সম্প্রতি দক্ষিণ ও মধ্য-এশিয়াবিষয়ক যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত এবং ভারতে দেশটির রাষ্ট্রদূত সার্জিও গোরের এক এক্স পোস্টের সূত্রে জানা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মধ্যে নাকি একটি ‘অভূতপূর্ব চুক্তি’ হয়েছে, যার বলে বাংলাদেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে ‘আরও’ বোয়িং কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে বোয়িংয়ের কাছ থেকে বাংলাদেশ নতুন করে ঠিক কতগুলো উড়োজাহাজ কিনতে যাচ্ছে, সেটি সার্জিও সাহেব তার পোস্টে গুপ্তই রেখেছেন। বাংলাদেশের বিদ্যমান আর্থসামাজিক বাস্তবতায় বিবিসি, প্রথম আলোসহ বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে খবরটি পড়ে আমার ছোটবেলার একটা গল্প মনে পড়ছে। তখনো গ্রামবাংলা আজকের মতো নাগরিক আগ্রাসনে নষ্ট হয়ে যায়নি। বিদ্যুৎ বাতি না থাকলেও কুপিবাতি আর হারিকেনের আলোতেই জীবন আলোকিত হতো। পথঘাট ছিল নিতান্তই অমসৃণ আর আনকোরা। তাতে ছিল না আজকের মতো রিকশা বা ব্যাটারি-চালিত যানের দখল। মালামাল পরিবহনে চতুষ্পদ ঘোটকই ছিল একমাত্র ভরসা। এই বাংলায় গর্দভের অনুপস্থিতির কারণে ঘোটক বা ঘোড়াকেই গর্দভের সমূহ কাজ করতে হতো। যারা ঘোড়ার পিঠে করে ধান-চাউল পরিবহন করতে দেখেছেন; তারা জানেন, ঘোড়ার পিঠের দুই দিকে দুটো বস্তা রশি দিয়ে বিশেষ কায়দায় বেঁধে ঝুলিয়ে দেওয়া হতো। সেই সঙ্গে ঘোড়ার পেট পেঁচিয়ে বাঁধা হতো একটা বেল্ট। কিন্তু কখনো কখনো অবিবেচক সহিস পিঠের ওপরেও আরও একটা বস্তা চাপিয়ে দিত। আর তাকে ঘোড়ার পেটের চ্যাপটা বেল্টের সঙ্গে শক্ত করে পেঁচিয়ে বেঁধে দিত। শোনা যায়, ঘোড়ার বেল্ট যত শক্ত (টাইট) করে বাঁধা হতো, ঘোড়ার চলার গতিও নাকি ততই বেড়ে যেত। কিন্তু এতে করে ঘোড়ার পেটে যে চাপ পড়ত, তাতে তার অন্ত্রের ভেতর লুকিয়ে থাকা বাতাস ভটভট করে পশ্চাদ্দেশ দিয়ে বেরোতে থাকত; যাকে নেত্রকোনার ভাষায় বলে ‘পাদ’ দেওয়া।
একবার নেত্রকোনার বারহাট্টা উপজেলার সর্ব উত্তরের এক গ্রাম থেকে এক সহিস ঘোড়ায় করে তিন বস্তা ধান বারহাট্টা বাজারে বিক্রি করতে আনবে। দুই বস্তা পর্যন্ত ঠিক ছিল, কিন্তু যেই তৃতীয় বস্তাটি তার পিঠে তুলে বেল্ট টাইট দিতে থাকল, অমনি ঘোড়ার পশ্চাদ্দেশ দিয়ে ভটভট করে বাতাস বের হওয়া শুরু হলো। সহিস নাছোড়বান্দা! সে ঘোড়াকে উদ্দেশ্য করে বলতে থাকল ‘বেটা ঘোড়া, যতই পাদাপাদি করো, বারহাট্টা তোমাকে যেতেই হবে।’
গত কয়েক বছর ধরে বাংলার জনগণের পিঠে যে হারে বোঝা চাপানো হচ্ছে, তাতে অবস্থা দাঁড়িয়েছে বারহাট্টার সেই ঘোড়ার মতো। প্রতিদিনই তার পিঠে একটা না একটা নতুন বোঝা চাপানো হচ্ছে। একদিকে নিত্যপণ্যের মূল্যের ঊর্ধ্বগতি, অন্যদিকে নানাবিধ কারণে আয় কমে যাওয়া— এই দ্বিমুখী চাপে মানুষের নাভিশ্বাস ওঠার উপক্রম। সেই যে শুরুটা হয়েছিল ইউক্রেন যুদ্ধের বাহানা দিয়ে, তারপর আর থামার নাম নেই। কখনো পেঁয়াজের বোঝা, কখনো-বা সয়াবিন। তারপর একে একে চাউল, ডাল, মরিচ কোনটা নয়! কিন্তু আয়ের মিটার কখনোই ঊর্ধ্বগামী হয় না। বিদ্যুৎ, গ্যাস, সার, ডিজেল, পেট্রোল, এসব তো আছেই! সমাজজীবনের এই