বিসিএস বিড়ম্বনা: ওদের দিকে তাকান

আপডেট : ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:২৫

বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের বর্তমান চেয়ারম্যান ড. অধ্যাপক মোহাম্মদ নাজমুজ্জামান ভুঁইয়া একজন মেধাবী সজ্জন মানুষ হিসাবেই পরিচিত। কমিশনের সচিব মো. ফজলুর রহমানও একজন অভিজ্ঞ চৌকশ ক্যাডার কর্মকর্তা হিসাবে কর্মজীবন চালিয়েছেন। অধ্যাপক নাজমুজ্জামান বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক থেকে পিএসসি চেয়ারম্যান। এবারই তিনি জনগণের সম্মুখীন হয়েছেন তার কর্মদক্ষতা, পারদর্শিতা এবং গতি আনার পরীক্ষায়। বিগত চেয়ারম্যান মোবাশ্বের মোমেনও একজন সজ্জন মানুষ ছিলেন বলেই জানি। কিন্তু সজ্জন আর কর্মে গতি আনা এক বিষয় নয়। দীর্ঘকাল ধরে আমরা দেখে আসছি, মেধাবী একজন ছেলে বিসিএস চূড়ান্তভাবে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়ে খুশির বদলে দুশ্চিন্তায় পড়ে যান। কবে তিনি নিয়োগ পাবেন তার কোনো নিশ্চয়তা নাই। অর্থাৎ বিসিএসের ‘সেশন জট’ এক ভয়াবহ আকার ধারণ করে আছে। ৪৪ তম বিসিএস বিজ্ঞপ্তি হয়েছিল ২০২১ সালের ৩০ নভেম্বর। ভাইভা এবং আনুষঙ্গিক কার্যক্রম শেষ হতে প্রায় চার বছর সময় লেগে যায়! একইভাবে ৪৩তম বিসিএসের ক্ষেত্রে ২০২১ সালে অনুষ্ঠিত প্রাথমিক বাছাই পরীক্ষা পার হয়ে ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে চূড়ান্ত সুপারিশ করা হয়। তার পরও স্বাস্থ্য পরীক্ষা, পুলিশ ভেরিফিকেশন এবং মন্ত্রণালয়ের চূড়ান্ত গেজেট নোটিফিকেশনের জন্য ২০২৪ সালের শেষভাগ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছে। ৪০ এবং ৩৮তম বিসিএসের চেহারা আরও ভয়াবহ। কেন, এর উত্তর কারো কাছে নেই। পুলিশ ভেরিফিকেশন, স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং প্রশাসনিক বিন্যাসের জন্য এমন অস্বাভাবিক সময় কেন প্রয়োজন হয়? দেখা গেছে- পিএসসি তার সুপারিশ পাঠাতেও অনেক সময় নিয়ে ফেলে। এরপর জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের যাচাই-বাছাই, পুলিশ ভেরিফিকেশন এসব নিয়ে চিঠি চালাচালি চলতে থাকে। একটি পর্যায়ে এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয় যে, কোনো মন্ত্রণালয়, অধিদপ্তর, পরিদপ্তর সঠিক জবাব দেবেন তারও কোনো ঠিক ঠিকানা থাকে না। 

৪৫তম বিসিএসের ক্যাডার এবং নন-ক্যাডারদের চূড়ান্ত সুপারিশ হয়েছে ২০২৫ সালের নভেম্বরে। অথচ এখন পর্যন্ত প্রায় সব ক্যাডার, নন ক্যাডার সুপারিশপ্রাপ্তরা সম্পূর্ণ অন্ধকারে। তারা জানেন না কবে, কোন কালে তাদের নিয়োগ হবে! কোন অফিসের কাছে তারা জানতে চাইবেন যে, তাদের নিয়োগ কোন পর্যায়ে আছে। অথচ এখন সবকিছু ডিজিটালাইজড, এআই সহায়তাও পাওয়া সম্ভব। কিন্তু আগের তুলনায় কোনো অগ্রগতি নেই! খুবই লজ্জার কথা, পাকিস্তানের সেন্ট্রাল সুপিরিয়র সার্ভিসের চূড়ান্ত সুপারিশের পর তিন থেকে চার মাসের মধ্যে এবং ভারতে ইউনিয়ন পাবলিক সার্ভিস কমিশনে ছয় মাসের মধ্যে নিয়োগ সম্পন্ন হয়, অথচ বাংলাদেশে তিন-চার বছরেও তা সম্পন্ন হয় না। আরও একটি অনাকাঙ্ক্ষিত বিষয় লক্ষ্য করা যায়। কোনো কোনো দপ্তরের কোনো দাবিদাওয়া নিয়ে কেউ মামলা ঠুকে দেন। তখন সেই মামলার কারণে দীর্ঘ সময়ের জন্য নিয়োগ আটকে যায়। অথচ সুবিচারপ্রার্থীদের বিষয়টি বিচারাধীন অবস্থায় থাকতে সুপারিশপ্রাপ্তদের চাকরি আটকে থাকা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক। 

