দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদন

নতুন প্রামাণ্যচিত্রে গাজায় ইসরায়েলের গোপন হত্যার প্রযুক্তি ফাঁস

আপডেট : ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২১:৫০

গাজায় ফিলিস্তিনি বেসামরিক মানুষ হত্যায় ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী কীভাবে গোপন প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ব্যবস্থা ব্যবহার করেছে, তা উঠে এসেছে নতুন একটি প্রামাণ্যচিত্রে। ‘নাজা’ নামের ওই চলচ্চিত্রে ইসরায়েলি সামরিক ও গোয়েন্দা বাহিনীর ২৪ জন সাবেক ও বর্তমান সদস্যের সাক্ষ্য তুলে ধরা হয়েছে।

অস্কারজয়ী ইসরাইলি নির্মাতা ইউভাল আব্রাহাম ও র‍্যাচেল সোর পরিচালিত ‘নাজা’ বৃহস্পতিবার ইতালির ভেনিস আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শিত হয়। চলচ্চিত্রটি উৎসবের মর্যাদাপূর্ণ গোল্ডেন লায়ন পুরস্কারের জন্য প্রতিযোগিতা করা একমাত্র প্রামাণ্যচিত্র।

দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলচ্চিত্রটির নাম ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর একটি সংক্ষিপ্ত রূপ থেকে নেওয়া হয়েছে, যা সামরিক হামলায় নিহত হওয়ার সম্ভাবনা থাকা বেসামরিক মানুষদের বোঝাতে ব্যবহার করা হয়।

চলচ্চিত্রে সাক্ষাৎকার দেওয়া সামরিক ও গোয়েন্দা কর্মকর্তারা গাজায় নজরদারি ও দূর থেকে হত্যার বিভিন্ন পদ্ধতির বর্ণনা দিয়েছেন। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী,  ইসরায়েলি বাহিনী এমন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ব্যবস্থা তৈরি করেছে, যার মাধ্যমে হামাসের তুলনামূলক নিম্নপদস্থ সদস্যদের বিপুলসংখ্যায় শনাক্ত করা হতো। পরে তাদের বাড়িতে রাতের বেলায় হামলা চালানো হতো, যেখানে তাদের পরিবারের সদস্যরাও নিহত হতে পারেন—এ বিষয়টি জানা থাকা সত্ত্বেও হামলা চালানো হয়েছে বলে সাক্ষ্যগুলোতে উঠে এসেছে।

ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী এসব লক্ষ্যবস্তুর অবস্থান শনাক্ত করতে মোবাইল ফোন হ্যাক করত বলেও সাক্ষাৎকারে দাবি করা হয়েছে। এমনকি হামলার ঠিক আগে তাদের স্ত্রী ও সন্তানদের কথোপকথনও গোপনে শোনা হতো বলে জানিয়েছেন সাক্ষাৎকারদাতারা।

প্রামাণ্যচিত্রটিতে এমন কিছু এলাকার ধ্বংসের ঘটনাও তুলে ধরা হয়েছে, যেখানে  ইসরায়েলি বাহিনীর হিসাব অনুযায়ী হামলার সময়ও প্রায় ২৫ শতাংশ বাসিন্দা নিজেদের বাড়িতে অবস্থান করছিলেন। এ ছাড়া বেসামরিক বাড়িঘর পরিকল্পিতভাবে পুড়িয়ে দেওয়া এবং খাদ্য বিতরণকেন্দ্রে বেসামরিক মানুষ হত্যার প্রত্যক্ষ বর্ণনাও রয়েছে।

পরিচালক ইউভাল আব্রাহাম ভেনিসে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, নির্মাতারা সামরিক কর্মকর্তাদের সরাসরি প্রশ্ন করেছিলেন, তারা কী করেছেন এবং এসব ব্যবস্থা কীভাবে কাজ করে। অনেক ক্ষেত্রে শুধু প্রশ্ন করার মধ্য দিয়েই তারা উত্তর পেয়েছেন। কিছু সাক্ষাৎকারদাতা অনুশোচনা প্রকাশ করলেও কেউ কেউ উদাসীনতা কিংবা গর্বের সঙ্গে তাদের কর্মকাণ্ডের কথা বলেছেন।

