সাভারের আশুলিয়ার জামগড়া এলাকায় প্রীতি গ্রুপের এস সুহী ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কে গ্যাস সিলিন্ডারবাহী লরিতে ভয়াবহ বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় সাতজন নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় প্রাথমিক অনুসন্ধানের পাশাপাশি বিভাগীয়ভাবে চার সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে ফায়ার সার্ভিস।
ঘটনায় আহত হয়েছেন অন্তত ১৬ জন। নিহতদের মধ্যে ঘটনাস্থলে সিলিন্ডারের আঘাতে মারা যাওয়া এক নারী, লরির ভেতর থেকে উদ্ধার করা পাঁচজন এবং ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যাওয়া আরও একজন রয়েছেন।
এদিকে দুর্ঘটনার পর সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) ঘটনাস্থলের চারটি পোশাক কারখানা বন্ধ রাখা হয়েছে।
জানা গেছে, সোমবার সকালে কাজে যোগ দিতে এসে অনেক শ্রমিক কারখানা বন্ধ দেখে ফিরে যান। দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা। পাশাপাশি ঘটনাস্থল দেখতে উৎসুক মানুষের ভিড় দেখা গেছে। অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে কারখানার সামনে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
বাংলাদেশ গার্মেন্টস অ্যান্ড সোয়েটার শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের আইনবিষয়ক সম্পাদক খাইরুল মামুন মিন্টু বলেন, আজ (সোমবার) খুব ভোরে আমি ঘটনাস্থলে গিয়েছিলাম। সেখানে পুলিশ, কারখানা কর্তৃপক্ষ ও শ্রমিকরা উপস্থিত ছিলেন। কারখানাগুলোতে প্রায় তিন হাজার শ্রমিক কাজ করেন। আজকের জন্য কর্তৃপক্ষ চারটি কারখানা বন্ধ করেছে।
মিন্টু আরও বলেন, এ ঘটনায় কোনো শ্রমিক নিখোঁজ আছেন কি না, তা এখনও জানা যায়নি। তবে আরও শ্রমিক নিখোঁজ কিংবা মারা যাওয়ার শঙ্কা খুবই কম। কারণ আগুন কারখানায় লাগেনি, শুধু পার্কিংয়ে লেগেছে। যারা মারা গেছেন, তারা অধিকাংশই কারখানার পরিবহন সেক্টরে কাজ করেন। তারপরও আগামীকাল কারখানা খুললে বোঝা যাবে কারখানার কোনো শ্রমিক নিখোঁজ আছেন কি না।
এর আগে রোববার সন্ধ্যা পৌনে ৭টার দিকে এস সুহী ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কের ভেতরে ‘প্রীতি গ্রুপের’ এফএনএফ ইউটিলিটি বিল্ডিং সংলগ্ন এলাকায় গ্যাস সিলিন্ডারবাহী একটি লরিতে বিস্ফোরণ ঘটে। পরে দ্রুত আগুন ছড়িয়ে পড়ে। আগুনের শিখা কয়েক কিলোমিটার দূর থেকেও দেখা যায়।
প্রাথমিক অনুসন্ধানে ফায়ার সার্ভিস জানিয়েছে, কারখানা প্রাঙ্গণে দেয়ালের পাশে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে থাকা লরিগুলোর একটি থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়। এসব লরির মধ্যে ৪ নম্বর লরিতে প্রথম বিস্ফোরণ ঘটে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। পরে আগুন আশপাশে ছড়িয়ে পড়ে।
জিরাবো ফায়ার সার্ভিসের সিনিয়র স্টেশন অফিসার শাহাবুদ্দিন জানান, কারখানাটিতে তিতাসের গ্যাস সংযোগ থাকলেও লাইনে পর্যাপ্ত চাপ না থাকায় বিকল্প হিসেবে সিলিন্ডার লরি থেকে গ্যাস ব্যবহার করা হতো বলে তারা জানতে পেরেছেন। লরিতে থাকা সিলিন্ডারগুলোর কয়েকটি মেয়াদোত্তীর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ ছিল বলেও প্রাথমিক অনুসন্ধানে তথ্য পাওয়া গেছে। সিলিন্ডারের অতিরিক্ত চাপ বা প্রযুক্তিগত ত্রুটির কারণে ৪ নম্বর লরিতে বিস্ফোরণ ঘটে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে চূড়ান্ত কারণ তদন্তের পর নিশ্চিত হওয়া যাবে।
বিস্ফোরণের তীব্রতা এতটাই বেশি ছিল যে কাভার্ডভ্যানের ওপরের অংশ ও সিলিন্ডারের বিভিন্ন খণ্ডাংশ চারদিকে ছিটকে পড়ে। একটি অংশ পাশের একটি ১০ তলা ভবনের ছাদে গিয়ে পড়ে। বিস্ফোরণের পর সিলিন্ডারের মূল সরবরাহ লাইনেও আগুন ধরে যায়।
খবর পেয়ে জিরাবো ও ডিইপিজেড ফায়ার সার্ভিসের চারটি ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ শুরু করে। প্রায় দুই ঘণ্টার চেষ্টায় রাত সাড়ে ৮টার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। পরে রাত ১১টা ৪৪ মিনিটে উদ্ধার অভিযান শেষ করা হয়।
ফায়ার সার্ভিস জানায়, ঘটনাস্থলে লরির ভেতর থেকে পাঁচজনের দগ্ধ মরদেহ উদ্ধার করা হয়। লরির নিচ থেকেও মরদেহ উদ্ধারের তথ্য পাওয়া গেছে। নিহতদের কয়েকজনের মরদেহ এতটাই বিকৃত হয়ে গেছে যে তাৎক্ষণিকভাবে পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। তাদের পরিচয় ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত করার প্রক্রিয়া চলছে।
