সরকারবিরোধী মতপ্রকাশ করলেই কাউকে ধরে আনা কিংবা রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে আইন প্রয়োগের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা ও বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী।
মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) জাতীয় প্রেস ক্লাবে জাতীয়তাবাদী সামাজিক সাংস্কৃতিক সংস্থা (জাসাস) আয়োজিত ‘সাম্প্রতিক গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকট-সরকার ও জনগণের করণীয়’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
রিজভী বলেন, গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটকে রাজনৈতিক ইস্যু বানিয়ে জনগণের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি এবং রাজপথে বিশৃঙ্খলা তৈরির চেষ্টা করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, বর্তমান গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট সরকারের তৈরি নয়। বৈশ্বিক যুদ্ধ পরিস্থিতি, এলএনজি আমদানিতে প্রতিবন্ধকতা এবং মহেশখালীর গ্যাস টার্মিনালের কারিগরি ত্রুটির কারণে পরিস্থিতি জটিল হয়েছে। তবে সংকট সমাধানে সরকার বসে নেই, বরং বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব বলেন, সরকারের নিজস্ব ভূমিকা ও উদ্যোগ রয়েছে। কিন্তু সেই উদ্যোগকে পাশ কাটিয়ে রাস্তায় বিশৃঙ্খলা তৈরি করে জনগণকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা আমরা দেখতে পাচ্ছি। লকডাউনের নামে কিংবা নানা কর্মসূচির মাধ্যমে রাজপথ দখল করে রাখার হুমকি কোনো গণতান্ত্রিক সমাজে গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
তিনি বলেন, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় বিরোধীদলের সরকারের সমালোচনা করার অধিকার রয়েছে। সরকারের প্রতিটি কাজের সমালোচনা করার অধিকারও বিরোধীদলের আছে। গঠনমূলক সমালোচনার মাধ্যমে সরকার তার ভুল-ত্রুটি বুঝতে পারে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারে। একইভাবে বিরোধীদলকেও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।
গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটের প্রসঙ্গ তুলে রিজভী বলেন, বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ চলছে। হরমুজ প্রণালি ও পারস্য উপসাগরকে কেন্দ্র করে সংঘাতের কারণে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ওই পথে বিপুলসংখ্যক জাহাজ চলাচল করে এবং বাংলাদেশের আমদানি করা এলএনজির বড় একটি অংশও এ পথ দিয়ে আসে।
তিনি বলেন, সমুদ্রপথে যুদ্ধের কারণে জাহাজ চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। কোথাও মাইন পাতা হচ্ছে, আবার কার্গো জাহাজেও হামলার ঘটনা ঘটছে। এমন পরিস্থিতিতে এলএনজি আমদানিনির্ভর একটি দেশের জাতীয় গ্রিডে পর্যাপ্ত গ্যাস সরবরাহ করা, বাসাবাড়িতে রান্নার গ্যাস দেওয়া, কলকারখানা চালানো এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন স্বাভাবিক রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।
এই উপদেষ্টা বলেন, বিষয়টি শুধু বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ কোনো সমস্যা নয়; এর সঙ্গে বৈশ্বিক পরিস্থিতিও গভীরভাবে জড়িত। তাই সংকটের বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে কথা বলতে হবে।
তিনি বলেন, সরকার অতীতের ব্যর্থতার কথা বলে চুপ করে বসে নেই। সংকট মোকাবিলায় অতিরিক্ত প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দ্রুত গ্যাস আমদানির জন্য পার্শ্ববর্তী ও নিকটবর্তী দেশগুলোর সঙ্গেও যোগাযোগ ও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। মিয়ানমার, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়াসহ বিভিন্ন উৎস থেকে গ্যাস সংগ্রহের ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
মহেশখালীর এলএনজি টার্মিনালের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, সেখানে কারিগরি ত্রুটি দেখা দিয়েছে এবং সেটি মেরামতের কাজ চলছে। একদিকে বৈশ্বিক যুদ্ধের কারণে এলএনজি সরবরাহে সমস্যা, অন্যদিকে দেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ টার্মিনালের কারিগরি ত্রুটি—দুই কারণে বর্তমান পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
রিজভী বলেন, এই সংকট সরকারের কার্যক্রমের বাইরের বাস্তবতার সঙ্গেও সম্পর্কিত। অথচ বিষয়টিকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করে জনগণকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব বলেন, কোনো রাজনৈতিক দল যদি সরকারের সমালোচনা করে, তাহলে শুধু সমস্যা তুলে ধরলেই হবে না; সংকট সমাধানের পথও দেখাতে হবে। আমরা বলেছি, আপনারা সমাধানের একটি রূপরেখা দেন, সমাধানের পথ বের করেন। বিরোধীদলেরও দায়িত্ব রয়েছে।
রিজভী বলেন, কোনো সরকারের কাজ সন্দেহজনক মনে হলে জনগণের আদালতে যাওয়ার এবং অভিযোগ করার অধিকার থাকা উচিত। কিন্তু মানুষ যেন মামলা করতে সাহস না পায়, সেজন্য দায়মুক্তির ব্যবস্থা করা হয়েছিল। তার মতে, এটি ছিল দুর্নীতির মানসিকতা থেকে তৈরি একটি ব্যবস্থা।
রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করার গুরুত্ব তুলে ধরে রিজভী বলেন, আমাদের প্রতিষ্ঠানগুলো শক্তিশালী না হওয়ায় গণতন্ত্র বারবার আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছে। উচ্চতর আদালত, গণমাধ্যম, পুলিশ প্রশাসন, শিক্ষা ব্যবস্থা ও চিকিৎসা ব্যবস্থাসহ রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে স্বাধীন ও শক্তিশালী করতে হবে।
তিনি বলেন, একটি নতুন নির্বাচন প্রক্রিয়ার মধ্যদিয়ে আমরা যাচ্ছি। এই নির্বাচন প্রক্রিয়ার সঙ্গে পুলিশ প্রশাসনসহ বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান সরাসরি যুক্ত। তাই এসব প্রতিষ্ঠানকে দলীয় স্বার্থের বাইরে রেখে দায়িত্বশীলভাবে পরিচালনা করা জরুরি।
রিজভী বলেন, মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে দেশে ১৫ হাজার শিশু নিখোঁজ হওয়ার মতো ঘটনা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এসব ঘটনার পর পুলিশ প্রশাসন অনেক শিশুকে খুঁজে বের করতে সক্ষম হয়েছে। কিন্তু এমন ঘটনা আমাদের প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা, দায়িত্ব ও জবাবদিহি নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে।
তিনি বলেন, পুলিশ প্রশাসনকে যদি দলীয় স্বার্থে ব্যবহার করা হয়, তাহলে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ে। সরকারবিরোধী কোনো মতপ্রকাশ করলেই কাউকে ধরে আনা কিংবা রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে আইন প্রয়োগের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।
বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ও জাসাস কেন্দ্রীয় কমিটির আহ্বায়ক চিত্রনায়ক হেলাল খানের সভাপতিত্বে সেমিনারে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়াম। এতে আরও বক্তব্য রাখেন জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. কামরুল আহসান, জাসাসের সদস্যসচিব জাকির হোসেন রোকন, বিএনপির সহ-সাংস্কৃতিক বিষয়ক সম্পাদক সাইদ সোহরাব, স্বেচ্ছাসেবক বিষয়ক সম্পাদক মীর শরাফত আলী সফু, গবেষণা বিষয়ক সম্পাদক শামিমুর রহমান শামিমসহ প্রমুখ।

