হাইকোর্টের রায়

জব্দ করা পচনশীল খাদ্যশস্য থানায় ফেলে রেখে নষ্ট করার সুযোগ নেই

আপডেট : ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:২১

মজুতদারির অভিযোগে জব্দ করা পচনশীল খাদ্যশস্য দীর্ঘদিন থানায় ফেলে রেখে নষ্ট করার কোনো আইনি সুযোগ নেই বলে পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন হাইকোর্ট। আদালত বলেছেন, আইনি প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হওয়ার কারণে পচনশীল ভোগ্যপণ্য নষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকলে তা এভাবে পুলিশ হেফাজতে রেখে দেওয়ার কোনো যুক্তিসংগত উদ্দেশ্য নেই।

নওগাঁয় মজুতদারির অভিযোগে জব্দ করা ২৫ টন চালের মালিকানা নিয়ে নিম্ন আদালতের আদেশের বিরুদ্ধে করা ফৌজদারি রিভিশনের পরিপ্রেক্ষিতে জারি করা রুল যথাযথ ঘোষণা করে দেওয়া পূর্ণাঙ্গ রায়ে হাইকোর্ট এ পর্যবেক্ষণ দেন। 

‘মো. শিবলু হোসেন বনাম রাষ্ট্র’ মামলায় গত ১৯ আগস্ট বিচারপতি মো. খায়রুল আলম ও বিচারপতি মো. রাফিজুল ইসলামের হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রায় দেন। রায়ের অনুলিপি মঙ্গলবার (১ আগস্ট) গণমাধ্যমের হাতে এসেছে। রায়টি লিখেছেন বিচারপতি মো. খায়রুল আলম।

রায়ে আদালত বলেছেন, ২০২৫ সালের জুলাই থেকে দীর্ঘ এক বছরেরও বেশি সময় ধরে এসব চাল থানা হেফাজতে অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। পচনশীল ভোগ্যপণ্য দীর্ঘদিন এভাবে ফেলে রাখা কোনো যুক্তিযুক্ত উদ্দেশ্যে ব্যবহার হতে পারে না। এতে রাষ্ট্র বা ব্যক্তি কারও লাভ নেই। রায়ে আদালত নওগাঁয় জব্দ করা ওই ২৫ টন চালের প্রয়োজনীয় নমুনা রেখে অবশিষ্ট চাল ১৫ লাখ টাকার বন্ডে আসামি (আবেদনকারীর) জিম্মায় দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।

মামলার পটভূমি

মামলার বিবরণ থেকে জানা যায়, ২০২৫ সালের ৩ জুলাই গোপন সংবাদের ভিত্তিতে নওগাঁর বদলগাছী উপজেলার খাদ্য নিয়ন্ত্রক মো. মিজানুর রহমানের নেতৃত্বে অভিযান চালানো হয়। এ সময় মো. জাহিদুল ইসলামের বাড়ি থেকে অবৈধভাবে মজুত করা ২৫ হাজার কেজি বা ২৫ মেট্রিক টন কাটারি আতপ চাল উদ্ধার করা হয়। ৫০০ বস্তায় থাকা ওই চালের আনুমানিক বাজারমূল্য ছিল ১৫ লাখ টাকা।

পরদিন ৪ জুলাই বদলগাছী থানায় ‘খাদ্যদ্রব্য উৎপাদন, মজুত, স্থানান্তর, পরিবহণ, সরবরাহ, বিতরণ ও বিপণন (ক্ষতিকর কার্যক্রম প্রতিরোধ) আইন, ২০২৩’-এর ৩(ঘ) ও ৪ ধারায় শিবলু হোসেন ও জাহিদুল ইসলামের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়।

পরে মামলাটি বিচারের জন্য নওগাঁর তৃতীয় যুগ্ম জেলা জজ আদালতে স্থানান্তর করা হয়। তদন্ত চলাকালে শিবলু হোসেন জব্দ করা চালের প্রকৃত মালিক দাবি করে তা নিজের জিম্মায় দেওয়ার আবেদন করেন।

তদন্ত কর্মকর্তা ২০২৫ সালের ১৮ জুলাই আদালতে দেওয়া প্রতিবেদনে শিবলু হোসেনকে জব্দ করা চালের প্রকৃত মালিক হিসেবে উল্লেখ করেন। তবে ওই প্রতিবেদন থাকা সত্ত্বেও ২২ জুলাই জব্দ করা চালের জিম্মা চেয়ে করা আবেদন প্রত্যাখ্যান করেন আদালত। পরে ওই আদেশের বিরুদ্ধে করা রিভিশনও খারিজ হয়ে যায়।

