জাতিসংঘে গাজা নিয়ে সরব বিশ্ব নেতারা, চাপে ইসরায়েল

আপডেট : ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৬:৩১

গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান, বেসামরিক মানুষকে হত্যা এবং অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি সম্প্রারণ ইস্যু এবারের জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে বিশ্বনেতাদের বক্তব্যে বিশেষ গুরুত্ব পায়। প্রায় সব দেশের নেতারা গাজা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। একই সঙ্গে ফিলিস্তিন ও ইসরায়েলের মধ্যে দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের ওপর জোর দিয়েছেন তারা। এতে জাতিসংঘে চাপের মুখে পড়ে ইসরায়েল। এদিকে ফিলিস্তিন ও ইরান ইস্যুতে আন্তর্জাতিক পদক্ষেপ জোরদারের আহ্বান জানিয়েছে অস্ট্রেলিয়া। অন্যদিকে, নিজেদের ড্রোন বিস্ফোরণে দুই ইসরায়েলি সেনা নিহত হয়েছেন।

গাজা সংকটের স্থায়ী সমাধান বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। একদিকে ওয়াশিংটন শান্তির কথা বললেও অন্যদিকে ইসরায়েলকে সামরিক সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে ট্রাম্প প্রশাসন। এরই মধ্যে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ভাষণের সময় জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের হল থেকে বেরিয়ে যান বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কয়েক ডজন কূটনীতিক। কেউ কেউ তাকে উদ্দেশ্য করে দুয়োধ্বনিও দেন। এ সময় অধিবেশনের সভাপতিকে শৃঙ্খলা বজায় রাখার আহ্বান জানাতে দেখা যায়। ঘটনাটি জাতিসংঘের অধিবেশনে গাজা ইস্যুতে ইসরায়েলকে ঘিরে আন্তর্জাতিক মতবিরোধের একটি দৃশ্যমান উদাহরণ হয়ে ওঠে।

জাতিসংঘে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রো আন্তর্জাতিক আইন ও জাতিসংঘ ব্যবস্থার প্রতি বিশ্বের দেশগুলোর আরো দৃঢ়ভাবে অঙ্গীকারবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। প্রেসিডেন্ট হিসেবে জাতিসংঘের এই বার্ষিক অধিবেশনে শেষ বারের মতো ভাষণ দিতে গিয়ে তিনি বলেন, বিশ্ব আবারও 'জঙ্গলের আইন'-এর দিকে ফিরে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। গাজা পরিস্থিতি নিয়েও তীব্র উদ্বেগ জানান ম্যাক্রেন। তিনি প্রশ্ন তোলেন, গাজায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় নিষ্ক্রিয় থাকলে বিশ্বব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা কতটা থাকবে। তার ভাষায়-কেউ কেউ শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বললেও গাজায় মানবিক সহায়তা পৌঁছানোর ক্ষেত্রে বাস্তব অগ্রগতি হয়নি। বেসামরিক মানুষকে সুরক্ষা দেওয়ার আহ্বানও জানান তিনি। ফিলিস্তিন ও ইরান ইস্যুতে আন্তর্জাতিক পদক্ষেপ জোরদারের আহ্বান জানিয়েছেন অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবানিজ। আলবানিজ বলেন, অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলের অবৈধ বসতি স্থাপনের বিরোধিতা অব্যাহত রাখবে অস্ট্রেলিয়া। একই সঙ্গে ফিলিস্তিনের ভবিষ্যতে হামাসের কোনো ভূমিকা প্রত্যাখ্যান করার কথাও জানান তিনি। তিনি বলেন, 'শান্তির সম্ভাবনাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে, এমন পদক্ষেপের বিরুদ্ধে আমরা কথা বলে যাব, যার মধ্যে পশ্চিম তীরে অবৈধ বসতিও রয়েছে। স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ জাতিসংঘে গাজায় ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডের তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি সরাসরি গাজায় ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডকে 'গণহত্যা' হিসেবে উল্লেখ করেন। সানচেজ বলেন, নেতানিয়াহু গাজায় যে 'গণহত্যা' চালিয়ে যাচ্ছেন, স্পেন তার দ্ব্যর্থহীন নিন্দা জানায়।

