র‍্যাব বিলুপ্ত করে এসআরবি গঠনে বিল, সংসদে তর্ক-বিতর্ক

আপডেট : ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০১:৪৫

বিতর্কিত এলিট ফোর্স র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‍্যাব) বিলুপ্ত করে পুলিশের অধীন ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন’ (এসআরবি) নামে একটি নতুন বিশেষায়িত ইউনিট গঠনের লক্ষ্যে জাতীয় সংসদে বিল উত্থাপন করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার সংসদ অধিবেশনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন বিল-২০২৬’ উত্থাপন করেন। পরবর্তীতে বিলটি অধিকতর পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে চার কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে পাঠানো হয়।

বিলের উদ্দেশ্য ও কারণ ব্যাখ্যা করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সংসদে জানান, দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সুসংহত করা, সংঘবদ্ধ ও গুরুতর অপরাধ কঠোর হস্তে দমন এবং সার্বিক আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় একটি অত্যন্ত আধুনিক, দক্ষ, পেশাদার ও শতভাগ জবাবদিহিমূলক ইউনিট থাকা জরুরি। একই সঙ্গে জরুরি ও অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতিতে পুলিশসহ অন্যান্য আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে কার্যকর সহায়তা দিতে এবং দ্রুত সাড়া ফেলতেই এই বাহিনী পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

উত্থাপিত আইনের খসড়া অনুযায়ী, বিলুপ্ত হতে যাওয়া র‍্যাবের সব ধরনের জনবল, স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ, বাজেট, ব্যাংক আমানত, চুক্তি, দায় এবং নথিপত্র সরাসরি নবগঠিত এসআরবির অধীনে ন্যস্ত হবে। নতুন সাংগঠনিক বিধিমালা চূড়ান্ত না হওয়া পর্যন্ত ২০০৫ সালের শৃঙ্খলা ও বিচারসংক্রান্ত বিধিমালাই বলবৎ থাকবে। পুলিশের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক (অতিরিক্ত আইজিপি) পদমর্যাদার একজন কর্মকর্তার নেতৃত্বে পরিচালিত এই বিশেষায়িত ইউনিটের নিজস্ব পোশাক, পতাকা ও প্রতীক থাকবে। পাশাপাশি ইউনিটটিকে ফৌজদারি অপরাধের তদন্ত, তল্লাশি, গ্রেপ্তার ও মালামাল জব্দের পূর্ণ ক্ষমতা দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। একই সঙ্গে নিজস্ব হাজতখানা, মালখানা ও জিজ্ঞাসাবাদকক্ষ পরিচালনার পাশাপাশি বাহিনীর সদস্য ও সাধারণ নাগরিকদের অভিযোগ নিষ্পত্তিতে একটি স্বাধীন বহুপক্ষীয় কমিটি গঠনের বিধান রাখা হয়েছে।

বিলটি উত্থাপনের পরপরই তীব্র আপত্তি জানান বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, বিগত ফ্যাসিবাদী সরকারের আমলে গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা ও নির্যাতন সেলের মতো কর্মকাণ্ডের কারণে র‍্যাব দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পরিসরে চূড়ান্তভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছিল। রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিশ্রুতি সত্ত্বেও র‍্যাবকে পুরোপুরি বাতিল না করে ভিন্ন মোড়কে পুনর্বাসন করা হচ্ছে বলে অভিযোগ তুলে তিনি এ বিষয়ে সংসদে বিশদ পর্যালোচনার দাবি জানান।

জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘নাহিদ ইসলাম অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা ছিলেন। তখন উপদেষ্টা পরিষদে তিনি যদি এই প্রস্তাব দিতেন, তাহলে খুশি হতাম। কিন্তু ১৮ মাসে তার এ কথা মনে হয়নি।’ পুলিশের সাবেক এক কর্মকর্তার বিতর্কিত ভূমিকার প্রসঙ্গ টেনে মন্ত্রী আরও বলেন, ‘পুলিশের মহাপরিদর্শক ছিলেন কুখ্যাত বেনজীর। এ কারণে কি আমরা পুলিশ বিলুপ্ত করে দেব?’ তিনি স্পষ্ট করেন, নতুন ইউনিটে অতীত অভিজ্ঞতার আলোকে কঠোর অভ্যন্তরীণ নজরদারি ও জবাবদিহির ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়েছে।

আলোচনায় অংশ নিয়ে জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান জানান, বিরোধী দল র‍্যাব বিলুপ্তির সিদ্ধান্তকে সম্পূর্ণ সমর্থন করে। তবে নতুন কোনো সংস্থা তৈরির আগে জাতীয় পর্যায়ে আরও সুচিন্তিত ও সমন্বিত সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন বলে তিনি সরকারকে তা বিবেচনার অনুরোধ করেন।

এদিকে একই দিনে জাতীয় সংসদে ‘আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন) বিল-২০২৬’ উত্থাপন করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। প্রস্তাবিত এই আইনে এপিবিএনকে ফৌজদারি অপরাধ সরাসরি তদন্তের ক্ষমতা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। বিলে বাহিনীর সদস্যদের শৃঙ্খলা ও আচরণবিধিতে কড়াকড়ি আরোপ করে বলা হয়েছে, পেশাগত উন্নয়নের উদ্দেশ্য ছাড়া সদস্যরা অন্য কোনো সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হতে পারবেন না। এছাড়া যথাযথ কর্তৃপক্ষের পূর্বানুমতি ছাড়া কোনো তথ্য বা নথি গণমাধ্যমে প্রকাশ কিংবা প্রকাশে সহায়তা করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

উল্লেখ্য, ২০০৩ সালে তৎকালীন আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন আইন সংশোধনের মাধ্যমে র‍্যাব গঠন করা হয়েছিল এবং প্রতিষ্ঠার পর থেকে বাহিনীটি ওই আইনি কাঠামোর অধীনেই পরিচালিত হয়ে আসছিল।

ইত্তেফাক/এনএন