এই বিলম্বের কারণে দেশের সবচেয়ে বড় এবং মর্যাদাপূর্ণ চাকরি যারা পান, তাদের দৃষ্টিভঙ্গি ও চাকরি তিক্ত করে ফেলা হয়। বিসিএস পরীক্ষা গুলশান বনানীর ছেলেমেয়েরা প্রায় দেন-ই না। যারা দেন, তাদের ৯০ শতাংশের চাকরির প্রয়োজন আর ১০ শতাংশের মর্যাদা ও বেকারত্ব ঘোচানোর প্রয়োজন হয়। এরা দিনরাত পড়াশোনা করে কঠিন তিনটি স্তর পার হয়ে সুপারিশপ্রাপ্ত হন। অথচ এই দীর্ঘসূত্রিতা ব্যক্তিজীবন ও প্রশাসনিক সক্ষমতা দুই ক্ষেত্রেই নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। বছরের পর বছর বসে থাকার মধ্য দিয়ে এক ধরনের প্রশিক্ষণ হয়ে যায় যে, ‘তুমিও সরকারি চাকরিতে যোগদান করে সবকিছুকে বিলম্বিত ও জটিল করে তুলবে’। 

অনেকেই আর্থিক অনিশ্চয়তা ও মানসিক চাপ অনুভব করেন। বিসিএস পরীক্ষায় যখন সম্পূর্ণ প্রক্রিয়া শেষ হতে তিন থেকে পাঁচ বছর সময় লেগে যায়, তখন বহু মেধাবী প্রার্থী এই দীর্ঘ সময়ে অন্য কোনো স্থায়ী চাকরিতে যোগ দেন না। অথবা যোগদান করলেও বিসিএসে চূড়ান্ত সুপারিশ পাওয়ার পর বর্তমান চাকরিটি তার কাছে গুরুত্ব হারায়। এর ফলে তিনি যে প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন, সেখানে মনোযোগ দিতে পারেন না এবং যখন চাকরিটা ছেড়ে দেন, তখন নিয়োগদাতাও ক্ষতির সম্মুখীন হন। অন্যদিকে যারা কোনো চাকরিতে যোগদান না করে অপেক্ষা করেন, তাদের দীর্ঘদিন বেকার বসে থাকা এবং পরিবারের বোঝা হয়ে থাকায় মানসিক স্বাস্থ্য ধ্বংসের মুখে চলে যায়। অন্যদিকে চাকরির নিয়োগ বিলম্বিত হতে হতে অনেকের সরকারি চাকরিতে প্রবেশের সর্বোচ্চ বয়সসীমা অতিক্রম করে যায়। কোনো কারণে যদি আইনি জটিলতা বা অন্যান্য প্রক্রিয়ার কারণে নিয়োগ আটকে যায়, তাহলে তাদের জন্য বিকল্প কোনো সরকারি চাকরির সুযোগ আর অবশিষ্ট থাকে না। জীবন নরকে পরিণত হয়। এর দায় কেউ নেয় না বা নিতে হয় না। অভিশাপটা গিয়ে লাগে প্রশাসনের আমলাতান্ত্রিক জটিলতার ওপর। 

দেরিতে চাকরিতে যোগদানের কারণে একজন সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে তাদের চাকরির মেয়াদ কমে যায়। ফলস্বরূপ, কর্মজীবনের শেষে গিয়ে নির্ধারিত পদোন্নতি (Promotion) পাওয়া বা নীতিনির্ধারণী উচ্চপদে (যেমন: সচিব বা অতিরিক্ত সচিব) পৌঁছানোর সম্ভাবনা হ্রাস পায়। সহপাঠী বা সমসাময়িকদের তুলনায় পেশাগত ক্যারিয়ারে তারা কয়েক বছর পিছিয়ে পড়েন। বাংলাদেশের সংস্কৃতিতে বিসিএস ক্যাডার হিসেবে সুপারিশপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের নিয়ে সামাজিক ও পারিবারিক প্রত্যাশা অনেক উঁচুতে থাকে। কিন্তু সুপারিশের পরও বছরের পর বছর কর্মস্থলে যোগ দিতে না পেরে তাদের সামাজিকভাবে নানা বিব্রতকর প্রশ্ন ও কট‚ক্তির মুখোমুখি হতে হয়, যা আত্মমর্যাদাবোধে আঘাত করে।

