ফুটবল এখন আর শুধু মাঠের ৯০ মিনিটের খেলা নয়। এটি পরিণত হয়েছে বিশাল এক বাণিজ্যিক শিল্পে। বিশ্বের সেরা প্রতিভাদের দলে ভেড়াতে ক্লাবগুলো প্রতিবছর ব্যয় করছে বিপুল অর্থ। তবে ইতিহাস বলছে, কোনো খেলোয়াড়ের পেছনে রেকর্ড অঙ্কের অর্থ খরচ করলেই সাফল্য নিশ্চিত হয় না। বরং অনেক সময় বিশাল ট্রান্সফার ফি-র সঙ্গে আসা প্রত্যাশার চাপেই হারিয়ে যান অনেক তারকা।
চলুন দেখে নেওয়া যাক ট্রান্সফারমার্কেটের তথ্য অনুযায়ী ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে দামি ১৫ ট্রান্সফার—
১৫. এডেন হ্যাজার্ড: চেলসি থেকে রিয়াল মাদ্রিদ
চেলসিতে দুর্দান্ত সময় কাটিয়ে ২০১৯ সালে ১২১ মিলিয়ন ইউরোতে রিয়াল মাদ্রিদে যোগ দেন এডেন হ্যাজার্ড। তাকে ঘিরে তখন নতুন ‘গ্যালাকটিকো’ হওয়ার প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু স্পেনে গিয়ে ধারাবাহিক চোটে সেই প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেননি বেলজিয়ান তারকা। লা লিগায় ৫৪ ম্যাচ খেলেও গোল করেন মাত্র চারটি। ২০২৩ সালে ৩২ বছর বয়সেই অবসরের ঘোষণা দেন তিনি।
১৪. এনজো ফার্নান্দেজ: বেনফিকা থেকে চেলসি
বিশ্বকাপজয়ী আর্জেন্টাইন মিডফিল্ডার এনজো ফার্নান্দেজকে ২০২৩ সালে রেকর্ড ১২১ মিলিয়ন ইউরোতে দলে নেয় চেলসি। এর কয়েক মাস আগেই ১২ মিলিয়ন ডলারেরও কম মূল্যে তাকে দলে নিয়েছিল বেনফিকা। শুরুতে সময় লাগলেও কোচ এনজো মারেস্কার অধীনে নিজের পারফরম্যান্সে উন্নতি করেন এনজো এবং ধীরে ধীরে চেলসির গুরুত্বপূর্ণ নেতা হয়ে ওঠেন এই মিডফিল্ডার।
১৩. ফ্লোরিয়ান ভির্টজ: বায়ার লেভারকুসেন থেকে লিভারপুল
বায়ার লেভারকুসেনের ঐতিহাসিক বুন্দেসলিগা জয়ে বড় ভূমিকা ছিল ফ্লোরিয়ান ভির্টজের। ২০২৩-২৪ মৌসুমে লিগে ২৩টি গোল অবদানে নিজের সামর্থ্যের প্রমাণ দেন তিনি। ২০২৫ সালে বায়ার্ন মিউনিখের পরিবর্তে প্রিমিয়ার লিগের চ্যালেঞ্জ বেছে নেন ভির্টজ। লিভারপুলে রেকর্ড ১২৫ মিলিয়ন ইউরোতে যোগ দিলেও শুরুতে ইংলিশ ফুটবলের সঙ্গে মানিয়ে নিতে কিছুটা সমস্যায় পড়েন এই জার্মান তারকা।।
১২. ইয়ান দিয়োমান্দে: আরবি লাইপজিগ থেকে রিয়াল মাদ্রিদ
আরবি লাইপজিগের হয়ে দুর্দান্ত এক বুন্দেসলিগা মৌসুম দিয়েই আলোচনায় আসেন আইভরি কোস্টের উইঙ্গার ইয়ান দিয়োমান্দে। ২০২৫-২৬ মৌসুমে জার্মান ফুটবলের অন্যতম সেরা ড্রিবলার হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন তিনি। লিভারপুলও তাকে মোহাম্মদ সালাহর সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসেবে বিবেচনা করেছিল। শেষ পর্যন্ত রিয়াল মাদ্রিদ ১২৫ মিলিয়ন ইউরোতে তাকে দলে ভেড়ায়।
১১. জুড বেলিংহাম: বরুশিয়া ডর্টমুন্ড থেকে রিয়াল মাদ্রিদ
