ডিজেলের পরিবর্তে বিদ্যুতে চলবে রেল: ৩৮২২ কোটি টাকার নতুন প্রকল্প উঠছে একনেকে

আপডেট : ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০০:১০

পরিবেশবান্ধব ও আধুনিক যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে তুলতে ডিজেলের পরিবর্তে বিদ্যুতের সাহায্যে ট্রেন পরিচালনার একটি যুগান্তকারী উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এর অংশ হিসেবে নারায়ণগঞ্জ-ঢাকা-জয়দেবপুর সেকশনে ৫২ কিলোমিটার রেলপথে বৈদ্যুতিক ট্র্যাকশন বা ওভারহেড ক্যাটেনারি ব্যবস্থা চালুর একটি মেগা প্রকল্প অনুমোদনের জন্য একনেক সভায় উত্থাপন করা হচ্ছে। ৩ হাজার ৮২২ কোটি টাকা ব্যয়ের এই প্রকল্পটি বাস্তবায়নে আর্থিক সহায়তা দিচ্ছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) এবং ইউরোপীয় বিনিয়োগ ব্যাংক (ইআইবি)।

পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা গেছে, প্রস্তাবিত ‘নারায়ণগঞ্জ-ঢাকা-জয়দেবপুর সেকশনে বৈদ্যুতিক ট্র্যাকশন বাস্তবায়ন’ প্রকল্পের আওতায় ৫২ দশমিক ৩২ কিলোমিটার রেলপথে ট্রেন চলাচলের জন্য ওভারহেড ক্যাটেনারি ব্যবস্থা নির্মাণ করা হবে। প্রকল্পের সুনির্দিষ্ট রূপরেখা অনুযায়ী, প্রতিটি ৫টি কোচ নিয়ে মোট ১৬ সেট ইলেকট্রিক মাল্টিপল ইউনিট (ইএমইউ) বা বৈদ্যুতিক ট্রেন সংগ্রহ করা হবে। এছাড়া ট্রেনগুলোর নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের জন্য জয়দেবপুর প্রান্তে একটি আধুনিক ইএমইউ মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ কারখানা গড়ে তোলা হবে। ২০৩১ সালের জুনের মধ্যে এই প্রকল্পের কাজ সমাপ্ত করার সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে।

প্রাথমিকভাবে প্রকল্পটির প্রস্তাবিত ব্যয় ৪ হাজার ২৮২ কোটি ৮৬ লাখ টাকা ধরা হলেও গত এপ্রিলে প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভায় বিভিন্ন খাতের ব্যয় যৌক্তিক করার ফলে তা ৪৬০ কোটি ৩৫ লাখ টাকা বা প্রায় ১২ শতাংশ হ্রাস পেয়ে চূড়ান্তভাবে ৩ হাজার ৮২২ কোটি ৫১ লাখ টাকায় দাঁড়ায়। এর মধ্যে সরকারি তহবিল থেকে ৯৪২ কোটি টাকা এবং বাকি ২ হাজার ৮৮০ কোটি টাকা এডিবি ও ইআইবির প্রকল্প ঋণ থেকে জোগান দেওয়া হবে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, বৈদ্যুতিক ট্র্যাকশনে ট্রেন চলাচল শুরু হলে প্রচলিত ডিজেল-ইলেকট্রিক ট্রেনের তুলনায় জ্বালানি ব্যয় প্রায় ৪০ শতাংশ এবং রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস পাবে। বৈদ্যুতিক ট্রেনের গতিশীলতা বেশি থাকায় এই পথে ট্রেনের গড় গতিবেগ ১৮ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পাবে এবং ট্রেনগুলো ঘণ্টায় ৮০ থেকে ১০০ কিলোমিটার বেগে চলাচল করতে পারবে। ফলে যাত্রীদের ভ্রমণের সময় উল্লেখযোগ্য হারে কমে আসবে। এছাড়া দেশের অন্যতম ব্যস্ত শিল্পাঞ্চল ও রাজধানীর প্রবেশপথের এই রুটে বৈদ্যুতিক ট্রেন চালুর ফলে সড়কপথের ওপর চাপ কমার পাশাপাশি কার্বন নিঃসরণ হ্রাস পাবে এবং বায়ুদূষণ রোধে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের তুলনায় বৈদ্যুতিক রেলের ব্যবহারে বাংলাদেশ বেশ পিছিয়ে রয়েছে উল্লেখ করে যোগাযোগ অবকাঠামো বিশেষজ্ঞ ও বুয়েটের অধ্যাপক মো. হাদিউজ্জামান বলেন, ভারতে ৭০ শতাংশ এবং চীনে ৯৫ শতাংশ ট্রেন বিদ্যুতে চালিত হলেও আমাদের এই রূপান্তরে দীর্ঘ সময় লাগবে, তাই এখনই এর সূচনা করা জরুরি। তবে এই উদ্যোগ সফল করতে হলে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার পাশাপাশি এই প্রযুক্তির জ্ঞানসম্পন্ন দক্ষ জনবল তৈরির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার তাগিদ দিয়েছেন তিনি। অতীতে ডেমু ট্রেন চালুর ক্ষেত্রে যথাযথ লোকবল ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে কাঙ্ক্ষিত সুফল না পাওয়ার অভিজ্ঞতা থেকে এই প্রকল্পে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দিয়েছেন এই বিশেষজ্ঞ।

পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, প্রাথমিক এই প্রকল্পটি সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে পর্যায়ক্রমে ঢাকা–চট্টগ্রাম রুটেও বৈদ্যুতিক ট্রেনলাইন সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। সার্বিক বিষয়ে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আবদুর রহিম সাকি জানান, পুরো রেলব্যবস্থাকে একটি সমন্বিত পরিকল্পনার আওতায় এনে রেল খাতকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে এবং রেলের সক্ষমতা বৃদ্ধিতে অচিরেই আরও একগুচ্ছ প্রকল্প গ্রহণ করা হবে।

ইত্তেফাক/এএম