ঢাকার ইউনূস সেন্টারে বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) ইসলামি উন্নয়ন ব্যাংক গ্রুপের চেয়ারম্যান ড. মুহাম্মদ আল জাসের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন নোবেল বিজয়ী অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। এসময় উন্নয়ন, উদ্যোক্তা সৃষ্টি এবং সামাজিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় উদ্ভাবনী সমাধান নিয়ে পরষ্পরের মধ্যে আলোচনা হয়েছে।
জানা যায়, ইসলামি উন্নয়ন ব্যাংকের প্রতিনিধিদলে আরও ছিলেন- ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ট্রেড ফাইন্যান্স করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আদিব ইউসুফ আল আমা, ইসলামি উন্নয়ন ব্যাংকের কান্ট্রি প্রোগ্রামস বিভাগের মহাপরিচালক আনাস আসিয়ামি এবং আইটিএফসি’র ট্রেড ফাইন্যান্স বিভাগের মহাব্যবস্থাপক আবদিহামিদ আবু।
এসময় উন্নয়ন বিষয়ে অধ্যাপক ইউনূসের দর্শন ও বাস্তব অভিজ্ঞতা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। প্রতিনিধিরা ক্ষুদ্রঋণ ও গ্রামীণ ব্যাংক নিয়ে অধ্যাপক ইউনূসের কাজ, সামাজিক ব্যবসার ধারণা এবং তার ‘তিন শূন্য’ ধারণা —শূন্য দারিদ্র্য, শূন্য বেকারত্ব এবং শূন্য নিট কার্বন নিঃসরণ—এর ভাবনা নিয়ে মতবিনিময় করেন।
ড. আল জাসের জানান, বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে ইসলামি উন্নয়ন ব্যাংক তার সদস্য দেশগুলোতে ক্ষুদ্রঋণ চালুর বিভিন্ন উপায় বিবেচনা করছে। অধ্যাপক ইউনূস এ উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে গ্রামীণের কর্মসূচিগুলো নিবিড়ভাবে পর্যালোচনা করতে একটি দল পাঠানোর অনুরোধ করেন, যাতে ইসলামি উন্নয়ন ব্যাংক কোন কোন পদ্ধতি গ্রহণে আগ্রহী হতে পারে তা চিহ্নিত করতে পারে।
এসময় ইস্টার্ণ রিফাইনারির আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণ প্রকল্পের জন্য বাংলাদেশে ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার অর্থায়ন করায় ড. আল জাসেরকে ধন্যবাদ জানিয়ে ড. ইউনূস বলেন, এই চুক্তির মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ ও ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংকের মধ্যকার সম্পর্কের গভীরতা এবং বাংলাদেশের অন্যতম বিশ্বস্ত উন্নয়ন অংশীদার হিসেবে ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংকের ভূমিকার প্রতিফলন ঘটেছে।
এদিকে অধ্যাপক ইউনূসের কাজের প্রশংসা করে ড. আল জাসের বলেন, বর্তমানে অধিকাংশ তরুণের মধ্যেই প্রচলিত চাকরিব্যবস্থা থেকে দূরে থাকার প্রবণতা রয়েছে, তারা আর নিজেদের শুধু চাকরিজীবী হিসেবে গড়ে তুলতে আগ্রহী নন।
তিনি বলেন, তরুণদের সৃজনশীলতাকে সমস্যা সমাধান ও তাদেরকে উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলার প্রয়োজন রয়েছে—যে ধারণাটি শুরু থেকেই ক্ষুদ্রঋণের মূল ভিত্তিতে ছিল।
এসময় গ্রামীণের নবীন উদ্যোক্তা কর্মসূচির কথা উল্লেখ করে ড. ইউনূস বলেন, এটি বাংলাদেশে শুরু হয়ে পরবর্তীতে অন্যান্য দেশেও সম্প্রসারিত হয়েছে।
জানা যায়, আলোচনায় গ্রামীণ বিশ্ববিদ্যালয়ের ধারণাও উঠে আসে। এই বিশ্ববিদ্যালয় তরুণদের চাকরিপ্রার্থী নয়, বরং চাকরি সৃষ্টিকারী হিসেবে গড়ে তোলায় নিবেদিত হবে। ড. ইউনূস গ্রামীণ এলাকাগুলোতে সামাজিক ব্যবসার নেটওয়ার্ক হিসেবে ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবা, চক্ষুসেবা, নার্সিং কলেজ, হাসপাতাল চেইনসহ একাধিক উদ্যোগ গড়ে তোলার অভিজ্ঞতা ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংকের প্রতিনিধিদলকে জানান।
ড. ইউনূস বলেন, বর্তমান প্রজন্ম এ পর্যন্ত পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী প্রজন্ম, কারণ তারা ডিজিটাল প্রযুক্তিতে দক্ষ। তারা শুধু চাকরি পাওয়াকে প্রকৃত চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখে না; বরং মানবিক সমস্যার সমাধানে নিজেদের সৃজনশীলতাকে কাজে লাগানোই তাদের মূল লক্ষ্য।
এসময় তরুণদের সামাজিক সমস্যা সমাধান, মর্যাদাপূর্ণ সুযোগ সৃষ্টি এবং আরও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে তাদের সৃজনশীলতা ও উদ্যোক্তা হিসেবে নিজেদের গড়ে তোলার সক্ষমতা নিয়েও আলোচনা করেন তিনি।
এসময় বৈঠকে দারিদ্র্য হ্রাস, কর্মসংস্থান এবং সামাজিক উন্নয়নে উদ্ভাবনী ও টেকসই পদ্ধতি গড়ে তোলার ক্ষেত্রে ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংক ও অধ্যাপক ইউনূসের অভিন্ন আগ্রহের বিষয়টি প্রতিফলিত হয়।
বৈঠকে উপস্থিত প্রতিনিধিদলের অন্য সদস্যরা হলেন- ইওপির মিডল অফিসের টেকনিক্যাল সাপোর্ট অফিসার মোহাম্মাদ জাফর আলমাশহারাউই, ইওপির ফ্রন্ট অফিস স্পেশালিস্ট ও এক্সিকিউটিভ অ্যাসিস্ট্যান্ট আহমাদ শাওয়েশ, সিনিয়র এডিটরিয়াল অ্যান্ড ব্র্যান্ডিং স্পেশালিস্ট আবদিকাদির আবদি, ঢাকার রিজিওনাল হাবের ম্যানেজার আলী খান, ঢাকার রিজিওনাল হাবের অপারেশনস টিম লিডার নাসের ইয়াকুবু, ঢাকার রিজিওনাল হাবের কান্ট্রি ইকোনমিস্ট মাহবুব রব্বানি, আইটিএফসির ডিভিশন ম্যানেজার আবদুল আলিম এইচ মোহাম্মদ এবং আইটিএফসির সিনিয়র ম্যানেজার ইফতেখার আলম, গ্রামীণ গ্রুপের চেয়ারম্যান মো. আশরাফুল হাসান, ইউনূস সেন্টারের নির্বাহী পরিচালক লামিয়া মোরশেদ এবং গ্রামীণ ট্রাস্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তাসমিনা রহমান।

