এক বছরে ধর্ষণ-উত্ত্যক্তের তিন ঘটনা

চলন্ত ট্রেনে নারীর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ, নেই নজরদারি

আপডেট : ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৪:২৯

রেলপথে যাত্রী পরিবহনের অন্যতম নিরাপদ মাধ্যম হিসেবে ট্রেনের পরিচিতি থাকলেও চলন্ত ট্রেনে নারীর নিরাপত্তা নিয়ে একের পর এক ঘটনায় সেই ধারণা প্রশ্নের মুখে পড়ছে। সর্বশেষ কুড়িগ্রাম এক্সপ্রেসের খাবারের বগিতে এক নারী যাত্রীকে ধর্ষণের অভিযোগ শুধু একটি ফৌজদারি ঘটনার জন্ম দেয়নি, ট্রেনের ভেতরের নিরাপত্তাব্যবস্থা, দায়িত্বে থাকা পুলিশ সদস্যদের ভূমিকা, বেসরকারি কর্মীদের প্রবেশাধিকার এবং নজরদারি ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে। সোমবার রাতে ঢাকা থেকে কুড়িগ্রামগামী কুড়িগ্রাম এক্সপ্রেসে ৪৪ বছর বয়সি এক নারী যাত্রীকে ধর্ষণের অভিযোগ ওঠে। পরদিন মঙ্গলবার তিনি সান্তাহার রেলওয়ে থানায় মামলা করেন। মামলায় ক্যান্টিনকর্মী আবু বক্কর সিদ্দিকসহ ট্রেনে নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা দুই পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে। আবু বক্করকে গ্রেপ্তার করে আদালতে পাঠানো হয়েছে। অন্যদের ভূমিকা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

এক বছরে অন্তত তিন ঘটনা: রেলওয়ে পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে চলন্ত ট্রেন ও স্টেশনে ধর্ষণের ১০টি ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে সেপ্টেম্বর ২০২৫ থেকে সেপ্টেম্বর ২০২৬ সময়ের মধ্যে ট্রেনকেন্দ্রিক নারী হয়রানি বা নির্যাতনের অন্তত তিনটি ঘটনা সামনে এসেছে। পাহাড়িকা এক্সপ্রেসে নারী শিক্ষার্থীকে উত্ত্যক্তের অভিযোগে পাঁচ জনকে আটক, অভিযাত্রী কমিউটারে নারী যাত্রীকে উত্ত্যক্তের অভিযোগে উত্তেজনা এবং সর্বশেষ কুড়িগ্রাম এক্সপ্রেসে ধর্ষণের অভিযোগ—এসব ঘটনায় ট্রেনে নারী নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

রেলওয়ে পুলিশের মাঠপর্যায়ের এক কর্মকর্তা বলেন, আগের তুলনায় চলন্ত ট্রেনে নারী নির্যাতনের ঘটনা বেড়েছে বলে তাদের কাছে মনে হচ্ছে। তবে জনবল সংকটের কারণে প্রতিটি ঘটনা নজরে আনা সম্ভব হয় না। থানায় নথিভুক্ত ঘটনাই মূলত পরিসংখ্যানে আসে। অনেক ক্ষেত্রে সামাজিক কারণে ভুক্তভোগীরা অভিযোগ করেন না।

নিরাপত্তা ফাঁক কোথায়: সর্বশেষ মামলার এজাহারে অভিযোগ করা হয়েছে, ঐ নারী ভুলবশত কুড়িগ্রাম এক্সপ্রেসে উঠে পড়েছিলেন। পরে নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা দুই সদস্য তাকে দেহ তল্লাশির কথা বলে খাবারের বগিতে নিয়ে যান। সেখানে শ্লীলতাহানি ও ধর্ষণের অভিযোগ করেছেন তিনি।

ঘটনার পর ভুক্তভোগী জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ ফোন করেন। পরে রেলওয়ে পুলিশ চলন্ত ট্রেন থেকে ক্যান্টিনকর্মীকে আটক করে। এতে জরুরি সহায়তার একটি পথ কার্যকর থাকার প্রমাণ মিললেও প্রশ্ন থেকে যায়—ঘটনার আগেই কি ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতি শনাক্ত করার মতো নজরদারি ছিল?

ট্রেনের নিরাপত্তা শুধু পুলিশ মোতায়েনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। খাবারের বগি, কর্মীদের কক্ষ ও অপেক্ষাকৃত নির্জন অংশে যাত্রী প্রবেশের নিয়ম, কর্মীদের পরিচয় যাচাই এবং এসব স্থানে নজরদারি কতটা কার্যকর—সেগুলোও গুরুত্বপূর্ণ।

তিন স্তরে জবাবদিহি জরুরি: সর্বশেষ ঘটনায় অন্তত তিনটি বিষয় তদন্তে গুরুত্ব পাওয়া প্রয়োজন—অভিযুক্ত ক্যান্টিনকর্মীর নিয়োগ ও দায়িত্বের বৈধতা, ঘটনার সময় নিরাপত্তায় থাকা পুলিশ সদস্যদের অবস্থান ও ভূমিকা এবং ট্রেনে সিসিটিভি বা অন্য কোনো নজরদারি ব্যবস্থা থাকলে তার ফুটেজ।

বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক মো. আফজাল হোসেন বলেন, চলন্ত ট্রেনের নিরাপত্তার দায়িত্ব মূলত রেলওয়ে পুলিশের (জিআরপি)। তবে সবকিছু সব সময় নজরদারি করা তাদের পক্ষে সম্ভব হয় না। কুড়িগ্রাম এক্সপ্রেসের ঘটনাটি দুঃখজনক উল্লেখ করে তিনি বলেন, দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ক্যাটারিং সার্ভিসের একজন জড়িত থাকার অভিযোগ পাওয়া গেছে। বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে; যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হবে, তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, নারী যাত্রীদের নিরাপত্তায় বিশেষ কোচ চালুর উদ্যোগ থাকলেও শুধু আলাদা কোচই সমাধান নয়। ট্রেনের প্রতিটি বগি, করিডর, খাবারের বগি ও স্টেশনে নিরাপত্তা নজরদারি জোরদার করতে হবে। দৃশ্যমান হেল্পলাইন, জরুরি যোগাযোগব্যবস্থা, কর্মীদের পরিচয়পত্র এবং অভিযোগ গ্রহণে প্রশিক্ষিত জনবল নিশ্চিত করা না গেলে নিরাপত্তার কাঠামো পূর্ণাঙ্গ হবে না।

ইত্তেফাক/এনএন