র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) বিলুপ্ত করে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) গঠনের প্রস্তাবিত বিলটি আরও যাচাই-বাছাই ও অংশীজনদের সঙ্গে পরামর্শের দাবি জানিয়েছে বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী। একই সঙ্গে ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) বিল, ২০২৬’-এর আটটি বিষয়ে ভিন্নমত জানিয়েছে দলটি।
মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) জাতীয় সংসদ ভবনে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির বৈঠকে বিলটি পরীক্ষা করে প্রতিবেদন চূড়ান্ত করা হয়। এ সময় লিখিতভাবে বিরোধী দলের মতামত তুলে ধরা হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
র্যাব বিলুপ্ত করে এসআরবি নামে নতুন বাহিনী গঠনের লক্ষ্যে গত বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে বিলটি উত্থাপন করা হয়। পরে চার কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য বিলটি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটিতে পাঠানো হয়। মঙ্গলবার বিকেলে কমিটির বৈঠকে বিলটি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
কমিটির সদস্য জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য আব্দুল বাতেন সাংবাদিকদের বলেন, ‘র্যাব বিলুপ্ত করার অঙ্গীকার ছিল। কিন্তু এখন র্যাব যেভাবে ছিল, অনেকটা সেভাবেই রেখে দেওয়া হয়েছে।’ তিনি জানান, বিলের ৭-৮টি বিষয়ে তারা নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছেন।
বৈঠক সূত্র জানায়, বিলটি দ্রুত পাস না করে সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে পরামর্শ সভা করার প্রস্তাব দিয়েছে বিরোধী দল। পাশাপাশি রেকর্ড সংরক্ষণ, স্বাধীনভাবে অভিযোগ তদন্ত, নিয়মিত নজরদারি, আটক ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা, যথাযথ প্রশিক্ষণ এবং বেআইনি আদেশ পালন না করার ক্ষেত্রে সদস্যদের সুরক্ষার বিষয়ে তারা ভিন্নমত জানিয়েছে।
বিরোধী দলের মতে, প্রস্তাবিত অভিযোগ প্রতিকার কমিটির প্রধান ও সদস্যসচিব এসআরবির কর্মকর্তা হওয়ায় বাহিনীর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ তদন্তে স্বার্থের সংঘাত তৈরি হতে পারে। এ ছাড়া ওই কমিটির ক্ষমতাও সীমিত। এ কারণে অবসরপ্রাপ্ত একজন বিচারপতিকে সভাপতি করে অভিযোগ প্রতিকার কমিটি গঠনের প্রস্তাব দিয়েছে তারা।
প্রস্তাবিত আইনে এসআরবিকে গ্রেপ্তার, তল্লাশি, জব্দ ও অপরাধ তদন্তের ক্ষমতা দেওয়া হলেও বাহিনীর অভিযান ও কার্যক্রমের ওপর আদালত বা জেলা পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নিয়মিত নজরদারি ও প্রতিবেদন দেওয়ার ব্যবস্থা নেই বলে মনে করছে বিরোধী দল।
তাদের প্রস্তাবে বলা হয়েছে, এসআরবি যে জেলায় কার্যক্রম পরিচালনা করবে, সেখানে প্রতি মাসে বিস্তারিত কার্যবিবরণী দিতে হবে। এতে আটক বা নিয়ন্ত্রণে নেওয়া ব্যক্তির নাম, সময়, স্থান, কারণ, থানায় হস্তান্তরের সময় এবং তল্লাশি ও জব্দের তথ্যসহ গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উল্লেখ করতে হবে।
এই প্রতিবেদন চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট বা চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট এবং সংশ্লিষ্ট জেলার পুলিশ সুপার বা পুলিশ কমিশনারের কাছে দেওয়ার প্রস্তাব করেছে বিরোধী দল।
বিরোধী দলের সদস্যরা বলেছেন, বিলে বেসামরিক কোনো ব্যক্তিকে এসআরবি কোথায় এবং কতক্ষণ আটক রাখতে পারবে, তা স্পষ্ট করা হয়নি। এসআরবির নিজস্ব হাজতখানা ও জিজ্ঞাসাবাদ কক্ষ রাখার সুযোগ থাকলেও সেগুলোর অবস্থান প্রকাশ এবং আটক ব্যক্তিদের হেফাজতসংক্রান্ত পূর্ণাঙ্গ রেকর্ড সংরক্ষণের বাধ্যবাধকতা নেই।
এ কারণে এসআরবির প্রতিটি দপ্তর, ক্যাম্প, হাজতখানা ও জিজ্ঞাসাবাদ কক্ষ সরকারি গেজেটে প্রকাশের প্রস্তাব দিয়েছে বিরোধী দল। একই সঙ্গে প্রতিটি আটক ব্যক্তির নাম, আটকের সময় ও স্থান, আইনি কারণ, দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার নাম, চিকিৎসাসংক্রান্ত তথ্য এবং থানায় হস্তান্তরের সময় রেজিস্টারে সংরক্ষণের দাবি জানানো হয়েছে। থানায় হস্তান্তরের সর্বোচ্চ সময়সীমাও আইনে নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে।
বৈঠক শেষে সংসদ সচিবালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) বিল, ২০২৬’ পরীক্ষা করে প্রতিবেদন প্রদানসংক্রান্ত বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। আলোচনা শেষে প্রয়োজনীয় সংশোধন এনে বিলটি জাতীয় সংসদে উপস্থাপনের জন্য সুপারিশ করেছে কমিটি।
বৈঠকে বলা হয়, অতীতে র্যাবসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে বিভিন্নভাবে অপব্যবহার করা হয়েছে। তবে কোনো বাহিনীর অপব্যবহারের কারণে পুরো বাহিনী বিলুপ্ত না করে এর দক্ষ জনবল, বিদ্যমান অবকাঠামো ও সরঞ্জাম যথাযথভাবে কাজে লাগানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
একই সঙ্গে নতুন বা পুনর্গঠিত বাহিনীর সদস্যদের মানসম্মত প্রশিক্ষণ, পেশাদারিত্ব, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি জয়নুল আবেদীনের সভাপতিত্বে বৈঠকে কমিটির সদস্য ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দীন আহমদ, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম, হুইপ রকিবুল ইসলাম, কামরুজ্জামান, মনোয়ার হোসেন, শিরীন সুলতানা, নূরুল ইসলাম ও আব্দুল বাতেন অংশ নেন।

