এক যুগ পর পাঁচ আসামির দায়মুক্তি, মিথ্যা অপহরণ মামলায় জেল-রিমান্ড

আপডেট : ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:১৬

একটি মিসড কলের সূত্র ধরে নিখোঁজের ১২ বছর পর সুমন (১৭) নামে এক তরুণকে উদ্ধার করা হয়। এ নিখোঁজের ঘটনায় দায়ের করা অপহরণ মামলায় আসামি করা হয় পাঁচ তরুণকে। এক যুগ ধরে তাদেরকে তিন তদন্ত সংস্থা একাধিক বার রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। তারা জেল খেটেছে এবং নানা ধরনের হয়রানি নির্যাতনের মধ্যে এক যুগ পার করেছে। তাদের পরিবারও নানা হয়রানি এবং আর্থিক কষ্টের শিকার হয়েছে। সুমন নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা ছিল তার নিজের সাজানো নাটক। নিখোঁজের ১২ বছরের মধ্যে সুমন দুই সন্তানের পিতাও হয়েছেন। পরে পিবিআই তদন্ত করে ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটন করে। অবশেষে মিথ্যা মামলা থেকে দায়মুক্তি পান ঐ পাঁচ যুবক।

পল্লবী এলাকার একটি গার্মেন্টসে চাকরি করতেন সুমন। ২০১০ সালের ৩১ আগস্ট সকালে প্রতিদিনের মতো কর্মস্থলে যাওয়ার উদ্দেশ্যে পল্লবী এলাকার বাসা থেকে বের হন। ঐ দিন সুমন বাসায় ফেরেননি। তার পিতা মোজাফফর অনেক খোঁজাখুঁজি করেও ছেলের সন্ধান পাননি। ঐ সালের ৫ অক্টোবর পল্লবী থানায় তিনি একটি জিডি করেন (জিডি নং-৩৬২)। পরবর্তী সময় তিনি বিভিন্ন সূত্রে জানতে পারেন যে, তার ছেলে
সুমনকে পল্লবীর মার্ক ডিজাইন গার্মেন্টসের সামনে থেকে অপহরণ করা হয়েছে। এ ঘটনায় মোজাফফর বাদী হয়ে পল্লবী থানায় অপহরণের মামলা দায়ের করেন (মামলা নং-৯০, তাং ২৯.১০.২০১০)। 

এই মামলায় আসামি হিসেবে সুলায়মান হোসেন, মো. শাওন পারভেজ, রুবেল, সোহাগ ও মানিকের নাম উল্লেখ করেন। প্রথমে পল্লবী থানা মামলা তদন্ত করেছে। নিখোঁজের কোনো রহস্য উদ্ঘাটন করতে না পারায় মহানগর গোয়েন্দা পুলিশকে (ডিবি) মামলার তদন্তভার ন্যস্ত করা হয়। পরবর্তী সময় ২০১২ সালের ১৫ মার্চ পুলিশ হেড কোয়ার্টার্সের নির্দেশে সিআইডিকে সুমন অপহরণ মামলার তদন্ত করার দায়িত্ব দেওয়া হয়। পরবর্তী সময় বাদী নারাজি আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে মামলার তদন্তভার পুনরায় ডিবির ওপর ন্যস্ত করা হয়। ডিবি দীর্ঘ তদন্ত শেষে নিখোঁজের রহস্য উদ্ঘাটন করতে না পেরে চূড়ান্ত প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করে। আদালতের নির্দেশে অধিকতর তদন্তে গার্মেন্টস কর্মী সুমন অপহরণ মামলাটি পিবিআইয়ের ওপর ন্যস্ত করা হয়। ২০১৯ সালের ১ সেপ্টেম্বর থেকে পিবিআইয়ের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ফরিদা ইয়াসমিন কান্তার সার্বিক তত্ত্বাবধানে তদন্ত কর্মকর্তা ইন্সপেক্টর মোহাম্মদ তরিকুল ইসলাম সুমন অপহরণ মামলার তদন্ত শুরু করেন।

