ডিজেল রপ্তানি বন্ধের কথা ভাবছে যুক্তরাষ্ট্র

আপডেট : ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২০:৩২

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের জেরে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটেছে। এর প্রভাবে ডিজেলসহ সব ধরনের জ্বালানির দাম বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রেও ডিজেলের দাম এখন রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে।

শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রে এক গ্যালন (৩.৭৯ লিটার) ডিজেলের গড় দাম দাঁড়িয়েছে ৬.৫০ ডলারে। এক মাস আগেও যা ছিল ৫.৬১ ডলার। আমেরিকান অটোমোবাইল অ্যাসোসিয়েশন (এএএ) প্রতিদিন জ্বালানির দাম পর্যবেক্ষণ করে। তাদের তথ্য অনুযায়ী এমন চিত্র উঠে এসেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন কয়েক মাস পরই । এমন পরিস্থিতিতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন ও রিপাবলিকান আইনপ্রণেতারা যুক্তরাষ্ট্র থেকে ডিজেল রপ্তানি কমানো বা বন্ধ করার কথা ভাবছেন।

আগস্টে ইপসসের এক জরিপে ৪৭ শতাংশ ভোটার বলেছেন, মধ্যবর্তী নির্বাচনে ভোট দেওয়ার সিদ্ধান্তে জীবনযাত্রার ব্যয়ই তাদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। অর্থাৎ খরচ মাত্রাছাড়া হলে সরকারি দলকে ভোট দেবেন না তারা। দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও রীতিনীতির কথা বলেছেন অর্ধেকেরও কম ভোটার।

ম্যারিস্টের নতুন জরিপে অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় রিপাবলিকানদের চেয়ে ডেমোক্র্যাটদের ওপর বেশি আস্থা দেখিয়েছেন নাগরিকরা। ৪২ শতাংশ ডেমোক্র্যাটদের ওপর আস্থা রাখছেন বলে জানিয়েছেন। রিপাবলিকানদের ক্ষেত্রে এই হার ৩৪ শতাংশ।

গত বৃহস্পতিবার এমন পরিস্থিতিতে মার্কিন জ্বালানিমন্ত্রী ক্রিস রাইট বলেছেন, স্বেচ্ছায় ডিজেল রপ্তানি কমাতে তেল শোধনাগারগুলোর আগ্রহ আছে কি না, সে বিষয়ে বড় কয়েকটি পরিশোধনাগারের সঙ্গে কথা বলছেন তিনি। রয়টার্স এ তথ্য জানিয়েছে।

এর আগে মঙ্গলবার ট্রাম্প নিজেই বলেছিলেন, ডিজেল রপ্তানি কমানোর বিষয়ে তার সমর্থন আছে।

যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের সবচেয়ে বড় ডিজেল রপ্তানিকারক দেশ। তবে জ্বালানি খাতের বিশ্লেষক ও শিল্পসংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলো বলছে, রপ্তানি বন্ধ করলে উল্টো ফল হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারেও জ্বালানির দাম আরও বেড়ে যেতে পারে।

বিশ্ববাজারে দাম বাড়লে বাংলাদেশের বাজারেও তার প্রভাব পড়তে পারে। কারণ অপরিশোধিত তেলের পাশাপাশি বিপুল পরিমাণ ডিজেল আমদানি করতে হয় দেশটিকে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রায় ৩.৩১ বিলিয়ন ডলারের ডিজেল আমদানি হয়েছে, যা একক পণ্য হিসেবে আমদানি ব্যয়ের শীর্ষে। বিশ্ববাজারে দাম বাড়ায় গত অর্থবছরে বাংলাদেশের জ্বালানি আমদানি ব্যয় দ্বিগুণ হয়েছে। দাম আরও বাড়লে এই ব্যয় আরও বাড়বে।

ডিজেলের বাজার স্থানীয় নয়, বৈশ্বিক। বিশ্বের কোনো বড় উৎপাদক দেশে সরবরাহ কমে গেলে তার প্রভাব যুক্তরাষ্ট্রের বাজারেও পড়ে।

রাশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের পরিশোধনাগারগুলোয় উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় বিশ্ববাজারে জ্বালানির সরবরাহ কমেছে। ঘাটতি পূরণে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর চাপ বেড়েছে। রাশিয়ায় ড্রোন হামলায় বেশ কয়েকটি বড় শোধনাগার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কোথাও উৎপাদন কমেছে, কোথাও বন্ধ রাখতে হয়েছে।

