রোহিঙ্গাদের ফেরত নেওয়ার চেয়ে না নেওয়ার যত চেষ্টা আছে সবই করছে মিয়ানমার। বাহানার কোনো অন্ত নেই দেশটির। সর্বশেষ বাংলাদেশ থেকে লক্ষাধিক রোহিঙ্গার তালিকা যাচাইয়ের কথা বলে রাখাইন রাজ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি, এমন বাহানায় প্রত্যাবাসন ঝুলিয়ে দিয়েছে। রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব ও মৌলিক অধিকারের স্বীকৃতি না দিয়ে তাদের মূলত রাষ্ট্রহীন করে রাখা হয়েছে। আন্তর্জাতিক মহলের চাপ এড়াতে মাঝেমধ্যে প্রত্যাবাসনের ভুয়া আলোচনা বা পাইলট প্রকল্পের কথা বললেও কাজের কাজ কিছুই করছে না। যার কারণে বাংলাদেশ থেকে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের তারিখ দূরে থাক, সময়সীমাও সুনির্দিষ্ট করা হচ্ছে না, ধারণাও করা যাচ্ছে না।
এ অঞ্চলের দেশ মালয়েশিয়াও কিছুটা রোহিঙ্গা আপদে আক্রান্ত। জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থার হিসাবে, মালয়েশিয়ায় বর্তমানে ২ লাখ ১৫ হাজারের বেশি শরণার্থী ও আশ্রয়প্রার্থী নিবন্ধিত রয়েছেন। তাদের মধ্যে মিয়ানমার থেকে আসা রোহিঙ্গার সংখ্যা ১ লাখ ২৬ হাজারের বেশি। দেশটিতে থাকা শরণার্থীদের মধ্যে তারাই সবচেয়ে বড় জনগোষ্ঠী। মালয়েশিয়া আগামী ২৯ সেপ্টেম্বর তাদের দেশ থেকে অন্তত ১ হাজার ৫০০ রোহিঙ্গা শরণার্থীর স্বেচ্ছায় প্রত্যাবাসন শুরুর ঘোষণা দিয়েছে।
গত জুলাইতে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম ঘোষণা দিয়েছিলেন, মিয়ানমার নির্যাতিত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ৫ হাজার সদস্যকে দেশে ফিরিয়ে নিতে সম্মত হয়েছে। তবে মানবাধিকার সংগঠনগুলো এই প্রত্যাবাসন পরিকল্পনা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করায় প্রক্রিয়াটি থমকে যায়। মালয়েশিয়া ও মিয়ানমার জানিয়েছে, সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে প্রায় ১ হাজার ৫০০ মিয়ানমারের নাগরিককে স্বেচ্ছায় দেশে ফেরত পাঠানোর মাধ্যমে প্রত্যাবাসনের প্রথম ধাপ শুরু হতে পারে। তবে এই দলে কতজন রোহিঙ্গা থাকবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
২০১৭ সালে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর কঠোর অভিযানের সময় বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা দেশটি ছেড়ে পালিয়ে যায়। এর পর থেকে তাদের একটি বড় অংশ মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে আশ্রয় নিয়েছে। বাংলাদেশ এর চরম শিকার। সম্প্রতি রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া দ্রুত করতে বাংলাদেশের পাশে থাকার জোরালো আশ্বাস দিয়েছে আন্তর্জাতিক ইসলামি সহযোগিতা সংস্থা-ওআইসি। বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর দ্রুত ও নিরাপদ মাতৃভূমিতে প্রত্যাবাসনের প্রক্রিয়ায় ওআইসি দৃঢ় সমর্থন বজায় রাখবে এবং ঢাকার পাশে থাকবে বলে আশ্বাস দিয়েছেন সংস্থাটির নবনিযুক্ত মহাসচিব ইসমাইল উলদ শেখ আহমেদ। ১৬ সেপ্টেম্বর সৌদি আরবের জেদ্দায় ওআইসি সচিবালয়ে তার সঙ্গে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি ও রাষ্ট্রদূত এম জে এইচ জাবেদের এক সৌজন্য সাক্ষাৎকালে তিনি এ আশ্বাস দেন।
