সংসদে প্রধানমন্ত্রী

গভীর সমুদ্রে নতুন এলএনজি টার্মিনাল ও ১৫০ কূপ খনন করবে সরকার

আপডেট : ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৮:৪১

গ্যাসের সরবরাহ সংকট মোকাবিলা ও শিল্পকারখানায় নিরবচ্ছিন্ন উৎপাদন নিশ্চিত করতে ২০৩০-৩১ সালের মধ্যে ১৫০টি কূপ খননের পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। পাশাপাশি নতুন এলএনজি টার্মিনাল স্থাপন, সমুদ্রের ২৬টি ব্লকে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর পরিকল্পনাও তুলে ধরেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) জাতীয় সংসদের প্রশ্নোত্তর পর্বে পৃথক প্রশ্নের জবাবে সরকারের স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি পরিকল্পনার কথা জানান প্রধানমন্ত্রী। অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ।

মহিলা আসন-১৭-এর সংসদ সদস্য সুলতানা আহমেদ জুলাইয়ে একটি এলএনজি টার্মিনাল সাময়িক বন্ধ থাকায় জাতীয় গ্যাস সরবরাহে দৈনিক প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট ঘাটতি এবং শিল্পকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার বিষয়টি তুলে ধরেন। ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিকল্প গ্যাসের উৎস, এলএনজি মজুত সক্ষমতা ও শিল্পাঞ্চলভিত্তিক জরুরি সরবরাহ ব্যবস্থা সম্পর্কে জানতে চান তিনি।

জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আকস্মিক বা সাময়িক গ্যাস সংকটে শিল্পখাতকে সুরক্ষা দিতে ২০৩০-৩১ সালের মধ্যে ১৫০টি কূপ খননের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। দেশীয় গ্যাসের উৎস অনুসন্ধানে ৪ হাজার ৫০০ লাইন কিলোমিটার ২ডি এবং ৪ হাজার ২০০ বর্গকিলোমিটার ৩ডি সাইসমিক জরিপও চলছে।

এ ছাড়া সমুদ্রাঞ্চলের ২৬টি ব্লকে তেল ও গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান নিয়োগে গত ২৪ মে আন্তর্জাতিক বিডিং রাউন্ড আহ্বান করা হয়েছে। দরপত্র জমার সময়সীমা রয়েছে নভেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত। স্থলভাগে অনুসন্ধানে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে ‘বাংলাদেশ অনশোর মডেল পিএসসি ২০২৬’ প্রণয়নের কাজও চলছে।

গ্যাস সরবরাহ বাড়াতে মহেশখালীর কুতুবজোমে নতুন একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল এবং মাতারবাড়িতে একটি স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের কাজ চলছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী কুতুবজোমের টার্মিনাল থেকে ২০২৮ সালে এবং মাতারবাড়ির টার্মিনাল থেকে ২০৩০ সালের ডিসেম্বর নাগাদ গ্যাস সরবরাহের লক্ষ্য রয়েছে।

এর পাশাপাশি পায়রা বা মোংলা বন্দর এলাকা কিংবা দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের উপকূলীয় এলাকায় গভীর সমুদ্রে আরও একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের সম্ভাব্যতা যাচাই করা হচ্ছে। বর্তমানে দেশে থাকা দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের মাধ্যমে গড়ে দৈনিক প্রায় ৯৩৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব বলে সংসদে জানান প্রধানমন্ত্রী।

ভোলার গ্যাস এলএনজি আকারে মূল ভূখণ্ডে এনে শিল্পে সরবরাহের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। এ ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক অঞ্চল, ইপিজেড ও বিসিকের মতো পরিকল্পিত শিল্পাঞ্চলগুলো অগ্রাধিকার পাবে।

অন্য এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি চাহিদা মেটাতে নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা জানান। আমদানিকৃত জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে পরিবেশবান্ধব ও টেকসই জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে ২০২৬-৩০ মেয়াদের জাতীয় নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কৌশলপত্র প্রণয়ন করা হয়েছে।

সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের অন্তত ২০ শতাংশ এবং ২০৪০ সালের মধ্যে ৩০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে সৌরবিদ্যুৎকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

পরিকল্পনায় ২০৩০ সালের মধ্যে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ থেকে ৫ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট এবং ভূমিভিত্তিক সৌর প্রকল্প থেকে আরও ৪ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য রাখা হয়েছে। পাশাপাশি বায়ু বিদ্যুৎ, বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ, পানিবিদ্যুৎ, ভাসমান সৌরবিদ্যুৎ ও কৃষিভিত্তিক সৌর প্রকল্পের মাধ্যমে আরও ৪৫০ থেকে ৫৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ গ্রিডে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।

নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে সৌর প্যানেল, ইনভার্টার, ব্যাটারি ও সংশ্লিষ্ট সরঞ্জাম আমদানিতে বিভিন্ন শুল্ক ও কর ছাড়ের ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে। ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থাকে উৎসাহিত করতে নেট মিটারিংয়ের আওতায় উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে বিক্রির সুযোগও রাখা হয়েছে।

সরকারের নীতিমালার মধ্যে রয়েছে সরকারি জমিতে পিপিপি পদ্ধতিতে প্রকল্প বাস্তবায়ন, বেসরকারি বিনিয়োগে প্রণোদনা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতিমালা, নেট মিটারিং, জাতীয় রুফটপ সোলার কর্মসূচি, বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং অনশোর বায়ুবিদ্যুৎ উন্নয়নের উদ্যোগ।

সরকারের ভাষ্য, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি এলএনজি অবকাঠামো সম্প্রসারণ এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধির মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই এসব পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য।

 

ইত্তেফাক/এসএ