২০ লাখের বেশি মানুষের চিকিৎসার প্রধান ভরসা ঝিনাইদহ ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতাল। অথচ ২৫০ শয্যার এই হাসপাতালে নিয়মিত ভর্তি থাকছেন ৪ শতাধিক রোগী। রোগীর চাপের তুলনায় নেই প্রয়োজনীয় চিকিৎসক, নার্স ও সহায়ক জনবল।
হাসপাতালের বিভিন্ন পদে ৭৭টি শূন্য থাকলেও কর্মরত জনবল দিয়ে চলছে অতিরিক্ত রোগীর চিকিৎসা। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে ঘন ঘন লোডশেডিং, লিফট বিকল হওয়া এবং ডায়ালাইসিস, সিসিইউ ও আইসিইউয়ের মতো জরুরি চিকিৎসা সুবিধার ঘাটতি। ফলে একদিকে বাড়ছে রোগীর ভোগান্তি, অন্যদিকে জটিল রোগীদের উন্নত চিকিৎসার জন্য নিতে হচ্ছে অন্যত্র।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে মাত্র ৩৭ জন চিকিৎসক কর্মরত রয়েছেন। চিকিৎসক পদেই শূন্য রয়েছে ২৩টি। হাসপাতাল থেকে চিকিৎসক, নার্সসহ বিভিন্ন পদে ২৬৮ জনবলের চাহিদা দেওয়া হলেও কর্মরত আছেন ১৯১ জন। ফলে ৭৭টি পদে কোনো জনবল নেই।
এর বাইরে তৃতীয় শ্রেণির সহায়ক কর্মচারীদের ২৯টি পদও শূন্য রয়েছে। অপ্রতুল জনবল দিয়ে বহির্বিভাগ, জরুরি বিভাগ ও ভর্তি রোগীদের চিকিৎসা দিতে গিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে সংশ্লিষ্টদের।
জেলার ছয় উপজেলার মানুষের পাশাপাশি পার্শ্ববর্তী এলাকার রোগীরাও চিকিৎসার জন্য এই হাসপাতালে আসেন। প্রতিমাসে বহির্বিভাগে প্রায় ৫০ হাজার মানুষ চিকিৎসা নেন। বর্তমানে হাম ও ডায়রিয়ায় আক্রান্ত শিশু রোগীর সংখ্যাও বেড়েছে। ফলে বিদ্যমান জনবল ও অবকাঠামোর ওপর তৈরি হয়েছে বাড়তি চাপ।
সরেজমিনে দেখা যায়, হাসপাতালের বিভিন্ন ওয়ার্ডে ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি রোগী ভর্তি। বেড না পেয়ে অনেক রোগীকে মেঝেতে কাঁথা-পাটি বিছিয়ে থাকতে হচ্ছে। রোগীর স্বজনদের অভিযোগ, চিকিৎসকরা ওষুধ লিখে দিলেও সব ওষুধ হাসপাতাল থেকে পাওয়া যায় না।
সদর উপজেলার পোড়াহাটি ইউনিয়নের বারইখালি গ্রামের বিল্লাল হোসেন বলেন, ভর্তি হওয়ার পর অনেক সময় বেড পাওয়া যায় না। রোগীর চাপ বেশি হওয়ায় মেঝেতেই থাকতে হচ্ছে। এর ওপর বিদ্যুৎ চলে গেলে দুর্ভোগ আরও বেড়ে যায়।
হাসপাতালের অর্থোপেডিকস সার্জন ডা. মনিরুল ইসলাম বলেন, হাসপাতালে ৯০টির বেশি চিকিৎসক পদ থাকলেও বর্তমানে কর্মরত মাত্র ৩৭ জন। নার্সেরও সংকট রয়েছে। পর্যাপ্ত জনবল না থাকায় রোগীর চাপ সামলানো কঠিন হয়ে পড়ছে। ডায়ালাইসিস সেন্টার না থাকায় কিডনি রোগীদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়া যাচ্ছে না। একইভাবে সিসিইউ ও আইসিইউ সুবিধা না থাকায় ঝুঁকিপূর্ণ হৃদরোগীদের উন্নত চিকিৎসার জন্য অন্যত্র রেফার করতে হচ্ছে।
হাসপাতালের আটতলা নতুন ভবন চালু হলেও অবকাঠামোগত সংকট কাটেনি। ভবনের দুটি লিফট প্রায়ই বিকল হয়ে পড়ে থাকে। ঘন ঘন বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় লিফটে রোগী ও স্বজনদের আটকে পড়ার ঘটনাও ঘটছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এর আগে লিফট ছিঁড়ে পড়ার ঘটনাও ঘটেছে।
হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, হাসপাতালের পরিচ্ছন্নতা ও সৌন্দর্যবর্ধনের কাজ শেষ করা হয়েছে। ওষুধ ক্রয় ও বিতরণে আগে যেসব অনিয়ম বা গতানুগতিক পদ্ধতি ছিল, সেগুলো অনেকটাই কমে এসেছে। সীমিত চিকিৎসক ও নার্স দিয়েই সাধ্যমতো রোগীদের সেবা দেওয়ার চেষ্টা চলছে। জনবল সংকট কমানো গেলে সেবার পরিধি আরও বাড়ানো সম্ভব হবে।
বিদ্যুৎ সংকটের বিষয়ে তিনি বলেন, হাসপাতালের বর্তমান বিদ্যুৎ ব্যবস্থা চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল। এ কারণে ঘন ঘন লোডশেডিং হচ্ছে। কোনো কোনো সময় বিদ্যুৎ সমস্যার কারণে অপারেশন করাও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে। বর্তমানে একটি ফেজ রয়েছে, দুটি ফেজ করা গেলে বিদ্যুৎ সমস্যা অনেকটা সমাধান হবে।
তিনি আরও বলেন, রোগীদের ভোগান্তি কমানো এবং দালালদের দৌরাত্ম্য বন্ধে কাজ করা হচ্ছে। বর্তমানে দালালদের দৌরাত্ম্য প্রায় শূন্যের কোঠায়। ২০ লাখের বেশি মানুষের জন্য ২৫০ শয্যা পর্যাপ্ত নয়। রোগীর চাপ বিবেচনায় শয্যা সংখ্যা আরও বাড়ানো প্রয়োজন।
ঝিনাইদহের সিভিল সার্জন ডা. মো. কামরুজ্জামান বলেন, ২৫০ শয্যার হাসপাতালের চিকিৎসক পদে শূন্যতা সেবার মান উন্নয়নে বড় অন্তরায়। বিষয়টি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে জানানো হয়েছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রী বিষয়টি দেখার পর নতুন করে দুজন চিকিৎসককে ডেপুটেশনে দেওয়া হয়েছে। হাসপাতালের সার্বিক উন্নয়নে কাজ চলমান রয়েছে। জনবল সংকট নিরসন করা গেলে চিকিৎসাসেবা আরও সহজ ও উন্নত হবে।

