উল্লেখযোগ্য পরিমাণের কোনো টাকা জমা হওয়ার তথ্য ও প্রমাণাদিও নেই ।
বর্তমান উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. রাজন কুমার দাসের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে মুঠোফোনে কথা হলে তিনি জানান, এতো টাকার ভ্যাকসিন কেনার কোন তথ্য আমাদের হাসপাতালের নথিতে নেই। এমনকি পূর্ববর্তী স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. মাহবুবুর রহমান সাহেব আমাকে নগদ কোনো টাকাও বুঝিয়ে দিয়ে যাননি। উপজেলা পরিষদ থেকে ভ্যাকসিন কেনার জন্য বরাদ্দকৃত ৩ লাখ টাকার বিষয়ে এর বেশি কিছু আমার জানা নেই।
এ বিষয়ে গত ২৬ আগস্ট বুধবার ও ২৯ আগস্ট অভিযুক্ত সাবেক উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. মাহবুবুর রহমানের মুঠোফোনে (০১৭১২-০৭...) নম্বরে বেশ কয়েকবার ফোন করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি। এতে অভিযোগের প্রেক্ষিতে তার বক্তব্য জানা যায়নি।
উপজেলা পরিষদের প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী অফিসার মাহমুদা কুলসুম মনি বলেন, আপনার কাছ থেকে (ইত্তেফাক প্রতিবেদকের) মৌখিকভাবে জানার পর আমি উপজেলা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে গত এক সপ্তাহ ধরে যোগাযোগ করেও এর সদুত্তর পাইনি। বাধ্য হয়েই আমাকে পরবর্তী ব্যবস্থায় যেতে হচ্ছে।
চাঁদপুরের সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ নুর আলম দীন জানান, আমি মতলব উত্তর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এ বিষয়ে এখনই যোগাযোগ করছি, অভিযোগ প্রমাণিত হলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