চলচ্চিত্রে সাক্ষাৎকার দেওয়া কয়েকজন  ইসরায়েলি গোয়েন্দা কর্মকর্তা এমন একটি গোপন ইউনিটে কাজ করেছেন, যেটি সরাসরি ইসরায়েলেরলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর কার্যালয়ে প্রতিবেদন দেয়। তাদের একজন জানিয়েছেন, ওই ইউনিটের একটি লক্ষ্য ছিল ‘শান্তিকে ব্যর্থ করা’।

পরিচালকদ্বয় জানিয়েছেন, ‘নাজা’ নির্মাণের উদ্দেশ্য ছিল  ইসরায়েলি চলচ্চিত্র নির্মাতা ও সাংবাদিক হিসেবে তাদের অবস্থান ব্যবহার করে ফিলিস্তিনি বেসামরিক মানুষ হত্যার পেছনে থাকা সামরিক ব্যবস্থাগুলো অনুসন্ধান করা।

তারা বলেন, চলচ্চিত্রটির বিষয় কোনো বিচ্ছিন্ন ‘যুদ্ধাপরাধ’ নয়, বরং এসব কর্মকাণ্ডের পেছনে থাকা আদেশ, নীতি, প্রচলিত চর্চা, ভাষা ও যুক্তি। অর্থাৎ পুরো ব্যবস্থাটি কীভাবে কাজ করে এবং এর সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা কীভাবে সেই ব্যবস্থার অংশ হয়ে ওঠেন, সেটিই চলচ্চিত্রে তুলে ধরা হয়েছে।

দ্য গার্ডিয়ান জানায়, ‘নাজা’ নির্মাণের আগে ২০২৩ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে গাজা যুদ্ধ নিয়ে একাধিক অনুসন্ধান প্রকাশ করেছিল দ্য গার্ডিয়ান, +৯৭২ ম্যাগাজিন এবং হিব্রু ভাষার সংবাদমাধ্যম লোকাল কল। সেই অনুসন্ধানে ইসরাইলি সামরিক বাহিনীর বিভিন্ন প্রযুক্তি ও লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণের পদ্ধতি নিয়ে তথ্য উঠে এসেছিল।

প্রামাণ্যচিত্রটির প্রদর্শনের পর প্রায় ২৫ মিনিট ধরে দর্শকদের করতালিতে হল মুখরিত ছিল বলে জানিয়েছে ভ্যারাইটি। এটি ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবসহ বড় কোনো চলচ্চিত্র উৎসবে দীর্ঘতম করতালির রেকর্ড হতে পারে বলে সংবাদমাধ্যমটি উল্লেখ করেছে। এ সময় দর্শকদের কয়েকজন ফিলিস্তিনি পতাকাও প্রদর্শন করেন।

‘নাজা’ প্রযোজনা করেছেন জেমস উইলসন এবং নির্বাহী প্রযোজক হিসেবে রয়েছেন অস্কারজয়ী চলচ্চিত্র ‘দ্য জোন অব ইন্টারেস্ট’-এর নির্মাতা জোনাথন গ্লেজার।

ইউভাল আব্রাহাম ও র‍্যাচেল সোর এর আগে ‘নো আদার ল্যান্ড’ চলচ্চিত্রের চারজন সহ-পরিচালকের মধ্যে ছিলেন। ২০২৫ সালে চলচ্চিত্রটি সেরা প্রামাণ্যচিত্র বিভাগে অস্কার জয় করে।

দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বে  ইসরায়েলি হামলার পর গাজায় যুদ্ধ শুরু করে ইসরাইল। এরপর থেকয় ইসরায়েলি হামলায় ৭৩ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত এবং ১ লাখ ৭৪ হাজারের বেশি আহত হয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

 
ইত্তেফাক/এসজে