সম্পত্তি হস্তান্তর (সংশোধন) বিল ২০২৬ কোরআন-সুন্নাহর সুস্পষ্ট পরিপন্থি বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও জাতীয় সংসদের বিরোধী দলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেছেন, বর্তমান সরকার কোরআন-সুন্নাহ বিরোধী একটা আইন পাস করেছে। যা সুস্পষ্টভাবে আল্লাহ্ কোরআন এবং রাসূল (সা.) এর খেলাফ। সরকারকে এর মূল্য দিতে হবে। এই আইনের কারণে ঘরে ঘরে বিপর্যয় সৃষ্টি হবে। এই হারাম আইন প্রত্যাহার করে নিতে হবে।
শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) রাতে রংপুর জিলা স্কুল মাঠে ১১ দলীয় ঐক্যর ঢাকা-রংপুর লং মার্চের সমাপনী সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
বিরোধী দলীয় নেতা বলেন, সরকার সাহস করে বলে না গণভোট মানি না। তারা ইনিয়ে-বিনিয়ে বলে সংবিধানে গণভোট নাই। সংবিধানে যদি গণভোট না থাকে, তাহলে কোনো সংবিধান মেনে চব্বিশের গণবিপ্লব হয়নি। ফ্যাসিস্টদের সংবিধান অনুসরণ করে আপনারা তাড়াতে পারেননি, আমরাও পারি নাই। সংবিধানের বাইরে গিয়েই ফ্যাসিস্টমুক্ত বাংলাদেশ করা হয়েছে। যদি সংবিধানে গণভোট না থাকে, ছাব্বিশ সালে বাংলাদেশে কোনো নির্বাচনও নাই, কোনো সরকারও নাই। সুতরাং মানতে হলে সবটাই মানতে হবে। আর বাদ দিতে হলে সবটাই বাদ দেওয়ার ঘোষণা দিতে হবে। তখন দেখা যাবে কার বুকের পাটা কতটুকু।
বিএনপি সরকার গঠনের পর তাদের সব ওয়াদা ভুলে গেছে দাবি করে জামায়াত আমির বলেন, নির্বাচিত হওয়ার আগে তারা দফায় দফায় জাতির কাছে ওয়াদা দিয়েছেন। কিন্তু আজব ব্যাপার তারা সংসদে গিয়ে সব ভুলে গেছেন। সরকার গঠন করার পরে একটা একটা করে তারা সবকিছুতে উল্টা পথে চলছেন। যে পথে হাসিনা চলে ফ্যাসিবাদ কায়েম করেছিল, আমরা স্পষ্টভাবে দেখছে পাচ্ছি সেই একই পথ ধরে বর্তমান সরকার হাঁটছে। যদি একই পথে হাঁটেন তাহলে পরিণতি একই হবে।
ওয়াদা ভঙ্গ করায় ১১ দলীয় ঐক্য লং মার্চ কর্মসূচি করছে উল্লেখ করে শফিকুর রহমান বলেন, তোমরা (বিএনপি) ওয়াদা রাখো আজকে ঘোষণা করে দাও আমরা যা করেছি ভুল করেছি; এখন সব সংশোধন করে নেবো এবং দৃশ্যমান বাস্তবায়ন করে আমাদেরকে দেখাও। তাহলে আমাদের লং মার্চের প্রয়োজন হবে না। কিন্তু যদি না হয়, লং মার্চের পর যে কি হবে সেটা আল্লাহ ভাল জানেন। সমস্ত অপশক্তি, অন্যায় এবং ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে আমাদের লড়াই চলবে। আট দফা যেকোনো সময় জাতির প্রয়োজনে এক দফায় পরিণত হতে পারে। আমরা চাই সেই এক দফার আগে সরকারের শুভ বুদ্ধির উদয় হোক। যদি না হয়, বসে বসে আঙুল চুষবো না। সংসদের ভিতরে তীব্র প্রতিবাদ এবং রাজপথে সমানতালে আন্দোলনও চলবে।
তিনি আরও বলেন, দেশে বিদ্যুৎ, গ্যাস, সার ও কর্মসংস্থান নেই। কিন্তু একদলের লোকেরা ঠিকই কাজ পায়, সেই কাজ হলো চাঁদাবাজি। সারা দেশে চাঁদাবাজি আছে। চাঁদাবাজদের জ্বালায় জাতি অস্থির। চাঁদাবাজদের কারণে দ্রব্যমূল্য তিন-চারগুণ। চাঁদাবাজদের কারণে মানুষের জীবনও চলে যাচ্ছে। চাঁদা না পেয়ে মানুষ খুন করা হচ্ছে। এমনকি পরের মানুষ যখন না পায় তখন নিজের মানুষকে পাথর মেরে খুন করে। এরা সন্ত্রাসী যারা এই কাজ করে।
তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন প্রসঙ্গ তুলে ধরে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, নির্বাচনের আগে লালমনিরহাটের এমপি ‘জাগো বাহে কোণ্ঠে সবাই তিস্তা বাঁচাই’ আওয়াজ দিয়েছিলেন। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর চীন সফর শেষে সংসদে পানিসম্পদ মন্ত্রী পরিষ্কারভাবে বলছেন- যে নামেই হোক তিস্তা পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হবে। সাত মাস চলে গেল নড়াচড়া যে কিছু বুঝি না। কোনদিক থেকে কোন পানিপরা খাইলেন, এখন যে আপনাদের কণ্ঠে এতো জোর দেখি না। জনগণকে বারবার ধোকা দেওয়া ঠিক হবে না।