এরপর ১৩ নভেম্বর শিবলু হোসেন পুনরায় চালের জিম্মা চেয়ে আবেদন করেন। একই দিন আবেদনটি খারিজ হলে তিনি অধস্তন আদালতের আদেশ বাতিল এবং চাল নিজের জিম্মায় পাওয়ার জন্য হাইকোর্টে ফৌজদারি রিভিশন করেন।

আবেদনের শুনানি নিয়ে হাইকোর্ট রুল জারি করেন। পরে গত ১৯ আগস্ট সেই রুল যথাযথ ঘোষণা করে রায় দেন আদালত।

হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ

রায়ে হাইকোর্ট বলেন, জব্দ করা চাল দীর্ঘদিন পুলিশ হেফাজতে থাকায় নষ্ট হয়ে মানুষের ভোগের অনুপযোগী হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এভাবে চাল পুলিশ হেফাজতে রেখে দিলে কোনো কার্যকর উদ্দেশ্য পূরণ হবে না।

‘খাদ্যদ্রব্য উৎপাদন, মজুত, স্থানান্তর, পরিবহণ, সরবরাহ, বিতরণ ও বিপণন (ক্ষতিকর কার্যক্রম প্রতিরোধ) আইন, ২০২৩’-এর ১১ ধারার বিধান বিশ্লেষণ করে আদালত বলেন, এই আইনের অধীনে জব্দ করা খাদ্যশস্য পচনশীল হোক বা অপচনশীল—আলামত হিসেবে প্রমাণের জন্য যতটুকু প্রয়োজন, শুধু সেই পরিমাণ নমুনা সংরক্ষণ করতে হবে। অবশিষ্ট খাদ্যশস্য দ্রুত প্রকাশ্যে নিলাম বা আইনসম্মত উপায়ে নিষ্পত্তি করতে হবে।

রায়ে আরও বলা হয়, আইনের ১১(৩) ধারার বিধান অনুযায়ী, বিচার শেষে অপরাধ প্রমাণিত হলে বিক্রয়লব্ধ অর্থ বা জামানত সরকারের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত হবে। আর অপরাধ প্রমাণিত না হলে তা প্রকৃত মালিককে ফেরত দিতে হবে।

১৫ লাখ টাকার বন্ডে চাল দেওয়ার নির্দেশ

আদালত বলেন, মামলায় ২০২৫ সালের ৩ জুলাই চাল জব্দ করা হলেও তা যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ ও সংরক্ষণ ছাড়া এক বছরেরও বেশি সময় ধরে থানার হেফাজতে রয়েছে। ফলে দীর্ঘদিন পুলিশ হেফাজতে থাকায় চাল নষ্ট হয়ে মানুষের ভোগের অনুপযোগী হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এ অবস্থায় জব্দ করা চাল এভাবে পুলিশের হেফাজতে রেখে কোনো কার্যকর উদ্দেশ্য পূরণ হবে না বলে অভিমত দেন হাইকোর্ট।

পরে আদালত সংশ্লিষ্ট সেশন আদালতকে নির্দেশ দেন, জব্দ করা চালের কেবল প্রয়োজনীয় পরিমাণ সাক্ষ্যপ্রমাণের জন্য নমুনা হিসেবে সংরক্ষণ করতে হবে। অবশিষ্ট চাল আবেদনকারী মো. শিবলু হোসেনের কাছে ১৫ লাখ টাকার বন্ড সম্পাদনের শর্তে হস্তান্তর করতে হবে।

রায়ে বলা হয়, বিচারপ্রক্রিয়া শেষে শিবলু হোসেনের বিরুদ্ধে অপরাধ প্রমাণিত হলে ১৫ লাখ টাকার বন্ডের অর্থ বাজেয়াপ্ত করে সরকারি কোষাগারে জমা দিতে হবে। আর অপরাধ প্রমাণিত না হলে ওই বন্ড বা জামানত বাতিল বলে গণ্য হবে।

রায় ঘোষণার সময় আবেদনকারীর পক্ষে ছিলেন আইনজীবী মো. মাহবুবুর রহমান। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মির্জা আল মাহমুদ ও মো. মাসুদুল আলম দোহা।

 
ইত্তেফাক/এসজে