চীন-পাকিস্তান সীমান্ত চুক্তি, ব্যাপক ক্ষুব্ধ ভারত

আপডেট : ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০০:৫৫

হিমালয়ের বিতর্কিত অঞ্চলে পাকিস্তান ও চীনের মধ্যকার সীমানাকে বহু দশক ধরেই স্বীকৃতি দিতে অস্বীকৃতি জানিয়ে আসছে ভারত, কারণ নয়াদিল্লি এই পুরো অঞ্চলটিকে সম্পূর্ণ নিজেদের ভূখণ্ড বলে দাবি করে থাকে।

তবে সম্প্রতি ওই দুর্গম পার্বত্য অঞ্চলে পাকিস্তান ও চীন সীমান্ত সংক্রান্ত একটি চুক্তি আনুষ্ঠানিকভাবে চূড়ান্ত করার পর তা নিয়ে অত্যন্ত কড়া প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছে ভারত। দুই প্রতিবেশী দেশ ‘পাকিস্তান-চীন যৌথ সীমান্ত কমিশন’ সংক্রান্ত একটি চুক্তি স্বাক্ষর করার পর ইসলামাবাদ একে তাদের সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, বাণিজ্য এবং আঞ্চলিক সংযোগ জোরদারের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বর্ণনা করেছে।

নয়াদিল্লি তাৎক্ষণিকভাবে এই পদক্ষেপকে প্রত্যাখ্যান করে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে যে এর কোনো ধরনের আইনি ভিত্তি নেই। ভারত যে ভূখণ্ডকে নিজেদের বলে দাবি করে, সেখানে পাকিস্তান বা চীনের কোনো সীমানাই নয়াদিল্লি স্বীকার করে না। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সোয়াল এ প্রসঙ্গে পরিষ্কার করেছেন যে, পাকিস্তান ও চীনের মধ্যে কোনো বৈধ সীমান্ত নেই এবং তারা এই তথাকথিত যৌথ কমিশনকে সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করছেন। এই কমিশন মূলত পাকিস্তান-চীন সীমান্ত এলাকা এবং বিশেষ করে শাকসগাম উপত্যকাকে অন্তর্ভুক্ত করে। প্রায় ৫ হাজার ১৮০ বর্গকিলোমিটার বিস্তৃত এই ভূখণ্ডটি ১৯৬৩ সালে পাকিস্তান চীনের কাছে হস্তান্তর করেছিল, যা ভারত তার লাদাখ অঞ্চলের অবিচ্ছেদ্য অংশ বলে দাবি করে আসছে।

ভারতের জোরালো অবস্থান হলো, এই ভূখণ্ডটি তৎকালীন জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্য সরকারের অংশ ছিল এবং পাকিস্তান অবৈধভাবে তা দখল করার পর বেইজিংয়ের কাছে হস্তান্তর করেছে। ফলে অবৈধ ও বলপূর্বক দখলে রাখা ভারতীয় ভূখণ্ড নিয়ে কোনো ধরনের চুক্তি বা সমঝোতা করার কোনো অধিকার পাকিস্তানের নেই। অন্যদিকে, পাকিস্তান সরকারের দাবি, জম্মু ও কাশ্মীর এখনো একটি বিতর্কিত ভূখণ্ড এবং ১৯৬৩ সালে চীনের সাথে করা তাদের এই সীমান্ত চুক্তি পুরোপুরি বৈধ।

শিব নাদার বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক জাবিন টি জ্যাকব জানান, এটি সম্পূর্ণ নতুন কোনো ব্যবস্থাপনা নয়, বরং ১৯৬৩ সালের চীন-পাকিস্তান চুক্তিতে রাখা বিধানেরই একটি পুরোনো ব্যবস্থার পুনরুজ্জীবন। তবে এর টাইমিং অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ চীন বর্তমানে তাদের সমস্ত সীমান্ত চিহ্নিত করার উদ্যোগ নিয়েছে এবং পাকিস্তান সীমান্তে অস্থিরতার মধ্যে যাতায়াত ও বিনিময়কে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তার মতে, এর মাধ্যমে ১৯৬৩ সালের চুক্তির ৬ নম্বর অনুচ্ছেদকে অমান্য করা হয়েছে, যেখানে কাশ্মীর বিরোধের চূড়ান্ত নিষ্পত্তির পর ভূখণ্ডের প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ যার হাতে থাকবে, তার সাথে চুক্তি পুনর্নবীকরণের শর্ত ছিল। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে চীনের প্রভাবের কারণে তারা সহজেই নিজেদের বয়ান প্রচার করতে পারলেও ভারতের প্রতিবাদ কেবল বিবৃতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

জাতিসংঘে পাকিস্তানের সাবেক রাষ্ট্রদূত হুসাইন হাক্কানি বিবিসিকে জানান, এই কমিশন গঠন একই সাথে বাস্তবসম্মত এবং রাজনৈতিক-কৌশলগত। এর মাধ্যমে সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার, অবৈধ অনুপ্রবেশ রোধ এবং ‘চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর’ (সিপিসি) ও কারাকোরাম হাইওয়ের মতো কৌশলগত অবকাঠামোর সুরক্ষা নিশ্চিত করা হচ্ছে। পাশাপাশি, ভারতের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৩৭০ বাতিলের অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্তের পর বেইজিংকে সাথে রেখে কাশ্মীর ইস্যুকে এখনো মূল্যায়ন করার একটি রাজনৈতিক বার্তাও এর মাধ্যমে দেওয়া হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলন থেকে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ফেরার পরপরই এই তথ্য প্রকাশের মাধ্যমে পাকিস্তানকে সামরিক ও কৌশলগত বন্ধুত্বের নতুন আশ্বাস দেওয়ার পাশাপাশি ভারতকে এই বার্তাই দেওয়া হয়েছে যে, বহুপাক্ষিক আলোচনা চললেও দক্ষিণ এশিয়া নিয়ে বেইজিংয়ের মূল দৃষ্টিভঙ্গিতে কোনো পরিবর্তন আসেনি। শেষ পর্যন্ত সামরিকভাবে বড় কোনো সরাসরি প্রভাব না পড়লেও, ভারত যে অবৈধ দখলদারিত্বকে দীর্ঘকাল ধরে অস্বীকার করে আসছে, তা ধীরে ধীরে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করায় এই জটিল ভূ-কৌশলগত বিরোধ আরও ঘনীভূত হচ্ছে।

ইত্তেফাক/এএম