বিস্ফোরণের সময় সিলিন্ডারের একটি অংশ ছিটকে গিয়ে রাস্তার পাশে থাকা মোছাম্মত জয়নব বেগম (৫৫) নামে এক নারীকে আঘাত করে। এতে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়। তিনি গাজীপুরের কাশিমপুরের ইসরকান্দি এলাকার মো. আলীর স্ত্রী।
জয়নবের পরিবারের সদস্যরা জানান, কয়েক দিন আগে তিনি মেয়ের বাসায় বেড়াতে এসেছিলেন। ঘটনার সময় তার মেয়ে জামগড়া এলাকায় দর্জির কাজ করছিলেন এবং জয়নব দোকানের বাইরে দাঁড়িয়ে ছিলেন। হঠাৎ বিস্ফোরণের পর একটি সিলিন্ডার বা সিলিন্ডারের অংশ ছিটকে এসে তার মাথায় আঘাত করলে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়।
এ ঘটনায় গুরুতর আহতদের কয়েকজনকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। পরে সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বুলবুল নামের এক ব্যক্তি মারা যান। এছাড়া নজরুল ইসলাম (৩০) নামে এক কাঁচামাল বিক্রেতার মৃত্যুর তথ্যও পাওয়া গেছে। নিহতদের পরিচয় ও মোট সংখ্যার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের যাচাই ও আইনি প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
আশুলিয়া থানার ওসি মো. তরিকুল ইসলাম জানান, ঘটনাস্থল থেকে পাঁচজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ঘটনাস্থলের কিছুটা পাশে একজন নারীর মরদেহ পাওয়া যায়। গুরুতর আহত তিনজনকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছিল। তাদের মধ্যে একজন মারা যান। সব মিলিয়ে নিহতের সংখ্যা ৭ জন বলে তিনি জানান। নিহতদের মধ্যে দুজনের পরিচয় শনাক্ত হয়েছে। অন্যদের পরিচয় ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত করা হবে।
দুর্ঘটনার পর সোমবার এস সুহী ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কের ফটকে হাতে লেখা একটি নোটিশ দেখা যায়। এতে প্রীতি কম্পোজিট টেক্সটাইল লিমিটেড, প্রীতি কম্পোজিট গার্মেন্টস লিমিটেড, অক্সফোর্ড কালারস লিমিটেড ও এস সুহী ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক লিমিটেড বন্ধ রাখার কথা জানানো হয়।
প্রীতি গ্রুপের এক শ্রমিক জানান, আগের দিন কাজ শেষে তারা কারখানা থেকে বের হয়ে যাওয়ার পর আগুনের খবর পান। সোমবার সকালে কাজে যোগ দিতে এসে কারখানা বন্ধ দেখতে পান। কর্তৃপক্ষ তাদের জানিয়েছে, পরদিন থেকে কারখানা খোলা হবে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এস সুহী ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কের একটি কারখানার এক কর্মকর্তা বলেন, দুর্ঘটনার কারণে সোমবার কারখানা বন্ধ রাখা হয়েছে। তিনি জানান, নিহতদের কেউ পোশাক কারখানার শ্রমিক নন বলে তারা জানতে পেরেছেন। নিহতদের বেশির ভাগই গ্যাস সরবরাহের কাজে নিয়োজিত ছিলেন বলে তিনি দাবি করেন।
এদিকে বিস্ফোরণে আশপাশের কয়েকটি বাড়িঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। এস সুহী ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কের পাশের একটি ভবনের মালিক ফারজানা সুলতানা বলেন, বিস্ফোরণের কারণে তাদের বাড়ির দোতলার থাই গ্লাস ভেঙে গেছে এবং ছাদেরও ক্ষতি হয়েছে। ওই এলাকায় নিয়মিত গ্যাসবাহী গাড়ি আসা এবং গ্যাস লোড ও আনলোড করা হয় বলেও তিনি জানান। বিষয়টি তদন্তের দাবি জানিয়েছেন তিনি।
আরেক বাড়ির মালিক জামাল মোস্তফা বলেন, তাদের এলাকায় সরকারি গ্যাসের সংযোগ থাকার পরও বিপুল পরিমাণ গ্যাস সিলিন্ডার আনা হয়। বিস্ফোরণের কারণে সিলিন্ডারের বিভিন্ন অংশ দূরে দূরে ছিটকে পড়ে এবং তার ভবনও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
ফায়ার সার্ভিসের প্রাথমিক অনুসন্ধানে জানা গেছে, কারখানা প্রাঙ্গণে সাত থেকে আটটি কাভার্ড ভ্যানে বিপুল পরিমাণ গ্যাস সিলিন্ডার ছিল। সিলিন্ডার থেকে গ্যাস বের হয়ে আগুনের তীব্রতা বাড়ছিল। ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা মূল কারখানা ভবন এবং আশপাশের স্থাপনায় আগুন ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করেন।
এ ঘটনায় প্রাথমিক অনুসন্ধানের পাশাপাশি বিভাগীয়ভাবে চার সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে ফায়ার সার্ভিস। কমিটিতে একজন সহকারী পরিচালককে সভাপতি, একজন কমান্ডারকে সদস্যসচিব এবং সংশ্লিষ্ট সিনিয়র কর্মকর্তা ও ইন্সপেক্টরকে সদস্য করা হয়েছে।

আশুলিয়ায় অগ্নিকাণ্ডে আহত ও দগ্ধ অন্তত ৭, দুজন আশঙ্কাজনক