পৃথিবীর মোট ভূখণ্ডের প্রায় এক-চতুর্থাংশ জুড়ে লুকিয়ে আছে এক রহস্যময় ভুবন- গুহা ও কার্স্ট ল্যান্ডস্কেপ। কোটি কোটি মানুষের পানের পানির প্রধান উৎস এই গোপন ভূগর্ভস্থ পরিবেশ। প্রাচীন শিলার দ্রবীভূত হওয়ার মহাকাব্যিক প্রক্রিয়ায় গড়ে ওঠা এই জগৎ যেমন সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্যকে আগলে রেখেছে, তেমনি বুকের ভেতর ধারণ করে আছে মানব ইতিহাসের প্রাচীনতম দলিল।
ইউনেস্কো ১৩ সেপ্টেম্বর তারিখটি আন্তর্জাতিক গুহা ও কার্স্ট দিবস হিসেবে ঘোষণা করেছে। বিশ্বজুড়ে এই ভঙ্গুর বাস্তুতন্ত্র সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে দিনটি পালন করা হবে। এবারই প্রথম দিবসটি পালন করা হচ্ছে। বৈশ্বিক ভূপার্ক এবং জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে কার্স্ট অঞ্চলের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে।
পৃথিবীর মোট ভূভাগের ১৫ থেকে ২৫ শতাংশ এলাকায় গুহার উপস্থিতি দেখা যায়। বৃষ্টির পানি ও খনিজ পাথরের রাসায়নিক বিক্রিয়ায় এই ল্যান্ডস্কেপগুলো তৈরি হয়। ভূগর্ভস্থ পানির রিজার্ভ বা অ্যাকুইফার বিশ্বের প্রায় ১৬ শতাংশ মানুষের পানির চাহিদা মেটায়। এ কারণে প্রাচীনকাল থেকেই মানবসভ্যতা গুহা ও কার্স্ট অঞ্চলের কাছাকাছি গড়ে উঠেছে।
বিজ্ঞান গবেষণার ক্ষেত্রে এই ভূগর্ভস্থ অঞ্চলগুলোর গুরুত্ব অপরিসীম। কানাডার রকি পর্বতমালা থেকে শুরু করে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে লুকিয়ে আছে হাজারও অজানা গুহা। কানাডার ডেরেক ফোর্ড এ গবেষণায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন। তিনি তার গবেষণা দল নিয়ে সুদূর অতীতে বরফ যুগের ইতিহাস খুঁজে বের করেছেন। গুহার ভেতর জমে থাকা খনিজ বা স্পিলিওথিম জলবায়ুর প্রাচীন ইতিহাস সংরক্ষণ করে।
গবেষক জন পোল্যাকের ভাষ্য, পৃথিবীর রূপ দেখতে হলে ভূগোল ও ভূরূপবিদ্যা জানা প্রয়োজন। কার্স্ট ল্যান্ডস্কেপ অধ্যয়নের জন্য চমৎকার একটি ক্ষেত্র। ক্যাসলগার্ড কেভ কানাডার অন্যতম দীর্ঘ ও জটিল একটি গুহা। বরফক্ষেত্রের নিচে অবস্থিত এই গুহায় প্রাচীন হিমবাহের বরফ সরাসরি প্রবেশ করেছে। চরম প্রতিকূল পরিবেশে বেঁচে থাকা দুর্লভ প্রজাতির জলজ ক্রাস্টেসিয়ান এই গুহায় পাওয়া যায়।
কানাডার পার্কস গার্ডের কর্মকর্তা গ্রেগ হর্ন জানান, গুহার ল্যান্ডস্কেপ লাখ লাখ বছর পুরোনো হতে পারে। পৃষ্ঠদেশের ভূপ্রকৃতি তুলনামূলক অনেক নতুন। হিমবাহ গলে যাওয়ার পর এই ল্যান্ডস্কেপগুলো গঠিত হয়। জলবায়ু পরিবর্তনের রহস্য উদ্ঘাটনে গুহার ভেতরের খনিজ আমানত দারুণভাবে সাহায্য করছে। গাছের যেমন বয়স নির্ধারণের বলয় থাকে তেমনি গুহার স্ট্রাকচার দেখে অতীতের বৃষ্টিপাতের রেকর্ড জানা যায়।
পৃথিবীর চুম্বকক্ষেত্রের পরিবর্তনের ইতিহাসও গুহার পাথরে সংরক্ষিত থাকে। লোহার অক্সাইড খনিজের উপস্থিতি চুম্বকীয় মেরুর দিক পরিবর্তন স্পষ্টভাবে প্রকাশ করে। তবে সাধারণ মানুষের কাছে গুহার গুরুত্ব তুলে ধরা বেশ কঠিন। গুহার ভেতরকার চরম অন্ধকার এবং বিপজ্জনক পরিবেশ সাধারণ মানুষের যাতায়াত সীমিত করে। গুহার পরিবেশ অত্যন্ত সংবেদনশীল হওয়ায় গবেষক ও অভিযাত্রীরা গোপনীয়তা বজায় রাখেন। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় নতুন নতুন গুহা আবিষ্কারের গতি বৃদ্ধি পেয়েছে। ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার বিসারো অ্যানিমা গুহা দেশটির সবচেয়ে গভীর গুহা হিসেবে রেকর্ড গড়েছে। ওয়েলস গ্রে প্রভিন্সিয়াল পার্কে আবিষ্কৃত বিশাল গুহার মুখ নেট-দুনিয়ায় আলোড়ন তোলে। দুর্গম অঞ্চলের এসব গুহায় চরম পরিবেশে বেঁচে থাকা ব্যাকটেরিয়া পাওয়া গেছে। এই অণুজীবগুলোর রোগপ্রতিরোধীক্ষমতা বৈশ্বিক অ্যান্টিবায়োটিক সংকটে কাজে লাগতে পারে।
এর আগে র্যাটস নেস্ট কেভ নামক গুহায় প্রাচীন মানবসভ্যতার নানা নিদর্শন পাওয়া গেছে। প্রত্নতাত্ত্বিক খননকাজে সেখানে ৭ হাজার বছরের স্তন্যপায়ী প্রাণীর অবশিষ্টাংশ এবং প্রাচীন পাথরের হাতিয়ার আবিষ্কৃত হয়েছে। প্রকৃতির এই গোপন জগৎ মানবজাতিকে নতুন পথের সন্ধান দিচ্ছে। ভূগর্ভস্থ পানির প্রবাহ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের সঠিক তথ্য পেতে গুহা রক্ষা করা জরুরি। তরুণ প্রজন্মকে কার্স্ট বিজ্ঞান ও ভূগর্ভস্থ পানির গুরুত্ব সম্পর্কে শিক্ষা দেওয়া প্রয়োজন। পৃথিবী নামক গ্রহের নিচে লুকিয়ে থাকা এই অমূল্য সম্পদ টিকিয়ে রাখতে বৈশ্বিক সহযোগিতা বাড়াতে হবে।
সূত্র: ইউনেস্কো ও কানাডিয়ান জিওগ্রাফিক

