‘তথাকথিত জি-৭’-কে পুতিনের কটাক্ষ, ব্রিকসের অর্থনৈতিক শক্তির প্রশংসা

আপডেট : ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:৫৬

ব্রিকসের সদস্য দেশগুলোর অর্থনৈতিক শক্তি ও অবদানের প্রশংসা করেছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। একই সঙ্গে বিশ্বের ধনী শিল্পোন্নত দেশগুলোর জোট জি-৭-এর সমালোচনা করেছেন তিনি।

এএনআই জানায়, শুক্রবার ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে ব্রিকস বিজনেস ফোরামে বক্তব্য দেওয়ার সময় পুতিন বলেন, বিশ্বের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) বড় একটি অংশ এখন ব্রিকসের দেশগুলো থেকে আসছে। বিশ্বের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতেও এই দেশগুলোর অবদান জি-৭-এর চেয়ে বেশি।

পুতিন বলেন, বিশ্বের অর্ধেকের বেশি মানুষ ব্রিকসের দেশগুলোতে বাস করে। এসব দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারও দ্রুত বাড়ছে এবং তা খুবই সক্রিয়।

শনিবার ১৮তম ব্রিকস সম্মেলনের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হওয়ার কথা। এর আগে শুক্রবার ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করেন পুতিন। ব্রিকস বিজনেস ফোরামে পুতিন জি-৭-কে ‘তথাকথিত জি-৭’ হিসেবে উল্লেখ করেন। জি-৭-এ রয়েছে কানাডা, ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, জাপান, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্র।

পুতিন বলেন, গত পাঁচ বছরে বিশ্বের মোট জিডিপির ৪০ শতাংশের বেশি এসেছে ব্রিকসের দেশগুলো থেকে। অন্যদিকে জি-৭-এর অবদান ছিল ২৯ শতাংশ। জি-৭-কে কেন বিশ্বের অর্থনীতির প্রধান শক্তিগুলোর একটি হিসেবে ধরা হয়, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন পুতিন।

তিনি বলেন, একই সময়ে বিশ্ব অর্থনীতিতে যে প্রবৃদ্ধি হয়েছে, তার অর্ধেকের বেশি এসেছে ব্রিকসের দেশগুলো থেকে। সেখানে জি-৭-এর অবদান মাত্র ১৮ শতাংশ।

পুতিনের মতে, এর একটি বড় কারণ হলো ব্রিকসের দেশগুলোতে বিশ্বের অর্ধেকের বেশি মানুষের বসবাস। ফলে এসব দেশের অভ্যন্তরীণ বাজার বড় এবং দ্রুত পরিবর্তনশীল। বক্তব্যে রাশিয়ার ওপর পশ্চিমা দেশগুলোর নিষেধাজ্ঞারও তীব্র সমালোচনা করেন পুতিন। ইউক্রেন যুদ্ধের পর রাশিয়ার ওপর হাজার হাজার নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। পুতিনের দাবি, রাশিয়ার ওপর ৩০ হাজারের বেশি নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। 

তার ভাষ্য, বিশ্বের অন্য সব দেশের ওপর দেওয়া নিষেধাজ্ঞার মোট সংখ্যার তুলনায় এই সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ। রাশিয়ার তেল আমদানি করা দেশগুলোর ওপরও সম্ভাব্য নিষেধাজ্ঞার প্রসঙ্গ তোলেন তিনি। এ ক্ষেত্রে ভারতসহ বিভিন্ন দেশের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নতুন নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার সম্ভাবনার কথাও উল্লেখ করেন পুতিন। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে প্রতিযোগিতা অনেক সময় খারাপ রূপ নিচ্ছে। রাষ্ট্রীয় পর্যায়েও এমন পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে। পুতিনের অভিযোগ, পাইপলাইন ধ্বংস করা হচ্ছে, আন্তর্জাতিক পরিবহনপথ বন্ধ করার চেষ্টা চলছে এবং সমুদ্রপথে চলাচলকারী জাহাজ দখলের চেষ্টা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন দেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হচ্ছে। পুতিন বলেন, যেসব দেশ নিজেদের স্বার্থকে গুরুত্ব দিয়ে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে চায়, তাদের ওপরও নিষেধাজ্ঞার হুমকি দেওয়া হচ্ছে। তিনি বিশেষ করে ‘দ্বিতীয় পর্যায়ের নিষেধাজ্ঞা’র কথা উল্লেখ করেন। অর্থাৎ কোনো দেশ রাশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্য বা সহযোগিতা চালিয়ে গেলে সেই দেশকেও নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনার হুমকি দেওয়া হচ্ছে- এমন অভিযোগ করেন তিনি।

তবে এসব চাপের মধ্যেও রাশিয়া অর্থনৈতিকভাবে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে বলে দাবি করেন পুতিন। তিনি বলেন, কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেও রাশিয়া সক্রিয়ভাবে কাজ করছে এবং বড় সাফল্য অর্জন করেছে। দেশটি নিজেদের জাতীয় সার্বভৌমত্ব আরো শক্তিশালী করেছে এবং নির্ভরযোগ্য ও দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারদের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়িয়েছে। 

পুতিনের দাবি, গত তিন বছরে রাশিয়ার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বিশ্বের গড় প্রবৃদ্ধির চেয়ে বেশি ছিল। পুতিনের বক্তব্যে বিশ্ব অর্থনীতিতে চলমান পরিবর্তনের বিষয়টিও গুরুত্ব পায়। তার মতে, বিশ্ব অর্থনীতিতে গভীর ও দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন চলছে। তিনি বলেন, একসময় বিশ্বের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি ছিল কিছু পুরোনো অর্থনৈতিক শক্তি। এখন সেই জায়গা ধীরে ধীরে নতুন নতুন অর্থনৈতিক শক্তি দখল করছে। তবে পুরনো অর্থনৈতিক শক্তিগুলোর সক্ষমতা এখনো অনেক বেশি বলে স্বীকার করেন পুতিন। তার মতে, এসব দেশের উন্নত অবকাঠামো, আধুনিক প্রযুক্তি, শক্তিশালী বৈজ্ঞানিক সক্ষমতা এবং উন্নত গবেষণা প্রতিষ্ঠান রয়েছে।

পুতিন বলেন, এটি দুঃখজনক কোনো বিষয় নয়, বরং বাস্তবতা। সময়ের সঙ্গে বিশ্ব অর্থনীতি ও শক্তির ভারসাম্য বদলানো স্বাভাবিক। তিনি বলেন, বিশ্ব সব সময় পরিবর্তিত হচ্ছে এবং অর্থনীতিতেও পরিবর্তন আসবে—এটাই স্বাভাবিক নিয়ম। পুতিনের বক্তব্যে মূলত বিশ্ব অর্থনীতিতে ব্রিকসের ক্রমবর্ধমান গুরুত্বের বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। তার মতে, জনসংখ্যা, অভ্যন্তরীণ বাজার এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির দিক থেকে ব্রিকস এখন বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম বড় শক্তি। রাশিয়ার ওপর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার সমালোচনা করে তিনি একই সঙ্গে ব্রিকসের সদস্য ও অংশীদার দেশগুলোর মধ্যে অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন।

ইত্তেফাক/পিএস