যেভাবে রহস্য উদ্ঘাটন: ২০২২ সালে আগস্ট মাসে সুমনের বাবার মোবাইলে মিসড কল আসে। তিনি ফোন ব্যাক করলে একজন নারী তার ছেলে সুমনের সম্পর্কে জানতে চান। মোজাফফরের কাছে বিষয়টি সন্দেহ হয়। তিনি উত্তর না দিয়ে ফোনটি রেখে দেন। তিনি মামলার তদন্ত কর্মকর্তার কাছে গিয়ে তার মোবাইল ফোনে ঐ নাম্বারটি দেখান। দ্রুত তদন্তকারী কর্মকর্তা তথ্যপ্রযুক্তির ও সোর্সের মাধ্যমে সুমনের অবস্থান এবং ঠিকানা সম্পর্কে নিশ্চিত হন। রাজধানীর কদমতলী এলাকার সুমনের বাসায় তদন্ত কর্মকর্তা উপস্থিত হন। সুমন, তার স্ত্রী ও দুই সন্তানকে দেখতে পান। ২০২২ সালে ২৩ মে সুমনকে ঐ বাসা থেকে উদ্ধার করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদ শেষে তাকে আদালতে প্রেরণ করা হয় । সুমন ১৬৪ ধারা মোতাবেক আদালতে তার নিখোঁজ হওয়ার বিষয়ে বিস্তারিত জবানবন্দি প্রদান করেন।

সুমন তার জবানবন্দিতে উল্লেখ করেন, ২০১০ সালে ৩১ আগস্ট সকাল ৮টায় পল্লবীর বাসা থেকে কর্মস্থলের উদ্দেশ্যে বের হন। পথে জুয়া খেলার আসরে যোগ দেন। ১ হাজার টাকা জুয়া খেলে হেরে যান। তার কাছে কোনো টাকা না থাকায় সুমন মোবাইল ফোনটি জুয়ার পার্টনারদের কাছে দিয়ে যান। মোবাইল ফোনটি তার বাবা কিছুদিন আগে কিনে দিয়েছিলেন। ভয়ে আর বাসায় ফিরে যাননি। সেখান থেকে সুমন গুলিস্তানে চলে যান। সেখানে একটি ভাতের হোটেলে কাজ নেন। পরবর্তী সময় কদমতলী বাসা ভাড়া নিয়ে থাকেন। সেখানে বিয়ে করেন। তার দুটি সন্তান রয়েছে বলে সুমন আদালতে তার জবানবন্দিতে উল্লেখ করেছেন। তার জবানবন্দির পর ১২ বছর ধরে সুমন অপহরণের মিথ্যা মামলা থেকে ঐ পাঁচ তরুণ নির্দোষ প্রমাণিত হয়ে অব্যাহতি পান। একযুগ ধরে জিজ্ঞাসাবাদসহ জেলহাজতে নানা হয়রানির শিকার হন তারা। এখন এই দায়ভার কে নেবে—প্রশ্ন সংশ্লিষ্টদের।

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা পিবিআইর ইন্সপেক্টর তরিকুল ইসলাম বলেন, সুমন অপহরণ মামলাটি ছিল ক্লুলেস । তথ্য প্রযুক্তিসহ নানা প্রক্রিয়া ব্যবহার করে ভিকটিমের অবস্থান ও উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে।

প্রসঙ্গত, ২০২২ সালের জানুয়ারি হতে ২০২৩ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ১০০টি চাঞ্চল্যকর ও ব্লুলেস মামলার তদন্তে পিবিআইয়ের উল্লেখযোগ্য সাফল্য নিয়ে সংকলন প্রকাশিত হয়েছে। সেখানে সুমন অপহরণ মামলার উল্লেখ রয়েছে ।

পিবিআইয়ের প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি মো. মোস্তফা কামাল বলেন, পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) একটি বিশেষায়িত তদন্ত সংস্থা। ইতিমধ্যে এটি জনসাধারণের মধ্যে আস্থা ও পেশাদারিত্বের এক অনন্য অবস্থান তৈরি করেছে ।

ইত্তেফাক/এএইচপি