সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন স্থানে একই পরিবারের একাধিক সদস্যকে নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনার যে ভয়াবহ চিত্র পরিলক্ষিত হইতেছে, তাহা খুবই উদ্বেগজনক। এমন সকল পারিবারিক হত্যাকাণ্ডের খবর আসিতেছে যাহা অত্যন্ত লোমহর্ষক ও হৃদয়বিদারক। এই সকল ঘটনা দেশবাসীকে স্তম্ভিত ও শিহরিত করিয়া তুলিতেছে। সাভারের আশুলিয়ায় তালাবদ্ধ কক্ষ হইতে দম্পতির সহিত তাহাদের নবজাতক সন্তানের অর্ধগলিত লাশ উদ্ধার কিংবা রংপুরে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীসহ তাহার পরিবারকে নিঃশেষ করিয়া দেওয়ার নির্মম দৃশ্য-এই সকল কোনো বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা নহে, বরং ইহা আমাদের সমাজব্যবস্থার গভীর ব্যাধি ও কাঠামোগত অবক্ষয়ের সুস্পষ্ট প্রতিচ্ছবি। হত্যাকাণ্ডসমূহের বাহ্যিক কারণ হিসাবে বলা হইতেছে পারিবারিক বিবাদ, সম্পত্তিসংক্রান্ত বিরোধ, প্রতিশোধস্পৃহা কিংবা ভয়াবহ মাদকাসক্তি ও বেকারত্ব। আসলে ইহার মূল কারণ সর্বগ্রাসী সামাজিক অস্থিরতা। বিশেষ করিয়া, লক্ষ্মীপুর কিংবা চট্টগ্রামের আনোয়ারাতে মাদকাসক্তির করাল গ্রাসে আপন পিতা-মাতা ও স্বজনদের প্রাণ হরণের ঘটনায় স্পষ্ট হয় যে, নৈতিক অবক্ষয় ও সামাজিক নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা আজ কতটা ভঙ্গুর হইয়া পড়িয়াছে। সামাজিক ও পারিবারিক শ্রদ্ধাবোধ, ভ্রাতৃত্ববোধ, অন্যের মঙ্গল কামনা, বিচার-আচার-সালিশ ইত্যাদি আজ যেন বিলুপ্তির পথে। সর্বাপেক্ষা উদ্বেগের বিষয় হইল, পরিবারের ন্যায় যে স্থানটি মানুষের জন্য সবচাইতে নিরাপদ আশ্রয়স্থল হইবার কথা ছিল, সেইখানেই আজ মানুষ নিরাপত্তাহীনতায় ভুগিতেছে।
পরিবারের বাহিরের ব্যক্তিদের দ্বারা আমরা যেমন আক্রান্ত হইতেছি, তেমনি পরিবারের ভিতর হইতেও আমাদের নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হইতেছে যাহা বড় দুশ্চিন্তার বিষয়। নওগাঁওয়ের আত্রাইয়ে স্বামীর বিরুদ্ধে স্ত্রী-সন্তান হত্যা, দিনাজপুরে ছেলেদের বিরুদ্ধে বাবা ও সৎ-ভাই হত্যা, মানিকগঞ্জে দেবরের বিরুদ্ধে ভাবি-ভাতিজা হত্যা, রাজধানীর কলাবাগানে স্বামীর হাতে স্ত্রী-শাশুড়ি হত্যা এবং সুনামগঞ্জে বাবার বিরুদ্ধে দুই শিশুসন্তান হত্যার অভিযোগ-এই সকল কীসের আলামত? সূত্র মতে, গত ছয় মাসে লোমহর্ষক পারিবারিক হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটিয়াছে ১৯টি। এই সকল ঘটনায় প্রাণ হারাইয়াছেন ৫০ জন। ঘটনাগুলি একরকম না হইলেও ইহাতে গভীর সাদৃশ্য রহিয়াছে বলিয়া বিশেষজ্ঞরা বলিতেছেন। শুধু একই পরিবারের একাধিক সদস্য খুনের ঘটনাই নহে, সার্বিকভাবেও খুনের ঘটনা গত বৎসরের তুলনায় চলতি বৎসর বাড়িয়া গিয়াছে। পুলিশ সদর দপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি হইতে জুলাই পর্যন্ত-সাত মাসে সমগ্র দেশে হত্যা মামলা হইয়াছে ২ হাজার ৭৬টি। গত বৎসর ২০২৫ সালের একই সময়ে হত্যা মামলা ছিল ১ হাজার ৯৪৭টি। অর্থাৎ এই বৎসরের প্রথম সাত মাসে হত্যাকাণ্ডের মামলা বাড়িয়াছে ১২৯টি। ইহার মধ্যে অনেক ঘটনা দেশে আলোড়ন সৃষ্টি করিলেও এই সকল অপরাধের দ্রুত তদন্ত ও বিচার সম্পন্ন হইতেছে না, যাহা হতাশাজনক। ফলে এই ধরনের পারিবারিক সহিংসতাও বন্ধ হইতেছে না। মানুষ যদি নিজ ঘরে ও পরিবারেই নিরাপত্তাবোধ না করেন, তাহা হইলে তাহারা যাইবেন কোথায়? তাই পারিবারিক হত্যাকাণ্ডগুলির বিচার যথাসম্ভব দ্রুত সম্পন্ন করা একান্ত প্রয়োজন। কথায় বলে-জাস্টিস ডিলেইড, জাস্টিস ডিনাইড। তাই এই ধরনের মামলাকে অবশ্যই দ্রুত আমলে লইতে হইবে।
নাগরিকদের নিরাপত্তার দায়িত্ব সামগ্রিকভাবে রাষ্ট্রকেই নিশ্চিত করিতে হইবে। এই জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দক্ষতা, আন্তরিকতা ও আইনের শাসন অত্যাবশ্যক। পারিবারিক হত্যাকাণ্ডের অন্যতম কারণ মাদক। এই জন্য সমগ্র দেশে মাদকাসক্তি দূরীকরণ ও নিরাময়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যকর ভূমিকা পালনের পাশাপাশি এই ব্যাপারে প্রতিটি পাড়া-মহল্লায় সামাজিক প্রতিরোধ গড়িয়া তুলিতে হইবে। বেকারত্ব ও দারিদ্র্য এমন হত্যাকাণ্ডের জন্য বহুলাংশে দায়ী। তাই ব্যবসায়-বাণিজ্যের উন্নতি এবং মানুষের কর্মসংস্থানের জন্য ব্যাপক উদ্যোগ গ্রহণ করিতে হইবে। তবে এই জাতীয় ভয়াবহ পারিবারিক সহিংসতা ও হত্যাকাণ্ডের পশ্চাতে বড় চালিকাশক্তি হিসাবে কাজ করিতেছে বিচারহীনতার সংস্কৃতি। অপরাধ সংঘটিত হইবার পর দ্রুত তদন্ত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত না হওয়ায় অপরাধীরা অনেক ক্ষেত্রে বেপরোয়া হইয়া উঠিতেছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে হত্যা মামলার আসামিরা উপযুক্ত সাক্ষ্য-প্রমাণের অভাবে খালাস পাইয়া যাইতেছে। এমন পরিস্থিতির অবসান হওয়া বাঞ্ছনীয়। আমাদের মনে রাখিতে হইবে, রাষ্ট্র যদি নাগরিকদের মনে নিরাপত্তার বোধ ও আস্থা ফিরাইতে ব্যর্থ হয়, তাহা হইলে এই সমাজ অতি শিগগিরই এক চরম অন্ধকারের গহব্বরে নিমজ্জিত হইবে।

