বিশ্বমঞ্চে দাঁড়িয়ে ইরানকে সম্পূর্ণভাবে গুঁড়িয়ে দেওয়ার সরাসরি হুমকি দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে সংঘাতের কঠোর সতর্কবার্তা দেওয়ার পাশাপাশি তিনি আশা প্রকাশ করেছেন, আসন্ন মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের পরপরই তেহরানের সঙ্গে একটি শান্তি চুক্তিতে পৌঁছানো সম্ভব হবে।
মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সাধারণ বিতর্কে দেওয়া ভাষণে তিনি এ মন্তব্য করেন।
বিশ্বনেতাদের উদ্দেশে দেওয়া ৩৭ মিনিটের ভাষণে ৮০ বছর বয়সী মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেন, তাকে একটি বড় সিদ্ধান্ত নিতে হবে—তিনি কি ইরানের সঙ্গে চুক্তিতে যাবেন, নাকি দেশটিকে ‘নিশ্চিহ্ন’ করে দেবেন। যুদ্ধক্লান্ত আমেরিকান ভোটারদের বার্তা দেওয়ার ইঙ্গিত দিয়ে তিনি বলেন, ‘আমাকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে—ইরানের সঙ্গে কি এমন কোনো সমঝোতা হবে, যা তাদের আবার ঘুরে দাঁড়াতে এবং বড় একটি দেশ হিসেবে গড়ে উঠতে সাহায্য করবে? নাকি আমি ইসলামিক রিপাবলিককে দ্রুততম সময়ে সম্পূর্ণরূপে নিশ্চিহ্ন করে দেব, যেন তারা আর কখনো মানুষ ও রাষ্ট্রকে ধ্বংস করার সুযোগ না পায়? আমি কি তাদের এমন নরকে ঠেলে দেব, যেখান থেকে তাদের ফিরে আসার কোনো সুযোগই থাকবে না?’
নিজেকে শান্তির দূত দাবি করে ট্রাম্প বলেন, ‘অন্যরা যখন কেবল শান্তির কথা বলেছে, আমি তখন তা বাস্তবে প্রতিষ্ঠা করেছি। অন্যরা যখন হুমকি এড়িয়ে গেছে, আমি সেগুলোর মুখোমুখি দাঁড়িয়েছি।’ প্রায় সাত মাস ধরে চলা ইরান যুদ্ধের যৌক্তিকতা তুলে ধরে তিনি দাবি করেন, তেহরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে বিরত রাখতেই এই সামরিক অভিযান চালানো হয়েছিল।
আগামী নভেম্বরের মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের পরপরই ইরান সমঝোতায় আসবে বলে দৃঢ় বিশ্বাস ব্যক্ত করেন ট্রাম্প। তিনি বলেন, ‘আমার বিশ্বাস, নির্বাচনের পরপরই আমরা একটি চুক্তিতে পৌঁছাব। কারণ কোনো সমঝোতায় না আসা তাদের জন্য মোটেই বুদ্ধিমানের কাজ হবে না।’ ট্রাম্পের দাবি, ইরান হয়তো নির্বাচনের ফলের জন্য অপেক্ষা করছে, তবে তারা বুঝতে পারছে না যে এই নির্বাচনে তিনি নিজে প্রার্থী নন এবং অতীতে তিনি বিপুল ব্যবধানে জয়ী হয়ে এসেছেন।
উল্লেখ্য, মধ্যবর্তী নির্বাচনে ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টির কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারানোর শঙ্কা তৈরি হয়েছে, যার অন্যতম বড় কারণ চলমান ইরান যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্বজুড়ে জ্বালানির অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি।
ভাষণে সামরিক শক্তিমত্তার প্রচার চালিয়ে ট্রাম্প দাবি করেন, তার নেতৃত্বেই যুক্তরাষ্ট্র আজ বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী দেশ। লাতিন আমেরিকায় মার্কিন স্বার্থ সুরক্ষায় ‘অপ্রতিদ্বন্দ্বী সামরিক শক্তি’ ব্যবহারের হুঁশিয়ারি দিয়ে তিনি বলেন, কমিউনিস্ট শাসিত কিউবা খুব দ্রুত পতনের মুখে পড়বে।
গ্রিনল্যান্ডের সঙ্গে হওয়া নতুন একটি চুক্তির প্রসঙ্গ টেনে ট্রাম্প জানান, সুমেরু (আর্কটিক) অঞ্চলে ওয়াশিংটন দুটি বড় সামরিক ঘাঁটি নির্মাণ করবে। জাতিসংঘের সম্মেলনের ফাঁকেই ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের নেতাদের সঙ্গে এ চুক্তি সই হওয়ার কথা। তবে এ চুক্তি ন্যাটোসহ যুক্তরাষ্ট্রের ঐতিহ্যবাহী মিত্রদের মধ্যে তীব্র মতবিরোধ তৈরি করেছে এবং ওয়াশিংটনের নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে পুনরায় প্রশ্ন তুলেছে।
জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতসহ (আইসিসি) বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার তীব্র সমালোচনা করে ট্রাম্প অন্য দেশগুলোকে এসব প্রতিষ্ঠান বর্জনের আহ্বান জানান।
ভাষণের পরিবেশ নিয়ে পর্যবেক্ষকরা জানান, গত বছরের মতো এবার কোনো বিশৃঙ্খলা দেখা যায়নি। সেবার নিউইয়র্কে সদর দপ্তরের চলন্ত সিঁড়ি সাময়িকভাবে বিকল হওয়া এবং টেলিপ্রম্পটারে ত্রুটি দেখা দিলে ট্রাম্প অন্তর্ঘাতের অভিযোগ তুলেছিলেন। তবে এবার স্ত্রী মেলানিয়া ট্রাম্পকে সঙ্গে নিয়ে নির্বিঘ্নে সভাকক্ষে প্রবেশ করেন তিনি এবং টেলিপ্রম্পটার দেখে বক্তব্য শেষ করেন।
এর আগে অধিবেশনের সূচনায় জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি সম্প্রসারণে ‘জাতিগত নিধনের ঝুঁকি’ নিয়ে বিশ্বকে সতর্ক করেন এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভবিষ্যৎ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র-চীন সংলাপের তাগিদ দেন। সাধারণ পরিষদের দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য মেনে সম্মেলনের প্রথম বক্তা হিসেবে বক্তব্য রাখেন ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুলা দা সিলভা।