বৈঠকে রোহিঙ্গা সংকট নিরসনের ওপর গুরুত্বারোপ করে ওআইসি মহাসচিব বলেন, এই মানবিক সংকটের দ্রুত ও দীর্ঘমেয়াদি সমাধান না হলে পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা বিঘ্নিত হতে পারে, যা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য মারাত্মক সংকট তৈরি করবে। এরই মধ্যে পরিবেশ, অর্থনীতি, আইনশৃঙ্খলা প্রশ্নে কক্সবাজারসহ বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলকে অস্থির করে তুলেছে রোহিঙ্গারা।
অন্যদিকে, মিয়ানমারের সামরিক জান্তা জেনারেল মিন অং হ্লাইং নিয়ন্ত্রিত নির্বাচন দিয়ে প্রেসিডেন্ট হয়েছেন; চেষ্টায় আছেন আসিয়ানসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গোষ্ঠীর স্বীকৃতি আদায়ের। কৌশলগত কারণে কিছুটা কোমল-কুসুমে মিয়ানমার। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বেইজিং সফরের সময় রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনে সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছে চীন। অর্থনৈতিক যোগাযোগ বাড়াতে মিয়ানমার হয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে অর্থনৈতিক করিডর করার প্রস্তাবও দিয়েছে চীন। প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরের পর মিয়ানমার সরকারের আচরণে কিছু পরিবর্তন দৃশ্যমান। কূটনৈতিকভাবে এটা একটা সুযোগ।
আন্তর্জাতিক চাপের মুখে মিয়ানমার যে প্রতিশ্রুতি দিয়েও ৯-১০ বছরে একজন রোহিঙ্গাকেও ফিরিয়ে নেয়নি, তথ্যটি নতুন করে বিশ্বকে জানানো দরকার আছে। সমস্যাটি এখন আর দ্বিপক্ষীয় নয়। বিশ্ব বাস্তবতায় এখানে অনেক পক্ষ। সংগত কারণেই রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনকে অগ্রাধিকারে রাখা বাংলাদেশ সরকার বারবার আন্তর্জাতিক মহলের সহায়তা চেয়ে আসছে। মিয়ানমারের ওপর তারা যথেষ্ট চাপ দিচ্ছে নাÑএ অভিযোগও করছে। এখন মিয়ানমারে গৃহযুদ্ধের কারণে প্রত্যাবাসনের আলোচনা আপাতত বন্ধ, উলটো রাখাইনে যুদ্ধের কারণে ২০২৪ সালের পর নতুন করে অনুপ্রবেশ করেছে দেড় লাখের বেশি রোহিঙ্গা। বর্তমান সরকারের ওপর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমর্থন থাকার সুযোগ কাজে লাগানো যায়। যুক্তরাষ্ট্র বা চীন এখন রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের ব্যাপারে আগের চেয়ে আন্তরিক। ধারণা করা যায়, এ ধারা এখনকার গতিতে এগোলে সামনে পর্যায়ক্রমে প্রত্যাবাসন শুরু হতে পারে। ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট মানবিক কারণে বাংলাদেশ সীমান্ত খুলে দেওয়ার পর কয়েক মাসের মধ্যে সাড়ে সাত লাখ রোহিঙ্গা ঢুকে পড়ে কক্সবাজারে।