বাস্তবতায় বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নতুন করে ‘আরও’ বোয়িং কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে; যার কথা এই লেখার শুরুতে উল্লেখ করেছি। উল্লেখ্য, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তির ধারাবাহিকতায় বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের বহর আধুনিকীকরণ ও সম্প্রসারণের লক্ষ্যে চলতি বছরের এপ্রিলে বিমানের সঙ্গে বোয়িংয়ের ১৪টি নতুন উড়োজাহাজ কেনার বিষয়ে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। সম্পাদিত চুক্তি অনুযায়ী আটটি বোয়িং ৭৮৭-১০ ড্রিমলাইনার, দুটি বোয়িং ৭৮৭-৯ ড্রিমলাইনার ও চারটি বোয়িং ৭৩৭-৮ ম্যাক্স জেট উড়োজাহাজ কেনার কথা। ঐ ১৪টি উড়োজাহাজের বাজারমূল্য প্রায় ৩ দশমিক ৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৪৫ হাজার কোটি টাকা। চুক্তি অনুযায়ী বোয়িংয়ের প্রথম উড়োজাহাজটি ২০৩১ সালের নভেম্বরের মধ্যে বাংলাদেশে পৌঁছানোর কথা এবং বাকি উড়োজাহাজগুলো ২০৩৫ সালের অক্টোবরের মধ্যে বিমানের বহরে যুক্ত হবে।
এ বিষয়ে কার্যক্রম শুরু হয়েছিল বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেই। ২০২৫ সালের জুলাইয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন সচিব মহোদয় বোয়িংয়ের কাছ থেকে ২৫টি উড়োজাহাজ কিনতে ক্রয়াদেশ দেওয়ার কথা জানান। তবে তখনো যার জন্য কেনা হবে এসব উড়োজাহাজ, সেই ‘বিমান কর্তৃপক্ষ’ কিছুই জানে না বলে গণমাধ্যমকে জানিয়েছিল। এরপর গত ৩০ ডিসেম্বর বিমান পরিচালনা পর্ষদে ১৪টি বোয়িং কেনার ‘নীতিগত’ সিদ্ধান্ত হয়। পরবর্তীকালে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচনের মাত্র দুই দিন আগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পাদিত ‘অপ্রকাশযোগ্য বাণিজ্য চুক্তি’তে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এই প্রেক্ষাপটে বর্তমান সরকার আগের ১৪টির সঙ্গে ‘আরও’ বোয়িং কেনার পদক্ষেপ নিচ্ছে। জাতীয় পতাকাবাহী এয়ারলাইনসে বোয়িংয়ের মতো সম্ভ্রান্ত বংশীয় উড়োজাহাজ যুক্ত হবে, কথাটা শুনতে ভালোই শোনায়। কিন্তু প্রশ্নটা অন্য জায়গায়। এর টাকাটা আসবে কোত্থেকে? অর্থনীতিবিদরা হিসাব দেখিয়ে বলছেন, ইতিমধ্যেই আমাদের বৈশ্বিক ঋণ নাকি ১১৩ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। টাকার অঙ্কে সংখ্যাটা কত দাঁড়ায়, তা আমার মাথায় ঢোকে না। তবে এটুকু বুঝতে পারি, জাতীয় ঋণের চাপ আখেরে ঘোড়ারূপী জনগণের পিঠেই চাপবে।
এদিকে কয়েক মাস আগেই, জুন ২০২৬ মাসে, পাইকারি পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম ১৯ দশমিক ৮৫ শতাংশ হারে বাড়ানো হয়েছে। আর গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম গড়ে ১৬ দশমিক ৬৮ শতাংশ ও সঞ্চালন চার্জ ২৩ দশমিক ৯৬ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই বিদ্যুতের দামের প্রভাব অন্যান্য নিত্যপণ্যের ওপরও গিয়ে পড়ছে। কৃষকের সারের দামও নাকি বাড়ছে। অনেক জায়গায় নাকি সরকারনির্ধারিত দামে সার পাওয়াই যাচ্ছে না। এই তো কিছুদিন আগেই, ২৩ জুলাই, প্রকাশিত