মাত্র ১৭ বছর বয়সে বরুশিয়া ডর্টমুন্ডে যোগ দেওয়ার পর থেকেই জুড বেলিংহামের প্রতিভা নিয়ে আলোচনা ছিল। জার্মানিতে নিজেকে আরও পরিণত করে ২০২৩ সালে ১২৭ মিলিয়ন ইউরো্তে রিয়াল মাদ্রিদে পাড়ি এই মিডফিল্ডার। স্পেনে প্রথম মৌসুমেই দুর্দান্ত পারফরম্যান্স করে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে গোল করেন এবং রিয়ালের চ্যাম্পিয়নস লিগ জয়ে বড় ভূমিকা রাখেন।
১০. জোয়াও ফেলিক্স: বেনফিকা থেকে আতলেতিকো মাদ্রিদ
বেনফিকার হয়ে উঠে আসার সময় জোয়াও ফেলিক্সকে ব্রাজিলিয়ান কিংবদন্তি কাকার সঙ্গে তুলনা করা হতো। তার প্রতিভায় মুগ্ধ হয়ে ১২৭ মিলিয়ন ইউরোতে তাকে দলে নেয় আতলেতিকো মাদ্রিদ। তবে দিয়েগো সিমিওনের ফুটবল দর্শনের সঙ্গে পুরোপুরি মানিয়ে নিতে পারেননি তিনি। পরে বার্সেলোনা, চেলসি ও এসি মিলানেও ধারে খেলেছেন। শেষ পর্যন্ত ২০২৫ সালে আল নাসরে যোগ দেন ফেলিক্স।
৯. ফিলিপে কুতিনহো: লিভারপুল থেকে বার্সেলোনা
লিভারপুলে দুর্দান্ত সময় কাটানোর পর ২০১৮ সালে ১৩৫ মিলিয়ন ইউরোতে বার্সেলোনায় যোগ দেন ফিলিপে কুতিনহো। তাকে বিক্রির অর্থের একটি অংশ দিয়ে পরে আলিসন বেকার ও ভার্জিল ফন ডাইককে দলে নেয় লিভারপুল। তবে বার্সেলোনায় নিজের সেরা ছন্দ খুঁজে পাননি ব্রাজিলিয়ান প্লেমেকার। চার মৌসুমের মধ্যে দুই মৌসুম ধারে কাটানোর পর ২০২২ সালে ক্লাব ছাড়েন এই ব্রাজিলিয়ান।
৮. এলিয়ট অ্যান্ডারসন: নটিংহাম ফরেস্ট থেকে ম্যানচেস্টার সিটি
২০২৪ সালে নিউক্যাসল ইউনাইটেড থেকে নটিংহাম ফরেস্টে যোগ দেন এলিয়ট অ্যান্ডারসন। সেখানে দুর্দান্ত দুই মৌসুম কাটিয়ে তার মূল্য প্রায় তিনগুণ বেড়ে যায়। ২০২৬ বিশ্বকাপেও ইংল্যান্ডের গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় হিসেবে নজর কাড়েন তিনি। শারীরিক শক্তি, লড়াকু মানসিকতা ও বল পায়ে দক্ষতার কারণে ২০২৬ সালের জুলাইয়ে নিজেদের রেকর্ড ট্রান্সফার ১৩৫ মিলিয়ন ইউরোতে তাকে দলে নেয় ম্যানচেস্টার সিটি।
৭. মরগান রজার্স: অ্যাস্টন ভিলা থেকে চেলসি
অ্যাস্টন ভিলার হয়ে আড়াই বছরের দুর্দান্ত সময় কাটিয়ে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত তারকা হিসেবে গড়ে তোলেন মরগান রজার্স। গোল ও অ্যাসিস্টে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা এই আক্রমণাত্মক মিডফিল্ডারকে দলে ভেড়াতে নিজেদের ট্রান্সফার রেকর্ড ভেঙে ১৩৭ মিলিয়ন ইউরোতে দলে নেয় চেলসি। এখন নতুন ক্লাবে তিনি প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেন কি না, সেটিই দেখার বিষয়।
৬. ব্র্যাডলি বারকোলা: পিএসজি থেকে লিভারপুল
২০২৬ সালের গ্রীষ্মে মোহাম্মদ সালাহর বিদায়ের পর আক্রমণভাগ শক্তিশালী করতে পিএসজি থেকে ব্র্যাডলি বারকোলাকে ১৪০ মিলিয়ন ইউরোতে দলে নেয় লিভারপুল। টানা দুটি চ্যাম্পিয়নস লিগ জয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা ২৩ বছর বয়সী এই দ্রুতগতির উইঙ্গারকে ভবিষ্যতের বড় তারকা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
