অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিলের অভিযোগ তুলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশ করে অশালীন ও কুরুচিপূর্ণ ভাষায় ভিডিও প্রকাশ করেছিলেন গাজীপুরের কলেজছাত্র সিফাত আব্দুল্লাহ। ওই ভিডিও প্রকাশের পর সমালোচনা শুরু হলে তাকে গ্রেপ্তার করে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় কারাগারে পাঠানো হয়।
তবে সিফাতের উত্থাপিত অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিলের অভিযোগ তদন্ত করে ভিন্ন তথ্য পেয়েছে গাজীপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১।
জানা যায়, সিফাত আব্দুল্লাহ্ গাজীপুর মহানগরীর (৩৮ নম্বর ওয়ার্ড) টিনের মসজিদ এলাকার মো. সিকান্দর আলীর ছেলে। তিনি রাজধানীর আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজের শিক্ষার্থী।
সিফাত আব্দুল্লাহ ভিডিওতে দাবি করেন, তিনি গত দুই মাসে (আগস্ট-জুলাই) প্রায় ১০ হাজার টাকা বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করেছেন এবং বিষয়টিকে অগ্রহণযোগ্য হিসেবে তুলে ধরেন। পরবর্তীতে একটি ফেসবুক স্ট্যাটাসে তিনি আরও লিখেন, ‘এক মাসের বিদ্যুৎ বিল একটা পুরো পরিবারকে জিম্মি কইরা ফেলছে?’
এ বিষয়ে গাজীপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১ বোর্ড বাজার জোনাল অফিসের উপ মহাব্যবস্থাপক মো. আহসান কবীরের সই করা তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, অভিযুক্ত সিফাত আব্দুল্লাহর পিতার নাম মো. সেকান্দার আলী। গাজীপুর মহানগরীর ৩৮ নম্বর ওয়ার্ডে তাদের দোতলা বিশিষ্ট বাড়িতে মোট ৩টি আবাসিক বিদ্যুৎ মিটার সংযোগ রয়েছে।
তদন্তে দেখা যায়, সিফাত আব্দুল্লাহদের বাড়ির একটি মিটারে (মিটার নম্বর: S000433*7) মে মাসে ৪৫ ইউনিটের বিল হিসেবে ৩১৭ টাকা, জুনে ৫০ ইউনিটের ৩৪২ টাকা, জুলাইয়ে ১৫০ ইউনিটের ১ হাজার ১৮২ টাকা এবং আগস্টে ৭৫ ইউনিটের বিল আসে ৫১৩ টাকা। সব মিলিয়ে ওই মিটারে চার মাসে মোট ৩২০ ইউনিট ব্যবহারে বিল এসেছে ২ হাজার ৩৫৪ টাকা।
অপরদিকে আরেকটি মিটারে যার নম্বর S000218*5, সেটিতে মে মাসে ২৫০ ইউনিটের বিল হিসেবে ১ হাজার ৮১২ টাকা, জুনে ২০০ ইউনিটের ১ হাজার ৫৮৪ টাকা, জুলাইয়ে ৪০০ ইউনিটের ৩ হাজার ৫৯৪ টাকা এবং আগস্টে ২৮৫ ইউনিটের বিল হিসেবে এসেছে ২ হাজার ৩৯৭ টাকা।
এই মিটারটিতে গত চার মাসে মোট ১ হাজার ১৩৫ ইউনিট ব্যবহারে বিল এসেছে ৯ হাজার ৩৮৭ টাকা।
এছাড়া ওই বাড়িতে তৃতীয় যেই মিটারটি রয়েছে যার নম্বর S000424*7, সেটিতে মে মাসে ১২৫ ইউনিটের বিল হিসেবে ৮৪৭ টাকা, জুনে ১২০ ইউনিটের ৬৯০ টাকা, জুলাইয়ে ২০৫ ইউনিটের ১ হাজার ৬৩৩ টাকা এবং আগস্টে ১৭৫ ইউনিটের বিল এসেছে ১ হাজার ৩৬২ টাকা। চার মাসে ওই মিটারে মোট ব্যবহার হয়েছে ৬২৫ ইউনিট, যার মোট বিল: ৪ হাজার ৫৩২ টাকা।
অর্থাৎ, মে থেকে আগস্ট ২০২৬ এই চার মাসে তিনটি আবাসিক মিটার মিলিয়ে মোট ২ হাজার ০৮০ ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহারে মোট বিল এসেছে ১৬ হাজার ২৭৩ টাকা।