তিনি জানান, ইউক্রেন, লেবানন কিংবা ইরান, যেখানেই আগ্রাসনমূলক যুদ্ধ শুরু হয়েছে, স্পেন তার বিরোধিতা করেছে। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানও জাতিসংঘে গাজা ও অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডের কঠোর সমালোচনা করেন। এরদোয়ানের ভাষণের সময় জাতিসংঘে ইসরায়েলি প্রতিনিধিদল হল থেকে বেরিয়ে যায়। অন্যদিকে, ফিলিস্তিনি প্রতিনিধিরা তাকে করতালি দিয়ে সমর্থন জানান। এরদোয়ান বলেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সমর্থনে তুরস্ক যুদ্ধবিরতিতে ভূমিকা রেখেছিল। কিন্তু যুদ্ধবিরতি থাকা সত্ত্বেও গাজায় ১ হাজার ৩০০-এর বেশি বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। গাজাকে 'বর্তমান সময়ের সবচেয়ে অমানবিক ও লজ্জাজনক বন্দিশিবির' বলে উল্লেখ করেন তিনি।

জাতিসংঘের সাবেক কর্মকর্তা সালমান শেইখও গাজার পরিস্থিতিকে অত্যন্ত সংকটজনক বলে উল্লেখ করেন। তার মতে-গাজা ও অধিকৃত পশ্চিম তীরে
যা ঘটছে, সেটিকে স্বাভাবিক পরিস্থিতি হিসেবে মেনে নেওয়া উচিত নয়। গাজার সংকটের পাশাপাশি ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বিষয়টিও জাতিসংঘের আলোচনায় গুরুত্ব পেয়েছে।

জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বলেছেন, ফিলিস্তিন ও ইসরায়েলের মধ্যে দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের প্রতি আন্তর্জাতিক সমর্থন শুধু কথায় সীমাবদ্ধ থাকলে হবে না। এটি বাস্তবায়নে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের পক্ষে সমর্থন বাড়লেও অধিকৃত পশ্চিম তীর ও গাজার বাস্তব পরিস্থিতি এই সমাধানের পথ কঠিন করে তুলছে। গুতেরেসের ভাষায়, একটি স্বাধীন, গণতান্ত্রিক, ভৌগোলিকভাবে সংযুক্ত ও সার্বভৌম ফিলিস্তিন রাষ্ট্রপ্রতিষ্ঠার শর্তগুলো ধীরে ধীরে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি সম্প্রসারণ নিয়েও উদ্বেগ জানান তিনি। বিশেষ করে পশ্চিম তীরের উ১ করিডরে পরিকল্পিত নির্মাণকাজ এগিয়ে গেলে একটি ভৌগোলিকভাবে সংযুক্ত ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলে সতর্ক করেন তিনি। ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট আন্তোনিও কোস্তাও দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের পক্ষে আন্তর্জাতিক সমর্থনের কথা তুলে ধরেন। তবে তার মতে-বাস্তবে অগ্রগতি থেমে আছে। গাজার জন্য আন্তর্জাতিক শান্তি পরিকল্পনা দ্রুত বাস্তবায়নের আহ্বান জানান কোস্তা।

এদিকে গাজায় যুদ্ধে দুই ইসরায়েলি সেনা নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে দেশটির সেনাবাহিনী। নিহতরা হলেন রিজার্ভ সার্জেন্ট নাদাভ কালি, তিনি হার হালুতজের বাসিন্দা এবং সার্জেন্ট অফির মোয়ালেম, তিনি জেরুজালেমের বাসিন্দা। ইসরায়েলি স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উত্তর গাজায় সেনাবাহিনীর একটি বিস্ফোরক ডোনের ঘটনায় তারা নিহত হন। ড্রোনটি দ্বিতীয়বার উড্ডয়নের সময় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে একটি সামরিক পোস্টের ভেতরে পড়ে যায়। পরে সেনারা সেটির কাছে গেলে ড্রোনটি বিস্ফোরিত হয়।

ইত্তেফাক/এএম