সেন্টার ফর এ নিউ আমেরিকান সিকিউরিটির জ্যেষ্ঠ সহযোগী ফেলো র‍্যাচেল জিয়েম্বো বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের পরিশোধনাগারগুলো পূর্ণাঙ্গ সক্ষমতায় উৎপাদন করছে। স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় উৎপাদন বেশি হচ্ছে। তার পরও বিশ্ববাজারে সরবরাহের ঘাটতি পূরণ হচ্ছে না।

একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব ডিজেল মজুতও কমে যাচ্ছে। এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের তথ্য অনুযায়ী, ১১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ডিজেলের মজুত কমে ১০ কোটি ৭৯ লাখ ব্যারেলে নেমেছে। চার দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে যা সর্বনিম্ন।

বিশ্ববাজারে সরবরাহ কমে যাওয়ায় দাম বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রও এর বাইরে নয়। দেশটির উৎপাদকেরা চাইলে ডিজেল দেশের বাজারে বিক্রি করতে পারেন, আবার আন্তর্জাতিক বাজারেও বিক্রি করতে পারেন। বিশ্ববাজারে দাম বেশি হওয়ায় রপ্তানিই তাদের কাছে বেশি আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে।

মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে জীবনযাত্রার ব্যয় এখন রিপাবলিকানদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ইস্যু। ভোক্তাদের খরচ কমাতে ডিজেল রপ্তানি কমানো বা বন্ধ করার পক্ষে চাপ দিচ্ছেন দলের কয়েকজন আইনপ্রণেতা।

জিয়েম্বো বলেন, এতে দেশের বাজারে ডিজেলের দাম কিছুটা কমানো সম্ভব হতে পারে। বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ খাদ্যসহ প্রায় সব ধরনের পণ্য পরিবহনে ট্রাক ব্যবহার করা হয়। ট্রাকের মূল জ্বালানি ডিজেল। যুক্তরাষ্ট্র যে পরিমাণ ডিজেল রপ্তানি করে, তা দেশটির মোট অভ্যন্তরীণ ব্যবহারের প্রায় ৪০ শতাংশের সমপরিমাণ।

তবে ট্রাম্প প্রশাসন এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত নেয়নি। হোয়াইট হাউস আল-জাজিরাকে জানিয়েছে, প্রেসিডেন্ট সবকিছু বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেবেন।

রপ্তানি বন্ধ করা হলে যুক্তরাষ্ট্রের শোধনাগারগুলো বিদেশে ডিজেল বিক্রি করতে পারবে না। কাগজে-কলমে দেশের বাজারে ডিজেল বেশি থাকার কথা।

পরামর্শক ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান উড ম্যাকেঞ্জির বিশ্লেষকেরা বলছেন, এর অন্য দিকও আছে। যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেল রেখে দিলে দেশটির মজুত দ্রুত পূর্ণ হয়ে যাবে। শোধনাগারগুলো উৎপাদন কমাতে বাধ্য হতে পারে। ফলে একসময় যুক্তরাষ্ট্রকে পেট্রল আমদানি বাড়াতে হতে পারে।

এতে যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল অন্য দেশগুলোর ওপর প্রভাব পড়বে। বিশেষ করে লাতিন আমেরিকা ও ইউরোপকে তখন অন্য দেশ থেকে জ্বালানি সংগ্রহ করতে হবে। ফলে বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতা বাড়বে এবং দামও বাড়তে পারে।

জ্বালানিবিষয়ক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান উড ম্যাকেঞ্জি জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ সরবরাহের বড় ঘাটতি মেটানোর মতো উদ্বৃত্ত তেল পরিশোধন সক্ষমতা আপাতত শুধু চীনেরই আছে। তবে বেইজিং যুক্তরাষ্ট্রের এই পাশে দাঁড়াবে কি না, তা স্পষ্ট নয়। বিশ্লেষকদের ধারণা, বিষয়টি নিজেদের স্বার্থের সঙ্গে খাপ খায় না বলে মনে করতে পারে চীন।

ইত্তেফাক/এবিএস