তিনি আরও বলেন, নির্বাচনের আগে এই মাঠে বলেছিলাম সরকার নির্বাচিত হলে আমরা তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করব। গোটা উত্তরবঙ্গকে কৃষির রাজধানী হিসেবে গড়ে তুলব। নদীগুলোর জীবন আমরা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করব ইনশাআল্লাহ। ভোট আপনারা দিয়েছেন ইঞ্জিনিয়ারিং করে আপনাদের প্রিয় প্রার্থী, মানুষ ও দলের বিজয় তারা ছিনিয়ে নিয়েছে। আল্লাহর বিচার ঘুরে ফিরে যে অপরাধ করে তার ঘাড়ের উপর পড়ে। আমরা সবকিছু সহ্য করছি দেশের স্বার্থে। ফলাফল মেনেছিলাম যেন দেশটা শান্তির দিকে আসে।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, আল্লাহর কসম আট দফার একটা দাবিও আমাদের দলীয় দাবি নয়। এসব দাবি ১৮ কোটি মানুষের দাবি। ১৮ কোটি মানুষের অধিকারের জন্য আমরা রাস্তায় নেমেছি। সরকার জনগণের সাথে কথা দিয়ে কথা রাখেনি। নির্বাচিত হওয়ার আগে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী রংপুর থেকেই ঘোষণা দিয়েছিলেন ‘গণভোটে হ্যাঁ’ বলুন। জনগণ ৭০ ভাগ গণভোটে হ্যাঁ দিয়েছে। কিন্তু তিনি (প্রধানমন্ত্রী) গণভোটের রায় মানেননি, অগ্রাহ্য করেছেন।
সমাবেশে জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির ও রংপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য এটিএম আজহারুল ইসলামের সভাপতিত্বে বক্তব্য রাখেন বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম, লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান ও সাবেক মন্ত্রী ড. কর্নেল অলি আহমদ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মামুনুল হক, বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান ইরান, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টির চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট আনোয়ারুল ইসলাম চান, আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু।
এছাড়াও বক্তব্য রাখেন, এনসিপির সদস্য সচিব ও রংপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য আখতার হোসেন, জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক সংসদ সদস্য মিয়া গোলাম পরওয়ার, নায়েবে আমির অধ্যাপক মজিবুর রহমান, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ড. এ কে এম হামিদুর রহমান আজাদ, সহকারী সেক্রেটারি মাওলানা আব্দুল হালিম, রফিকুল ইসলাম খান, কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য মাওলানা মমতাজ উদ্দিন, কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও রংপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য মাহবুবুর রহমান বেলাল, রংপুর-৫ আসনের সংসদ সদস্য গোলাম রব্বানী।
সমাবেশে আরও উপস্থিত ছিলেন, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব জালাল উদ্দীন আহমদ, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) মুখপাত্র রাশেদ প্রধান, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের মহাসচিব মুফতি ফখরুল ইসলাম, এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক মোহাম্মদ নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম, জামায়াতে ইসলামীর নির্বাহী পরিষদ সদস্য নুরুল ইসলাম বুলবুল, ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সেক্রেটারি জেনারেল সিবগাতুল্লাহ সিবগা, ডাকসুর ভিপি সাদিক কায়েক, ডাকসুর জিএস এস এম ফরহাদ, মিডিয়া ব্যক্তিত্ব ব্যারিস্টার শাহরিয়ার কবির, বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সভাপতি আতিকুর রহমান, জামায়াতে ইসলামীর রংপুর মহানগর আমির এটিএম আজম খান প্রমুখ।
প্রসঙ্গত, গণভোটের গণরায় বাস্তবায়নসহ আট দফা দাবি আদায়ে ১১ দলীয় ঐক্যের ঢাকা-রংপুর লং মার্চ কর্মসূচি হিসেবে রংপুর জিলা স্কুল মাঠে এ সমাপনী সমাবেশ চলে।
এর আগে আট দফা দাবিতে সকালে ঢাকার মানিক মিয়া এভিনিউ থেকে ঢাকা টু রংপুরের এই লং মার্চ শুরু হয়। এরপর গাজীপুরের ভোগরা বাইপাস রোডে প্রথম পথসভা করা হয়। পরে টাঙ্গাইল নগর জালফৈ বাইপাস রোড দ্বিতীয়, সিরাজগঞ্জ হাটিকমরুল মোড়ে তৃতীয়, বগুড়া মাটিডালি বিমান মোড়ে চতুর্থ ও গাইবান্ধার পলাশবাড়িতে পঞ্চম পথসভায় বক্তব্য দেন জামায়াতের আমিরসহ কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ।
১১ দলীয় ঐক্যর পক্ষ থেকে ঘোষিত আট দফা দাবির মধ্যে আছে—গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন ও জুলাই গণহত্যার বিচার, বিদ্যুৎ, তেল, গ্যাস ও সার সংকট নিরসন, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি রোধ, দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও দখলদারি বন্ধ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন, সংকীর্ণ দলীয়করণ বন্ধ এবং তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন।