৫. এনজো ফার্নান্দেজ: চেলসি থেকে ম্যানচেস্টার সিটি
চেলসিতে নিজের বিশাল ট্রান্সফার ফি-র যথার্থতা প্রমাণের চেষ্টা করেছেন এনজো ফার্নান্দেজ। এনজো মারেস্কার অধীনে পারফরম্যান্সে উন্নতি করলেও ২০২৬ সালে তাকে ১৪৫ মিলিয়ন ইউরোতে দলে টানে ম্যানচেস্টার সিটি। রদ্রি ও বার্নার্দো সিলভার বিদায়ের পর মিডফিল্ড পুনর্গঠনের অংশ হিসেবে এনজোকে ঘিরে নতুন পরিকল্পনা সাজিয়েছে সিটি।
৪. আলেকজান্ডার ইসাক: নিউক্যাসল থেকে লিভারপুল
২০২৬ সালের গ্রীষ্মে লিভারপুলের রেকর্ড ট্রান্সফার উইন্ডোর শেষ বড় চমক ছিল আলেকজান্ডার ইসাককে দলে ভেড়ানো। ১৪৫ মিলিয়ন ইউরোতে তাকে দলে নেয় রেড টেবিলরা। নিউক্যাসল শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তাকে ধরে রাখার চেষ্টা করলেও কাঙ্ক্ষিত অর্থের প্রস্তাব পাওয়ার পর শেষ পর্যন্ত তাকে ছাড়তে হয়। টাইনসাইডে নিজেকে বিশ্বের অন্যতম সেরা সেন্টার ফরোয়ার্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন ইসাক।
৩. উসমান দেম্বেলে: বরুশিয়া ডর্টমুন্ড থেকে বার্সেলোনা
২০১৭ সালে উসমান দেম্বেলেকে ১৪৮ মিলিয়ন ইউরোতে দলে ভেড়ায় বার্সেলোনা। বিশাল সম্ভাবনা নিয়ে ক্যাম্প ন্যুতে পা রাখলেও বারবার চোট ও ফিটনেস সমস্যায় ভুগেছেন ফরাসি তারকা। ২০২৩ সালে বার্সেলোনা ছাড়ার পর পিএসজিতে গিয়ে কোচ লুইস এনরিকের অধীনে নিজের খেলায় বড় পরিবর্তন আনেন দেম্বেলে। পরে ব্যালন ডি’অরও জেতেন তিনি।
২. কিলিয়ান এমবাপ্পে: মোনাকো থেকে পিএসজি
২০১৭ সালে মোনাকো থেকে ১৮০ মিলিয়ন ইউরোতে পিএসজিতে যোগ দেন কিলিয়ান এমবাপ্পে। সাত বছরে ক্লাবটির হয়ে ৩০৮ ম্যাচে ২৫৬ গোল করেন ফরাসি তারকা। লিগ ওয়ানে একের পর এক গোলের রেকর্ড গড়ার পাশাপাশি পিএসজির সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতাও হন তিনি। চ্যাম্পিয়নস লিগ জিততে না পারলেও পিএসজির হয়ে ১৬টি ট্রফি জিতেছেন এমবাপ্পে।
১. নেইমার: বার্সেলোনা থেকে পিএসজি
ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে দামি ট্রান্সফারের রেকর্ড এখনো নেইমারের দখলে। ২০১৭ সালে বার্সেলোনা থেকে ব্রাজিলিয়ান তারকাকে দলে ভেড়াতে ২২২ মিলিয়ন ইউরোর বিশ্বরেকর্ড ট্রান্সফার ফি খরচ করে পিএসজি। সেই রেকর্ড এখনো অক্ষত।
বার্সেলোনায় দুর্দান্ত সাফল্যের পর প্যারিসে গিয়ে নেইমার প্রত্যাশার চাপ ও ধারাবাহিক চোটে ভুগেছেন। ফরাসি লিগে সফল হলেও পিএসজিকে চ্যাম্পিয়নস লিগ জেতাতে পারেননি তিনি। ২০২০ সালে চ্যাম্পিয়নস লিগের ফাইনালে উঠেছিল পিএসজি, কিন্তু শেষ পর্যন্ত শিরোপা জিততে পারেনি। ফলে বার্সেলোনার পর নেইমারের ক্যারিয়ারে ইউরোপের শ্রেষ্ঠত্বের ট্রফি না জেতার আক্ষেপটি এখনো বড় অপূর্ণতা হয়ে আছে।

