জাপানে স্থায়ীভাবে বসবাসের অনুমতি বা পার্মানেন্ট রেসিডেন্সি (পিআর) পাওয়ার নিয়ম আরও কঠোর করছে দেশটির সরকার। নতুন নিয়মে আবেদনকারীদের জাপানের গড় আয়ের চেয়ে বেশি বার্ষিক পারিবারিক আয়, জাপানি ভাষায় দক্ষতা এবং দীর্ঘমেয়াদি পেনশন সঞ্চয়ের মতো শর্ত পূরণ করতে হবে। এতে দেশটিতে দীর্ঘদিন ধরে বসবাসকারী অনেক প্রবাসীর ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
শুক্রবার (২৫ সেপ্টেম্বর) এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে আল জাজিরা।
আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়, আগামী ১ অক্টোবর থেকে ধাপে ধাপে নতুন নিয়ম কার্যকর হবে। তবে এর কিছু শর্ত গত এপ্রিল থেকে জমা দেওয়া আবেদনগুলোর ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে।
নতুন নিয়ম অনুযায়ী, স্থায়ী বসবাসের আবেদনকারীদের প্রমাণ করতে হবে যে তাদের বার্ষিক পারিবারিক আয় জাপানের গড় আয়ের চেয়ে বেশি। একই সঙ্গে জাপানি ভাষায় দক্ষতার প্রমাণ দিতে হবে। এছাড়া ৩০ বছরের পেনশন সুবিধার সমপরিমাণ অর্থের সঞ্চয় বা পেনশন তহবিল থাকার শর্তও যুক্ত করা হয়েছে।
জাপানের ইমিগ্রেশন সার্ভিসেস এজেন্সি নতুন নিয়মের ব্যাখ্যায় জানিয়েছে, বিদেশিদের ‘স্বনির্ভরভাবে’ বসবাস করতে হবে এবং তাদের জীবনযাত্রা এমন হতে হবে, যাতে তারা ভবিষ্যতে রাষ্ট্রের ওপর ‘বোঝা হয়ে পড়ার ঝুঁকিতে’ না থাকেন।
প্রতিবেদনে বাংলাদেশি প্রকৌশলী আবদুলের উদাহরণ তুলে ধরা হয়েছে। প্রায় আট বছর ধরে জাপানে বসবাস করা আবদুল দেশটিকে নিজের জন্মভূমি বাংলাদেশের চেয়েও পরিচিত মনে করেন। উত্তর টোকিওতে বাংলাদেশি স্ত্রীকে নিয়ে বসবাসকারী আবদুল স্থায়ী বসবাসের অনুমতি ও জাপানের নাগরিকত্ব দুটির জন্যই আবেদন করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
তবে নতুন নিয়ম নিয়ে উদ্বিগ্ন তিনি। আবদুল বলেন, ভবিষ্যতে জাপান সরকার নিয়ম আরও কঠোর করবে কি না, তা তিনি জানেন না। তার আবেদন দুটিই প্রত্যাখ্যাত হলে জাপান ছাড়ার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে বলেও জানান তিনি। এরই মধ্যে জাপানের বাইরে কাজের সুযোগ খুঁজতে শুরু করেছেন বলে জানান আবদুল।
প্রতিবেদনে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক সারাহ নেলকিনের কথাও তুলে ধরা হয়েছে। ১৪ বছর ধরে জাপানে বসবাস করা নেলকিন বিনোদনশিল্পে কাজ করছেন। নতুন নিয়ম ঘোষণার কিছুদিন আগে তিনি স্থায়ী বসবাসের জন্য আবেদন করেছেন।
আবেদন প্রত্যাখ্যাত হলে জাপানের নাগরিকত্ব নেওয়ার কথা ভাবছেন নেলকিন। তবে জাপান দ্বৈত নাগরিকত্ব স্বীকৃতি না দেওয়ায় জাপানের নাগরিকত্ব নিতে হলে তাকে মার্কিন নাগরিকত্ব ছাড়তে হবে।
