কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে বোমা তৈরি, হামলার পরিকল্পনা এবং যুদ্ধক্ষেত্রে কৌশল নির্ধারণ করছে ইসলামিক স্টেট (আইএস) সংশ্লিষ্ট সশস্ত্র গোষ্ঠীর সদস্যরা। এমন তথ্য উঠে এসেছে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায়। আলজাজিরার এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে গবেষণাটির বরাত দিয়ে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।
গবেষণায় নাইজেরিয়াভিত্তিক বোকো হারামের দুটি শাখা-আইএসের পশ্চিম আফ্রিকা প্রদেশ (আইএসডব্লিউএপি) এবং জামা’আত আহলুস সুন্নাহ লিদ-দাওয়াহ ওয়াল-জিহাদ (জেএএস)-এর সাবেক ২৭ সদস্যের সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়। তাদের কয়েকজন জানিয়েছেন, হামলার আগে, হামলার সময় এবং পরবর্তী পর্যায়ে প্রযুক্তিগত ও সামরিক পরামর্শের জন্য বিভিন্ন এআই চ্যাটবট নিয়মিত ব্যবহার করা হতো।
গবেষণায় উঠে এসেছে, চ্যাটজিপিটি, ক্লড, জেমিনি, গ্রক, মেটা এআই ও ডিপসিকের মতো এআই প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করেছে গোষ্ঠীগুলোর সদস্যরা। শুধু সাধারণ তথ্য জানার জন্য নয়, নিজেদের হাতে থাকা উপকরণ ও পরিস্থিতি অনুযায়ী নির্দিষ্ট সমস্যার সমাধান খুঁজতেও তারা এসব চ্যাটবটের দ্বারস্থ হয়েছে বলে জানিয়েছেন সাবেক সদস্যরা।
আলজাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আইএসডব্লিউএপি ও জেএএসের মধ্যে এআই ব্যবহারের জন্য আলাদা ইউনিটও গড়ে তোলা হয়েছিল। এসব ইউনিটে প্রকৌশলী, অস্ত্র বিশেষজ্ঞ ও বোমা তৈরিতে দক্ষ ব্যক্তিরা ছিলেন। সাবেক এক কমান্ডারের ভাষ্য অনুযায়ী, একটি ইউনিটে ২৩ জন সদস্য কাজ করতেন। সৌরবিদ্যুৎচালিত একটি কক্ষে বসে তারা এআইয়ের মাধ্যমে তথ্য বিশ্লেষণ এবং কমান্ডারদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দিতেন।
গবেষণায় অংশ নেওয়া প্রায় ১০ জন বোমা ও বিস্ফোরক-সংক্রান্ত কাজে এআই ব্যবহারের কথা জানিয়েছেন। বিশেষ করে আগে থেকে পাওয়া সাধারণ তথ্যের বদলে নিজেদের হাতে থাকা উপকরণ ও পরিস্থিতির ভিত্তিতে এআইয়ের কাছ থেকে পরামর্শ নেওয়ার বিষয়টি গবেষকদের উদ্বিগ্ন করেছে।
তবে এআই ব্যবহারের পরিধি শুধু বিস্ফোরক তৈরির মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। সাবেক যোদ্ধাদের ভাষ্য অনুযায়ী, নতুন অস্ত্র ব্যবহারের পদ্ধতি বুঝতে, যুদ্ধক্ষেত্রের পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করতে এবং হামলার কৌশল পরিবর্তন করতেও এআই ব্যবহার করা হয়েছে।
একটি ঘটনায় যুদ্ধক্ষেত্রে থাকা এক যোদ্ধার ক্যামেরায় ধারণ করা ছবি ঘাঁটিতে পাঠানো হয়। পরে একজন কমান্ডার ছবিগুলো এআইতে দিয়ে পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করেন এবং সেই অনুযায়ী সামনের সারির যোদ্ধাদের নির্দেশনা দেওয়া হয় বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।
এমনকি ব্যর্থ হামলার পরও এআইয়ের সহায়তা নেওয়া হয়েছে। সাবেক সদস্যদের দাবি, কোনো অভিযান ব্যর্থ হলে তারা ব্যবহৃত কৌশল সম্পর্কে এআইকে জানিয়ে কেন তা কাজ করেনি এবং পরবর্তী অভিযানে কী পরিবর্তন আনা যায়-এ ধরনের প্রশ্ন করতেন। হামলার ভিডিও বা ছবি বিশ্লেষণের জন্যও এআই ব্যবহারের কথা উঠে এসেছে।
এদিকে আইএস-সমর্থকদের বৃহত্তর অনলাইন নেটওয়ার্কেও এআইয়ের নিরাপত্তা ব্যবস্থা এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা ধরা পড়েছে। ‘টেক অ্যাগেইনস্ট টেররিজম’-এর গবেষকেরা একটি আইএসপন্থী প্রযুক্তি ফোরামে প্রবেশ করে দেখেছেন, সেখানে সদস্যরা কীভাবে এআই চ্যাটবটের নিরাপত্তা বিধিনিষেধ পাশ কাটিয়ে অস্ত্র-সংক্রান্ত তথ্য পাওয়ার চেষ্টা করছে তা নিয়ে আলোচনা করছিল।
গবেষকদের মতে, এ ধরনের ‘জেলব্রেকিং’ বা এআইয়ের নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণ এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা বাড়ছে। তাদের আশঙ্কা, এআই মডেল যত শক্তিশালী হচ্ছে, সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর কাছে প্রযুক্তির অপব্যবহারের সুযোগও তত বাড়তে পারে।
জাতিসংঘের কর্মকর্তারাও চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে নিরাপত্তা পরিষদকে আইএস ও এর সহযোগী গোষ্ঠীগুলোর উন্নত এআই ব্যবহারের বিষয়ে সতর্ক করেছিলেন। একই সঙ্গে বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো দাবি করে আসছে, তাদের এআই সিস্টেমে সহিংসতা, সন্ত্রাসবাদ ও অস্ত্র তৈরির মতো ক্ষতিকর ব্যবহারের বিরুদ্ধে নিরাপত্তা ব্যবস্থা রয়েছে।
কেমব্রিজের গবেষণায় মূলত ২০২৩ ও ২০২৪ সালের এআই ব্যবহারের তথ্য উঠে এসেছে। গবেষক অ্যান্টোনিয়া জুয়েলিখের মতে, ওই সময়ের তুলনায় ২০২৬ সালে এআই প্রযুক্তির সক্ষমতা অনেক বেড়েছে। ফলে একই ধরনের গোষ্ঠী এখন আরও উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করলে তার প্রভাব কী হতে পারে, সেটিই বড় উদ্বেগের বিষয়।