ইন্টিগ্রেটেড ফুড সিকিউরিটি ফেজ ক্লাসিফিকেশন (আইপিসি)-এর খাদ্যনিরাপত্তাহীনতা বিষয়ক সর্বশেষ বিশ্লেষণে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছিলÑএ বছরের সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে ১ কোটি ৮১ লাখ মানুষ তীব্র খাদ্যনিরাপত্তাহীনতার (আইপিসি ফেজ ৩ বা তার ওপরে) মধ্যে পড়তে পারে, যার মধ্যে ৭ লাখ ৮৭ হাজার মানুষ চরম জরুরি অবস্থায় পড়বে। এদিকে দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র থেকে উৎপাদন ধারাবাহিকভাবে কমছে। সেই ঘাটতি পূরণে ব্যয়বহুল তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানির ওপর সরকার আরও বেশি করে নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। কিন্তু সম্প্রতি মহেশখালীতে এক্সিলারেট এনার্জি পরিচালিত একটি এফএসআরইউ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি অধিকতর জটিল আকার ধারণ করেছে। জানা যায়, এলএনজি আমদানির ব্যয় ২০২০-২১ অর্থবছরের ১৬ হাজার ৫০৫ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রায় ৫৯ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে। এলএনজি আমদানির ব্যয় বাড়ায় সরকারের ভর্তুকির চাপও বেড়েছে। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে এলএনজি আমদানি শুরু করার সময় সরকার প্রায় ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ভর্তুকি দিয়েছিল। এরপর ২০২১-২২, ২০২২-২৩ ও ২০২৩-২৪— এই তিন অর্থবছরে ভর্তুকি ছিল বছরে প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা করে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা বেড়ে ৮ হাজার ৯০০ কোটি টাকা এবং ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বেড়ে ১৪ হাজার ৬০০ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। (ডেইলি স্টার, ২৯ জুলাই, ২০২৬)। শুধু গ্যাস, বিদ্যুৎ, তেলই নয়, মাছ, মাংস, সবজি থেকে শুরু করে প্রতিটা নিত্যপণ্যের দামই বাড়ছে। সেই সঙ্গে বাড়ছে বাসাভাড়া, চিকিৎসা, ওষুধ, যাতায়াত ও সন্তানের লেখাপড়ার খরচ। এদিকে মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগও ক্রমে সংকুচিত হয়ে আসছে। বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক থেকে জানা যায়, গত দুই বছরে পাঁচ শতাধিক কারখানা নানা কারণে বন্ধ হয়ে গেছে। এর ফলে কয়েক লাখ মানুষ তাদের কাজ হারিয়ে ফেলেছে।
এই অবস্থায় স্বাভাবিকভাবেই পরিস্থিতির সঙ্গে তাল মেলাতে গিয়ে সাধারণ মানুষকে রীতিমতো হিমশিম খেতে হচ্ছে। এর মধ্যেই সরকার প্রথমে ১৪টি, পরে ‘আরও’ অনির্দিষ্টসংখ্যক বোয়িং কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। অর্থনীতির সাধারণ সূত্রমতেই এই সবকিছুর চাপ কখনো প্রত্যক্ষ, কখনো পরোক্ষভাবে জনগণের ওপরই পড়ছে। আর এর ফলে জনগণের পশ্চাদ্দেশ দিয়ে অহর্নিশি বারহাট্টার ঘোড়ার মতো যে অনবরত ভটভট শব্দ বেরোচ্ছে, তা যার পশ্চাদ্দেশ সে-ই টের পাচ্ছে। কিন্তু সময়ের অদৃশ্য সহিস তবু বলেই যাচ্ছে ‘যতই ভটভট করো না কেন, দাম আর খরচের বোঝা তোমাকে টানতেই হবে’।
লেখক :সাবেক জাতিসংঘ কর্মকর্তা ও কলাম লেখক

