রাজধানীর পদ্মা জেনারেল হাসপাতালে ৯ মাস বয়সী আয়ান আবদুল্লাহর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে চিকিৎসায় অবহেলা, চিকিৎসকের অনুপস্থিতি ও অতিরিক্ত বিল আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। তবে হাসপাতাল পরিদর্শনের পর প্রাথমিক পর্যায়ে শিশুটির মৃত্যুর ঘটনায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কোনো অবহেলার প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. মো. জাহিদ রায়হান।
সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) বেলা সাড়ে ১১টার দিকে হাসপাতালের সপ্তম তলায় সাংবাদিকদের ব্রিফিংয়ে তিনি এ কথা জানান।
এর আগে সকাল ১০টার দিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দুই সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল হাসপাতাল পরিদর্শনে যান। হাসপাতালের ম্যানেজারসহ চিকিৎসকদের সঙ্গে প্রায় এক ঘণ্টা কথা বলার পর তারা ব্রিফিংয়ে আসেন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাসপাতাল ও ক্লিনিক বিভাগের পরিচালক ডা. নুরুল ইসলাম এবং ধানমণ্ডি এলাকার সহকারী কমিশনার (ভূমি) জান্নাতুল ফেরদৌস এ সময় উপস্থিত ছিলেন।
অধ্যাপক জাহিদ রায়হান বলেন, শিশুটির শারীরিক জটিলতা ছিল এবং সে একাধিক রোগে ভুগছিল। মৃত্যুর আগে খাদ্যনালিতে খাবার আটকে যাওয়া ও সেপটিসেমিয়ায় আক্রান্ত ছিল সে। প্রাথমিক পর্যায়ে হাসপাতালের কোনো অবহেলা পাওয়া যায়নি।
তিনি বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া লাইভটি যিনি করেছেন, তিনি শিশুটির নিকটাত্মীয় নন; তিনি একজন কনটেন্ট ক্রিয়েটর।
পিআইসিইউ কক্ষে ভাঙচুরের ঘটনাকে ‘ফৌজদারি অপরাধ’ হিসেবে বর্ণনা করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক বলেন, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ চাইলে এ বিষয়ে আইনগত সহযোগিতা নিতে পারে।
চিকিৎসক না থাকার অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি জানান, ঘটনার সময় কনসালটেন্ট ডা. নাজমুল হকসহ দুজন চিকিৎসক হাসপাতালে উপস্থিত ছিলেন। তবে হট্টগোল শুরু হলে নিরাপত্তার কারণে চিকিৎসকরা অন্য একটি কক্ষে অবস্থান নেন।
তবে অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখতে তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে বলে জানান তিনি। তিনি বলেন, তদন্তে শিশুর মৃত্যুর পাশাপাশি হাসপাতালের চিকিৎসাব্যবস্থা, অবকাঠামো এবং অতিরিক্ত ফি আদায়ের অভিযোগও খতিয়ে দেখা হবে। তদন্তের পর রিপোর্ট অনুসারে যে ধরনের গাফিলতি পাওয়া যাবে, সেই অনুসারে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
শিশুর মৃত্যু নিয়ে স্বজনের অভিযোগ
হাসপাতালের মেডিকেল অফিসার ডা. নাজমুল হক জানান, সোমবার শিশুটিকে ছাড়পত্র দেওয়ার কথা ছিল। এর আগেই হঠাৎ তার কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট হয় এবং একপর্যায়ে শ্বাসপ্রশ্বাস বন্ধ হয়ে যায়। আয়ান ১৩ দিন ধরে নানা জটিলতায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিল। রোববার রাত ৯টার পর হঠাৎ তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে কিছুক্ষণ পর তার মৃত্যু হয়।
এরপর রোববার রাতেই আসিফ হাসান নামের একজন ফেইসবুক লাইভে এসে শিশুটির মৃত্যু নিয়ে অভিযোগ তোলেন। পরে ওই লাইভ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
লাইভে আসিফ হাসান দাবি করেন, মৃত্যুর দিন বিকেল পর্যন্ত শিশুটি স্বাভাবিক ছিল। সন্ধ্যায় খাবার খাওয়ানোর সময় তার শরীর নীল হয়ে আসতে থাকে। পরে চিকিৎসকেরা শিশুটিকে লাইফ সাপোর্ট দেওয়ার কথা জানালেও পরিবারের সদস্যদের তাকে দেখতে দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি। পরে শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে চিকিৎসকেরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন বলে লাইভে দাবি করেন আসিফ হাসান।
গণমাধ্যমের তরফ থেকে ওই ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
অন্যদিকে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, উত্তেজিত স্বজনেরা হাসপাতালের মূল্যবান ওষুধ ও চিকিৎসাসামগ্রী নষ্ট করেছেন এবং কয়েকজন নার্সকে মারধর করেছেন।
সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে হাসপাতালের ম্যানেজার সিরাজুল ইসলাম বলেন, আমাদের ডাক্তার সেই সময় ছিল। কিন্তু লাইভের সময় সেই ব্যক্তি প্রাণে মেরে ফেলার হুমকি দেয়, তাই ডাক্তাররা প্রাণ বাঁচাতে একটি কক্ষে নিরাপদে আশ্রয় নেন।
ডাক্তারের রেফারেন্স এবং দালালের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক জাহিদ রায়হান বলেন, “বিষয়টি নিয়ে আমরা লজ্জিত। তবে অনেক সময় হাসপাতালে সিট ভর্তি নেওয়ার মত অবস্থাও থাকে না। তবে তদন্তে এই বিষয়টি গুরুত্ব পাবে।”

