সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি আর কোনো দেশের অধীন থেকে পরিচালিত হবে না

আপডেট : ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২:০৭

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি আর কোনো দেশের অধীন থেকে পরিচালিত হবে না বলে জাতীয় সংসদে স্পষ্ট ঘোষণা দিয়েছেন বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান। বৃহস্পতিবার রাতে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনের সমাপনী বক্তব্যে তিনি এই মন্তব্য করেন।

স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সমাপনী অধিবেশনে প্রায় ৪০ মিনিটের বক্তব্যে তিনি বৈদেশিক সম্পর্ক, সীমান্ত হত্যা, সংবিধান সংস্কার, জুলাই গণহত্যার বিচার, দুর্নীতি দমন এবং শিল্প খাতের সংকটসহ দেশের সমসাময়িক নানা গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু তুলে ধরে তীব্র সমালোচনা ও সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবনা তুলে ধরেন।

ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্কের কথা স্বীকার করলেও দেশের স্বার্থকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দেওয়ার কথা পুনর্ব্যক্ত করে শফিকুর রহমান বলেন, প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে আলোচনা ও সৌহার্দ্য থাকবে, প্রয়োজনে সমানে সমান লড়াইও হবে, কিন্তু বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি আর কারও অধীন থেকে পরিচালিত হবে না। অতীতে অন্যের কথামতো চলার সেই অধ্যায় চিরতরে বন্ধ হয়ে গেছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।

এ সময় সীমান্ত হত্যা বন্ধের জোর দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, ফেলানীর মতো আর কোনো বাংলাদেশি নাগরিকের লাশ আর কাঁটাতারে ঝুলতে দেখতে চান না। পাশাপাশি গঙ্গা পানিচুক্তির নবায়ন এবং দীর্ঘদিনের তিস্তা সংকটের স্থায়ী সমাধানে সরকারকে এখন থেকেই শক্ত অবস্থান নেওয়ার আহ্বান জানান। বিদেশে পালিয়ে থাকা ব্যক্তিদের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, যারা অপরাধ করে দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন এবং নানা অপপ্রচারে দেশীয় পরিবেশ অস্থিতিশীল করার পাঁয়তারা করছেন, তাদের সেই চেষ্টা সফল হবে না; কারণ কোনো সৎ মানুষ পালায় না, পালায় কেবল অপরাধীরা।

সংবিধান সংস্কার ও গণভোটের রায়:

গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত গণভোটে ৬৮ দশমিক ২ শতাংশ মানুষের ‘হ্যাঁ’ ভোটের রায়কে সম্মান জানানোর আহ্বান জানিয়ে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, ভবিষ্যতে ফ্যাসিবাদের পুনরাবৃত্তি রোধে কাঠামোগত পরিবর্তন অত্যন্ত জরুরি। সাধারণ উপায়ে সংবিধান সংশোধন করা হলে আদালতে তা চ্যালেঞ্জ হওয়ার ঝুঁকি থাকে, তাই গণপরিষদ বা সংস্কার পরিষদের মাধ্যমে সংবিধান সংস্কার করার ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেন। জুলাই গণহত্যার বিচার প্রক্রিয়ায় বর্তমান সময়ে গতি শ্লথ হয়ে পড়েছে বলে অভিযোগ করে তিনি শহীদ পরিবারগুলোর আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী এই বিচারকাজ দ্রুত সম্পন্ন করার জোর তাগিদ দেন।

বরাদ্দে বৈষম্য ও সম্পত্তি হস্তান্তর বিল:

সংসদ সদস্যদের উন্নয়ন বরাদ্দ ও সংরক্ষিত আসনের নারী সংসদ সদস্যদের ক্ষেত্রে বৈষম্যের অভিযোগ তুলে শফিকুর রহমান বলেন, ১৮ কোটি মানুষের করের টাকায় রাষ্ট্র পরিচালিত হয়, তাই রাজনৈতিক মতপার্থক্য ভুলে সবার জন্য আনুপাতিক হারে কাজ ও বরাদ্দের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। এছাড়া সম্প্রতি সংসদে পাস হওয়া সম্পত্তি হস্তান্তর-সংক্রান্ত বিলটি কোরআন ও সুন্নাহর সঙ্গে সাংঘর্ষিক দাবি করে এতে স্বাক্ষর না করার জন্য রাষ্ট্রপতির প্রতি বিনীত অনুরোধ জানান এবং বিলটি ইসলামিক ফাউন্ডেশনের বিশেষজ্ঞদের কাছে পাঠানোর প্রস্তাব করেন।

অর্থনীতি, শিক্ষা ও শিল্প খাতের সংকট:

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের কারণে তৈরি পোশাকসহ বিভিন্ন শিল্পকারখানার উৎপাদন অর্ধেকে নেমে এসেছে উল্লেখ করে তিনি সতর্ক করেন যে, সময়মতো গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত না করা গেলে বিদেশি ক্রেতারা মুখ ফিরিয়ে নেবে এবং লাখ লাখ শ্রমিকের কর্মসংস্থান হুমকির মুখে পড়বে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক দখলদারি ও অস্ত্রের ঝনঝনানি বন্ধের পাশাপাশি দুর্নীতি রোধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। স্বাস্থ্য খাতের বেহাল দশা তুলে ধরে তিনি তাঁর নিজের নির্বাচনী এলাকা ঢাকা-১৫ এর সরকারি ইউনানী ও আয়ুর্বেদিক মেডিকেল কলেজে তীব্র জনবল সংকটের কথা উল্লেখ করেন এবং অবহেলিত এই খাতের উন্নয়নে কার্যকর নীতিমালার দাবি জানান।

 
ইত্তেফাক/এএম