টেকনাফ-উখিয়ার পাহাড়ি ভ‚মিতে বাঁশ, দড়ি আর ত্রিপলে তৈরি ঘরে জায়গা হয় তাদের। উখিয়া পরিণত হয় বিশ্বের সবচেয়ে বড় শরণার্থী শিবিরে। যেখানে প্রতি বর্গকিলোমিটার এলাকায় প্রায় ৪৫ হাজার শরণার্থীর বসবাস। রাখাইনে জাতিগত সংঘাতের পর ২০২৪ সাল থেকে আরও দেড় লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থী বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। প্রতিবছর যুক্ত হচ্ছে প্রায় ৩০ হাজার নতুন জন্ম নেওয়া শিশু। সেখানে বেড়ে উঠছে এমন এক প্রজন্ম, যারা নিজের মাতৃভূমি মিয়ানমারের রাখাইন দেখেনি, অথচ বাংলাদেশকেও নিজের দেশ বলতে পারে না। নতুন-পুরোনো মিলিয়ে ইউএনএইচসিআর এবং বাংলাদেশ সরকারের হিসাবে কক্সবাজার ও ভাসানচর মিলিয়ে বাংলাদেশে এখন নিবন্ধিত রোহিঙ্গার সংখ্যা ১২ লাখ ২ হাজার ৩৪ জন, যাদের অর্ধেকের বেশি বয়সে শিশু। অথচ মিয়ানমার বলছে, ২০১৭ সালের পর বাংলাদেশে এসেছে ৫ লাখ ৪০ হাজার। তাদেরকে আবার ‘বাঙালি অধিবাসী’ বলে সম্বোধনের দুষ্টামিও করেছে।
মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে বসবাসকারী এই মুসলিম জনগোষ্ঠী বহু দশক ধরে রাষ্ট্রীয় বৈষম্য, পরিচয় সংকট ও নাগরিকত্বহীনতার মুখোমুখি। ১৯৮২ সালের নাগরিকত্ব আইন তাদের অবস্থানকে আরও অনিশ্চিত করে তোলে এবং বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা কার্যত রাষ্ট্রহীন জনগোষ্ঠীতে পরিণত হয়। তাদের চলাচল, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, কাজ ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণের ওপর নানা বিধিনিষেধ তৈরি হয়। যা রোহিঙ্গাদের সংকটকে দীর্ঘ করেছে। বাংলাদেশে রোহিঙ্গা ঢল ২০১৭ সালেই প্রথম ঘটেনি। ১৯৭৮ সালে মিয়ানমারের সামরিক অভিযানের পর ২ লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসে। তখনো আন্তর্জাতিক ও দ্বিপক্ষীয় কূটনৈতিক উদ্যোগের মাধ্যমে প্রত্যাবাসনের ব্যবস্থা হয়েছিল। ১৯৭৮ সালের আগস্ট থেকে ১৯৭৯ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা মিয়ানমারে ফিরে যায়। এরপর ১৯৯১-৯২ সালে আবারও প্রায় ২ লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। সেটিও সামলানো হয়। প্রত্যাবাসনের ব্যবস্থা করা হয় কূটনৈতিক দক্ষতায়। ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট সেই পুরোনো সংকট আবার বিস্ফোরিত হয়। তবে এবার তার ব্যাপ্তি ছিল নজিরবিহীন। তা নিয়ে কখনো চলে মানবতা-উদারতা ফেরির অতি কূটনীতি, কখনো অতি সস্তা রাজনীতি। চলে বিশ্বের দৃষ্টি কেড়ে নোবেল হাতানোর বিকৃত জেদও।
হাল বুঝে মিয়ানমার সরকার বাংলাদেশের তখনকার সরকারের এ ক্যারিকেচারকে নিয়েছে সুযোগ হিসেবে। বিশ্বময় নানা ঘটনার ঘনঘটায় ইরান, যুক্তরাষ্ট্র, ইউক্রেন, গাজা, মধ্যপ্রাচ্য, মিয়ানমারের বৃহত্তর সংকটের ভিড়ে রোহিঙ্গা ইস্যু আন্তর্জাতিক অগ্রাধিকারের তালিকায় পিছিয়ে পড়েছে। আন্তর্জাতিক অর্থায়ন কমে যাওয়ায় খাদ্য, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সুরক্ষার মতো মৌলিক সেবার ওপরও চাপ বাড়ছে। ২০২৬ সালের মানবিক পরিকল্পনায়ও বিপুল অর্থের প্রয়োজন দেখানো হয়েছে। এক্ষেত্রে নতুন করে বিশ্ব মনোযোগ তৈরির বিষয় রয়েছে। রোহিঙ্গা প্রশ্নে ওআইসির বাংলাদেশের পাশে থাকার বার্তাটি সেখানে একটি মাত্রা যোগ। জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক মহলের দৃষ্টি আকর্ষণও প্রত্যাশিত।
লেখক : সাংবাদিক-কলামিস্ট; ডেপুটি হেড অব নিউজ, বাংলাভিশন

