একটি জাতির জীবনশক্তি কতটা, সেই জাতি শারীরিকভাবে কতটা সুস্থ, তাহার উপরেই অনেকাংশে নির্ভর করে সেই জাতির সামাজিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিস্থাপকতা। উন্নত দেশগুলিতে এই কারণে জনস্বাস্থ্যকে রাষ্ট্রের 'অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার' হিসাবে বিবেচনা করা হয়। স্বাস্থ্য খাতে বিপুল অর্থ বরাদ্দের পাশাপাশি হাসপাতালের অবকাঠামো, চিকিৎসা-যন্ত্রপাতি, দক্ষ জনবল এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণেও তাহারা সমান গুরুত্ব দিয়া থাকেন। অথচ আমাদের সরকারি হাসপাতালগুলির চিত্র দেখিলে অনেক সময় মনে হয়, রোগীর চিকিৎসার চাইতে আগে বরং মুমূর্ষু হাসপাতালগুলিরই চিকিৎসা প্রয়োজন!
গতকাল দৈনিক ইত্তেফাকে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানা গিয়াছে, রাজধানীসহ দেশের সরকারি হাসপাতালগুলিতে সহস্রাধিক গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষানিরীক্ষার যন্ত্র বিকল হইয়া পড়িয়া আছে। ইহার ফলে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করাইতে রোগীদের ছুটিতে হইতেছে বেসরকারি হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে। যাহারা সরকারি হাসপাতালে আসেন মূলত স্বল্প ব্যয়ে চিকিৎসা পাওয়ার আশায়, সেই তাহাদেরকেই শেষ পর্যন্ত গুনিতে হইতেছে বাড়তি অর্থ। এমন একটি অবস্থায় প্রশ্ন উঠা স্বাভাবিক, যেই যন্ত্র রোগীর কাজে লাগিবে না, সেই যন্ত্র কিনিয়া রাষ্ট্রের কোটি কোটি টাকা ব্যয়ের সার্থকতা কোথায়?
এইখানে উদ্বেগের আরও বড় কারণ হইল, একটি যন্ত্র নষ্ট হওয়ার পর তাহা মেরামত করিতেই মাসের পর মাস লাগিয়া যায়। অথচ উন্নত দেশগুলির স্বাস্থ্যব্যবস্থায় আমরা দেখি ভিন্ন ব্যবস্থা; সেইখানে চিকিৎসা-যন্ত্রের রক্ষণাবেক্ষণ কোনো খেয়ালখুশির বিষয় নহে, বরং উহা একটি পরিকল্পিত ব্যবস্থার অংশ। যন্ত্র নষ্ট হওয়ার অপেক্ষায় না থাকিয়া তাহারা নিয়মিত পরীক্ষা, প্রতিরোধমূলক রক্ষণাবেক্ষণ এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে মেরামতের ব্যবস্থা করিয়া থাকেন। হাসপাতালগুলিতে বায়োমেডিক্যাল প্রকৌশলী ও প্রশিক্ষিত কারিগরি জনবলও তাহাদের ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। অর্থাৎ, উন্নত বিশ্বের নীতি হইল, যন্ত্র কিনিয়া ফালাইয়া রাখা নহে, বরং তাহা সচল রাখাই মূল লক্ষ্য এবং দায়িত্ব।
দুঃখজনকভাবে এই জায়গাটিতেই আমাদের বড় ঘাটতি রহিয়াছে। কোটি টাকা ব্যয় করিয়া অত্যাধুনিক যন্ত্র কেনা হয়, কিন্তু তাহার রক্ষণাবেক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় জনবল, বাজেট ও জবাবদিহির ব্যবস্থা কতটা কার্যকর, সেই প্রশ্নের উত্তর মিলে না। দেশের ৯৮ ভাগ সরকারি মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল কিংবা বিশেষায়িত ইনস্টিটিউটে বায়ো মেডিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ নাই। একইভাবে যন্ত্র মেরামতের নামে অনিয়ম ও অর্থ অপচয়ের অভিযোগও নূতন নহে। আবার কোথাও পরীক্ষার ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও দালাল চক্র রোগীকে বাহিরে ভাগাইয়া লইয়া যায়।
এই প্রবণতা কেবল স্বাস্থ্য খাতের বেহাল দশা এবং অব্যবস্থাপনাই নহে; বরং ইহা রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপচয় এবং নাগরিকের সঙ্গে একধরনের অবিচার বা তামাশা। একজন দরিদ্র রোগী যখন সরকারি হাসপাতালে পরীক্ষা করাইতে আসেন, তখন তাহার নিকট সরকারি যন্ত্র অচল থাকা নিছক একটি প্রশাসনিক ব্যর্থতা নহে-ইহা তাহার চিকিৎসা পাওয়ার পথকেও করিয়া তোলে কঠিনতর। বিভিন্ন সময় দালালমুক্ত হাসপাতাল গড়িবার প্রত্যয় শোনা যায়, ইহা অবশ্যই সাধুবাদযোগ্য, কিন্তু শুধু দালাল ধরিয়া কি পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটানো যাইবে? কোন হাসপাতালে কোন যন্ত্র আছে-তাহাদের কোনটি সচল, কোনটি বিকল, কত দিন ধরিয়া বিকল এবং কবে মেরামত হইবে-এই সকল বিষয়ের পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল হিসাব থাকা প্রয়োজন। বড় হাসপাতালগুলিতে গড়িয়া তুলিতে হইবে কার্যকর বায়োমেডিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ। পাশাপাশি যন্ত্র কেনার সময়ই তাহার রক্ষণাবেক্ষণ, যন্ত্রাংশ, প্রশিক্ষণ ও দীর্ঘমেয়াদি সেবা নিশ্চিত করিতে হইবে। সবচেয়ে বড় কথা, সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা-যন্ত্র অচল থাকিলে তাহার দায়ও নির্ধারিত হওয়া দরকার। জনগণের করের টাকায় কেনা একটি যন্ত্র বৎসরের পর বৎসর পড়িয়া থাকিবে, রোগী বাহিরে পরীক্ষা করাইতে বাধ্য হইবেন, আর কাহারও কোনো জবাবদিহি থাকিবে না-এই সংস্কৃতি চলিতে পারে না।
মনে রাখিতে হইবে, আমরা এমন একটি সময় অতিবাহিত করিতেছি, যখন সংক্রামক রোগের প্রকোপ কেবল ক্রমশ বাড়িতেছেই। সুতরাং, হাসপাতালগুলিতে কেন সুষ্ঠু চিকিৎসার পরিবেশ নিশ্চিত করিব না? হাসপাতাল শুধু ভবন কিংবা যন্ত্রপাতির স্তূপ নহে; বরং হাসপাতাল মানে মানুষের জীবন রক্ষার প্রতিষ্ঠান। অতএব, যন্ত্রপাতি কিনিয়া ছবি তুলিয়া রাখিবার চাইতে যন্ত্র সচল রাখিবার ব্যবস্থা জরুরি। সরকারি হাসপাতালের দরজায় আসিবার পর একজন রোগী সেবার বদলে অব্যবস্থাপনার কাছে পরাজিত হইয়া ফিরিয়া যাইবেন-ইহা কখনোই কাম্য নহে।