মেইকাই বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক রিসা হাগিওয়ারা বলেন, নতুন পরিবর্তনগুলো জাপানের অভিবাসন নীতিতে ‘নির্বাচিত ও শর্তসাপেক্ষ’ প্রবণতার পরিবর্তনকে তুলে ধরছে। একই সময়ে জনসংখ্যা কমে যাওয়ায় দেশটিতে শ্রমিকের প্রয়োজন বাড়ছে।
হাগিওয়ারার মতে, দীর্ঘমেয়াদি বসবাসের শর্ত যদি উল্লেখযোগ্যভাবে কঠিন হয়ে যায়, তাহলে জাপানকে দীর্ঘমেয়াদি বসবাসের গন্তব্য হিসেবে বিবেচনা করা বিদেশি কর্মীদের কাছে দেশটির আকর্ষণ কমে যেতে পারে।
আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়, ঐতিহাসিকভাবে অভিবাসনপ্রবণতা কম থাকা জাপানে সাম্প্রতিক সময়ে বিদেশিদের নিয়ে রাজনৈতিক ও সামাজিক বিতর্ক বেড়েছে। ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ দেশটিতে বিদেশি বাসিন্দার সংখ্যা রেকর্ড ৪১ লাখ ২০ হাজারে পৌঁছেছে, যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ৩ শতাংশ।
অন্যদিকে, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের জানুয়ারির মধ্যে জাপানি নাগরিকের সংখ্যা ৯ লাখের বেশি কমেছে। দেশটির অত্যন্ত কম জন্মহারের কারণে জনসংখ্যা সংকট আরও প্রকট হচ্ছে।
এর মধ্যেই জাপানের রাজনীতিতে ডানপন্থী প্রবণতাও জোরালো হয়েছে। গত বছর ক্ষমতাসীন লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির নেতৃত্বের জন্য প্রচারের সময় প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি ভিন্ন সংস্কৃতি ও পটভূমির মানুষকে দেশে প্রবেশের সুযোগ দেওয়ার নীতি পুনর্বিবেচনার কথা বলেছিলেন।
এ ছাড়া ডানপন্থী জাপান ইনোভেশন পার্টির সঙ্গে জোট চুক্তিতে নিয়ম ভঙ্গকারী বিদেশিদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের পাশাপাশি বিদেশি জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে সম্ভাব্য ‘সামাজিক ঘর্ষণ’ মোকাবিলার পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
অন্যদিকে, অভিবাসনবিরোধী সানসেইতো পার্টিও ‘জাপান ফার্স্ট’ বার্তা দিয়ে সাম্প্রতিক নির্বাচনে নিজেদের অবস্থান শক্ত করেছে। দলটি সর্বশেষ নিম্নকক্ষের নির্বাচনে ১৫টি আসন পেয়ে তৃতীয় বৃহত্তম বিরোধী দলে পরিণত হয়েছে।
বিদেশিদের নিয়ে জাপানি জনমতেও পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব সোশ্যাল সায়েন্সের সাম্প্রতিক এক জরিপে ৫৬ দশমিক ৩ শতাংশ জাপানি নাগরিক আরও বেশি বিদেশি গ্রহণের বিরোধিতা করেছেন। ২০২৪ সালে এই হার ছিল ৩৫ দশমিক ৬ শতাংশ।
আবদুল বলেন, ২০২৪ সালের আগে তিনি বিদেশিদের প্রতি বৈষম্য খুব একটা অনুভব করেননি। তবে সম্প্রতি, বিশেষ করে অনলাইনে, মনোভাবের পরিবর্তন দেখতে পাচ্ছেন।
নেলকিনও বলেন, তার পরিচিতদের মধ্যে বিদেশিদের প্রতি বিরূপ মনোভাব প্রকাশের প্রবণতা বেড়েছে। দীর্ঘদিন জাপানে কাজ করার পরও ‘কখনোই যথেষ্ট হওয়া যাবে না’ এমন মনোভাব তাকে কষ্ট দিচ্ছে বলেও জানান তিনি।
সূত্র: আল জাজিরা