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, গাজীপুর বোর্ড বাজার জোনাল অফিস থেকে কর্মকর্তারা সিফাতের বাড়িতে গিয়ে বাসায় ইলেকট্রিক পণ্যের প্রকৃত তালিকা সংগ্রহের কথা জানালে দিতে অস্বীকৃতি জানান এবং গেট বন্ধ করে দেওয়া হয়।
এখানে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, সিফাত আব্দুল্লাহ যে বাড়িতে বসবাস করেন সেখানে একটি নয়, মোট তিনটি আবাসিক বিদ্যুৎ মিটার সংযোগ রয়েছে। ফলে বিদ্যুৎ বিল নিয়ে কোন অভিযোগ বা দাবি মূল্যায়নের ক্ষেত্রে একটি মিটারের বিল আলাদাভাবে দেখার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট বাড়ির সবগুলো মিটারের ব্যবহার ও বিলের হিসাব ও বিবেচনায় নেওয়া জরুরি বলে জানান পল্লীবিদ্যুত সমিতি।
এ ঘটনায় চার সদস্যবিশিষ্ট একটি কমিটি করা হয়েছে। তার মধ্যে বর্তমানে ঘটনাস্থলে তিনজন রয়েছেন। তারা হলেন- ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার মো. আহসান কবীর, এজিএম অর্থ- মহিমা আক্তার ও ইনফোর্সমেন্ট কো-অর্ডিনেটর - রফিকুল ইসলাম।
গাজীপুরের বোর্ড বাজার জোনাল অফিসের ডিজিএম মো. আহসান কবীর জানান, আমরা ৪ জন কর্মকর্তা ঘটনাস্থলে গিয়ে তদন্ত করি। এসময় আমার সঙ্গীয় কর্মকর্তারা সিফাতের বাড়িতে গিয়ে বাসায় ইলেকট্রিক পণ্যের প্রকৃত তালিকা সংগ্রহের কথা জানালে তা দিতে অস্বীকৃতি জানান এবং গেট বন্ধ করে দেন তার বাড়ির লোকজন।
সিফাত আব্দুল্লাহর বাবা মো. সিকান্দার আলীর সাথে বিভিন্ন মাধ্যমে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এ ব্যাপারে এনসিপির যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক ও নির্বাহী কাউন্সিলের সদস্য অ্যাডভোকেট আলী নাসের খান বলেন, সিফাত আব্দুল্লাহর বাসার তিনটি মিটারে দুই মাসের বিল (জুলাই-আগস্ট ২০২৬) ১০ হাজার ৬৮১ টাকা। পল্লীবিদ্যুৎ তো গ্রাহক কপি দিয়ে বিল নেয়। অরিজিনাল বিল তাদেরটা আর গ্রাহকদেরটা ভৌতিক বিল। বাড়িটা সিফাতদের, ভাড়াটিয়াদের আলাপ সে স্পষ্ট করেই করেছিল। মিটার ৩টা। পল্লী বিদ্যুৎ ভৌতিক তথ্য দিচ্ছে।
তবে গাজীপুরের বোর্ড বাজার পল্লীবিদ্যুৎ জোনাল অফিসের ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার মো. আহসান কবীর বলেন, সম্প্রতি সিফাত আব্দুল্লাহ নামে এক যুবক সোশ্যাল মিডিয়ায় তার বাসার বিদ্যুৎ বিল নিয়ে যে অভিযোগ করেছেন তার সুস্পষ্ট তদন্তে আমরা ঘটনাস্থলে গিয়েছি। তার বাসার বিদ্যুতের মিটারে যে ইউনিট এবং অফিসে আনা রিডিং ও বিল তৈরিতে কোনো প্রকার অনিয়ম বা ত্রুটি নেই।
এর আগে, গত বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিল আসার অভিযোগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে কটুক্তি করার অভিযোগে মো. আব্দুল্লাহ সিফাত (২৭) নামে এক যুবককে আটক করে পুলিশ। পরে শুক্রবার দুপুরে গাজীপুর মেট্রোপলিটন আদালতে উপস্থাপন করা হলে তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়।