একজন যোগ্য প্রার্থীকে দ্রুততম সময়ে প্রশাসনিক কাঠামোতে যুক্ত না করতে পারা কেবল ব্যক্তির ক্ষতি নয়, এতে রাষ্ট্রেরও বিশাল ক্ষতি সাধিত হয়। প্রতি বছর সরকারি বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, দপ্তর, স্বাস্থ্যকেন্দ্র এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শত শত পদ খালি হয়। বিসিএস উত্তীর্ণদের নিয়োগ বিলম্বিত হওয়ার কারণে এই খালি পদগুলো দীর্ঘদিন ধরে অপূরণীয় থাকে। নিয়োগ বিলম্বের ফলে দেশবাসী সেবা থেকে বঞ্চিত হয়। একটি সরকারি পদ ফাঁকা থাকার অর্থ হলো, সেই পদের কর্মঘণ্টা পুরোপুরি নষ্ট হওয়া। রাষ্ট্র যদি শত শত পদে যথাসময়ে যোগ্য লোক নিয়োগ না দেয়, তবে উন্নয়নের বহু স্তর স্থবির হয়ে পড়ে, যা দিন শেষে দেশের অর্থনীতির ওপর প্রভাব ফেলে।

এমনও দেখা যায়, নিয়োগ প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা এবং সিস্টেমের প্রতি আস্থা হারানোর কারণে দেশের অনেক শীর্ষস্থানীয় মেধাবী তরুণ-তরুণী সরকারি চাকরির ওপর থেকে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। তারা বিকল্প হিসেবে উচ্চশিক্ষা বা চাকরির জন্য বিদেশে পাড়ি জমান। ফলে রাষ্ট্র তার নিজ ব্যয়ে গড়ে তোলা মেধাগুলোকে স্থায়ীভাবে হারায়। আশ্চর্যের বিষয় হলো-ওপরে উল্লিখিত সমস্ত বিড়ম্বনা পার হয়ে আসা সংশ্লিষ্ট উচ্চপদস্থ ব্যক্তিরাই এই জটিলতাকে উপলব্ধি করেন না এবং তাদের নিজেদের উৎকণ্ঠার কথা ভুলে যান। 

বিসিএস পরীক্ষার নিয়োগ প্রক্রিয়ার এই জটিলতা কাটানো অসম্ভব কিছু নয়। বাংলাদেশ পুলিশের ভেরিফিকেশন (Police Verification) প্রক্রিয়া এবং স্বাস্থ্য পরীক্ষা আধুনিক ও ডিজিটাল পদ্ধতিতে রূপান্তর করে কয়েক মাসের মধ্যেই শেষ করা সম্ভব। একটি সুনির্দিষ্ট ‘পরীক্ষা বর্ষ পঞ্জিকা’ (PSC Calendar) অনুসরণ করে বিজ্ঞপ্তি থেকে শুরু করে ক্যাডার পদায়ন পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়াটি ১২ থেকে ১৫ মাসের মধ্যে সীমাবদ্ধ করা সম্ভব এবং জরুরি। পাবলিক সার্ভিস কমিশনের মতো একটি স্পর্শকাতর প্রতিষ্ঠানে একজন চেয়ারম্যানের পর আরেক জন চেয়ারম্যান এসে যদি দৃশ্যত কোনো পরিবর্তন আনতে না পারেন, অথবা আনতে না চান তাহলে কী হয়? সচেতন জনগণ ধরে নেন, তিনি শুধু চাকরিই করেন, পদ ও ক্ষমতা উপভোগ করেন! অন্য কিছুতে তার আগ্রহ বা দক্ষতা নেই। তাই বলছি, নতুন চেয়ারম্যান ড. অধ্যাপক মোহাম্মদ নাজমুজ্জামান ভুঁইয়া এবং কমিশনের সচিব মো. ফজলুর রহমান আমাদেরকে কাজের গতি দেখান। এতে আপনাদের নিয়োগ সফল হবে, দক্ষতা প্রমাণ হবে এবং নিয়োগ হালাল হবে। সেই সঙ্গে মিলবে দেশবাসীর প্রশংসা। দ্রুতগতিতে পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ ও চূড়ান্ত সুপারিশ পাঠাতে সরকারি কর্ম কমিশন আরও বেগবান হবে বলে আশা করি। 

লেখক: অধ্যাপক, যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী

ইত্তেফাক/এমএস