আশুলিয়ার ত্রিপল মার্ডারের নেপথ্যে পরকীয়া, আদালতে আসামির স্বীকারোক্তি

আপডেট : ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২০:০২

সাভারের আশুলিয়ায় তালাবদ্ধ একটি কক্ষ থেকে এক দম্পতি ও তাদের সদ্য ভূমিষ্ঠ সন্তানের অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় মনিরুজ্জামান ওরফে হৃদয় (৪৪) নামে এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। গ্রেপ্তারের পর জিজ্ঞাসাবাদে হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেন তিনি।

সর্বশেষ বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দিয়েছেন মনিরুজ্জামান।

এদিন দুপুরে পিবিআই ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার এম এন মোর্শেদ পিপিএম স্বাক্ষরিত এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়।

পিবিআই জানায়, নিহত নারী নাজমা খাতুনের সঙ্গে মনিরুজ্জামানের দীর্ঘদিনের প্রেম ও শারীরিক সম্পর্ক ছিল। ওই সম্পর্ককে কেন্দ্র করে নাজমার স্বামী আলমগীর কবিরের সঙ্গে মনিরুজ্জামানের বিরোধ তৈরি হয়। সেই বিরোধের জেরেই হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে।

নিহতরা হলেন দিনাজপুরের নবাবগঞ্জ থানার নিশা কাজলদীঘি এলাকার আলমগীর কবির (৪৫), তার স্ত্রী নাজমা খাতুন (৩৯) এবং তাদের সদ্য ভূমিষ্ঠ সন্তান। নাজমার বাড়িও দিনাজপুরের নবাবগঞ্জ উপজেলার বড় মাগুরা এলাকায়।

পিবিআই জানায়, গত ৫ সেপ্টেম্বর আশুলিয়ার জামগড়া এলাকার হযরত আলীর বাড়ির দ্বিতীয় তলার ৫৬ নম্বর কক্ষ থেকে দুর্গন্ধ ছড়ালে স্থানীয়রা জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ ফোন করেন। পরে আশুলিয়া থানা-পুলিশ তালাবদ্ধ কক্ষের দরজা খুলে এক পুরুষ, এক নারী ও একটি নবজাতকের অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধার করে। 

এ ঘটনায় নাজমার বড় বোন শাপলা বেগম বাদী হয়ে ৬ সেপ্টেম্বর আশুলিয়া থানায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে হত্যা মামলা করেন। মামলাটি পিবিআইয়ের তফসিলভুক্ত হওয়ায় ৮ সেপ্টেম্বর সংস্থাটি স্ব-উদ্যোগে তদন্তভার গ্রহণ করে। পরে গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে ওই দিনই আশুলিয়ার নরসিংহপুর এলাকা থেকে মনিরুজ্জামান ওরফে হৃদয়কে গ্রেপ্তার করা হয়।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআই ঢাকা জেলার উপ-পরিদর্শক (এসআই) আনিসুর রহমানের তদন্ত এবং আদালতে দেওয়া আসামির জবানবন্দির বরাতে পিবিআই জানায়, নাজমার সঙ্গে মনিরুজ্জামানের দীর্ঘদিনের প্রেম ও শারীরিক সম্পর্ক ছিল। বিয়ের আগ থেকেই তাদের মধ্যে এ সম্পর্ক ছিল বলে তদন্তে উঠে এসেছে। বিষয়টি জানতে পেরে নাজমার স্বামী আলমগীরের সঙ্গে মনিরুজ্জামানের বিরোধ তৈরি হয়।

জবানবন্দিতে মনিরুজ্জামান দাবি করেন, ঘটনার দিন নাজমা ও আলমগীর তাকে তার বাসা থেকে ডেকে নিয়ে যান। সেখানে পুরোনো সম্পর্কের বিষয় নিয়ে কথা-কাটাকাটি ও হাতাহাতি হয়। একপর্যায়ে আলমগীর তাকে মারধর করেন এবং নাজমা ঝাড়ু দিয়ে আঘাত করেন। পরে ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে মনিরুজ্জামান নাজমার পেটে লাথি মারেন বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে নাজমা (তখনই ভূমিষ্ট হওয়া সন্তান) ও তার গর্ভের সন্তান মারা যায় বলে তিনি দাবি করেন।

এরপর আলমগীর খুন্তি ও পাইপ দিয়ে মনিরুজ্জামানকে আঘাত করলে তাদের মধ্যে আবারও ধস্তাধস্তি হয়। একপর্যায়ে মনিরুজ্জামান আলমগীরের মাথা ও শরীরে কয়েকটি ঘুষি মারেন। আলমগীর দুর্বল হয়ে পড়লে তার গলায় গামছা পেঁচিয়ে শ্বাসরোধে মৃত্যু নিশ্চিত করা হয় বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

হত্যাকাণ্ডের পর তিনজনের মরদেহ খাটের ওপর রেখে মনিরুজ্জামান ঘটনাস্থল থেকে চলে যান বলে পিবিআই জানায়। যাওয়ার সময় তিনি নাজমার ব্যবহৃত অ্যান্ড্রয়েড মুঠোফোন, সিম, অফিসের পরিচয়পত্র ও হ্যান্ড পার্স নিয়ে যান। পরে তার দেওয়া তথ্য ও দেখানো স্থান থেকে এসব আলামত উদ্ধার করা হয়েছে।

পিবিআই ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার এম এন মোর্শেদ পিপিএম বলেন, গ্রেপ্তার মনিরুজ্জামান আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। এ ঘটনায় আর কেউ জড়িত আছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। মামলার তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।

পিবিআই আরও জানায়, মনিরুজ্জামানের বিরুদ্ধে এর আগে একটি হত্যা মামলায় সন্দেহভাজন আসামি হিসেবে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছিল। ২০২২ সালে আশুলিয়া থানায় দায়ের করা ওই মামলায় ২০২৩ সালে তার বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়।

ইত্তেফাক/এপি