হিমালয় অঞ্চলে ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসের ধাক্কায় নেপালের পর্যটন খাত বড় ধরনের সংকটে পড়েছে। পর্যটনের ব্যস্ত মৌসুম শুরু হলেও বন্যার কারণে বিদেশি পর্যটকদের অনেকে ভ্রমণ বাতিল বা পিছিয়ে দেওয়ায় পর্যটননির্ভর ছোট ব্যবসাগুলোতে এর প্রভাব পড়েছে।
আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত মাসে নেপালের উত্তরাঞ্চলে ভয়াবহ বন্যায় ১ হাজার ৪৫০ জনের বেশি মানুষ নিহত হন। এতে গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও সেতু ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় দেশের বিভিন্ন পর্যটন এলাকায় যোগাযোগ ব্যাহত হয়। বন্যার প্রভাব না পড়া এলাকাগুলোতেও পর্যটকদের উপস্থিতি কমে গেছে।
প্রতি বছর আগস্টে বর্ষা শেষ হওয়ার পর সেপ্টেম্বর থেকে নেপালে পর্যটনের ব্যস্ত মৌসুম শুরু হয়। এ সময় আকাশ পরিষ্কার থাকায় দেশটিতে বিপুলসংখ্যক বিদেশি পর্যটক ভিড় করেন। পর্যটন খাত দেশটির মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ৮ শতাংশের সঙ্গে যুক্ত এবং ১০ লাখের বেশি মানুষের কর্মসংস্থানের সঙ্গে জড়িত।
গত বছর নেপালে ১১ লাখ ৫০ হাজারের বেশি পর্যটক গিয়েছিলেন। এর প্রায় এক-তৃতীয়াংশ পর্যটক সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বরের ব্যস্ত মৌসুমে দেশটি ভ্রমণ করেন।
কাঠমান্ডুর ট্যুর প্ল্যানার ও ট্যাক্সিচালক পুষ্পরাজ রিমাল বলেন, বন্যার কারণে এ বছর অধিকাংশ বিদেশি পর্যটক তাদের ভ্রমণ বাতিল করেছেন। তিনি সাধারণত কাঠমান্ডু ও পোখারার বিভিন্ন হোটেল এবং ট্রেকিং প্রতিষ্ঠানের হয়ে কমিশনে কাজ করেন।
তিনি বলেন, ‘এখনও পরিস্থিতি এক ধরনের লকডাউনের মতো।’ দুই মাসের জন্য দুটি গাড়ি ভাড়া করলেও স্বাভাবিক মৌসুমের তুলনায় এ বছর মাত্র এক-চতুর্থাংশ ব্যবসা করতে পেরেছেন বলেও জানান তিনি।
কাঠমান্ডু, পোখারা ও চিতওয়ানের সঙ্গে সংযোগকারী মহাসড়কের পাশে ঘরে তৈরি ঘোল বিক্রি করেন ৬১ বছর বয়সী সীতা নেপালি ও তার ৬৮ বছর বয়সী স্বামী রামাকান্ত নেপালি। বন্যার পর সড়ক বন্ধ থাকায় টানা ১১ দিন তাদের কোনো বিক্রি হয়নি। সড়ক খুলে দেওয়ার পরও পর্যটক কম থাকায় আগের তুলনায় তাদের বিক্রি অর্ধেকেরও নিচে নেমে গেছে।
বিদেশি পর্যটকদের অনেকেই বন্যার খবর ও বিভিন্ন দেশের দূতাবাসের ভ্রমণ সতর্কতার কারণে নেপাল সফর বাতিল করেছেন। যুক্তরাজ্যের দূতাবাস ১১ সেপ্টেম্বরের এক সতর্কবার্তায় জানিয়েছে, বন্যার কারণে নেপালের অনেক এলাকা অস্থিতিশীল হয়ে পড়েছে এবং দেশের অভ্যন্তরে নিরাপদ ভ্রমণের নিশ্চয়তা দেওয়া কঠিন। যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাসও একই ধরনের সতর্কতা জারি করে কিছু এলাকাকে ভ্রমণ-নিষেধাজ্ঞার আওতায় রেখেছে।
তবে নেপালের দূতাবাসের কর্মকর্তারা বলছেন, বন্যায় পুরো দেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। নয়াদিল্লিতে নেপালের দূতাবাসের চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স সুরেন্দ্র থাপা বলেন, ‘নেপাল খোলা আছে এবং নিরাপদ। শুধু কিছু এলাকা এড়িয়ে চলতে হবে।’
চিতওয়ানের একটি রিসোর্টের কর্মী প্রমিলা ছেত্রী বলেন, বন্যার পর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তাদের রিসোর্টের ৮০ শতাংশ বুকিং বাতিল হয়ে যায়। চিতওয়ানের প্রধান মহাসড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে প্রায় দুই সপ্তাহ বন্ধ থাকায় পর্যটন ব্যবসায় বড় ধরনের ক্ষতি হয়েছে।
তিনি বলেন, বন্যার সতর্কবার্তাকে অনেক পর্যটক পুরো নেপাল ভ্রমণ না করার নির্দেশনা হিসেবে ভুল বুঝেছেন। অথচ দেশের অনেক এলাকা বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরের ওপর নির্ভরশীল ছোট-বড় অনেক ব্যবসা এ কারণে ক্ষতির মুখে পড়েছে।
বন্যার কারণে পর্যটন খাতে মোট অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ এখনও নিরূপণ করা হয়নি। তবে পর্যটননির্ভর ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা ইতোমধ্যে আয় কমে যাওয়ার চাপ অনুভব করছেন। ঘোল বিক্রেতা সীতা নেপালি জানান, আয় ব্যাপকভাবে কমে যাওয়ায় তারা এখন দুপুরের খাবারে শুধু চিড়া ও ঘোল খাচ্ছেন।
আল জাজিরা জানায়, বন্যার প্রভাব কাটিয়ে নেপালের পর্যটন মৌসুম কতটা ঘুরে দাঁড়াতে পারে, তা এখন অনেকটাই নির্ভর করছে পর্যটকদের আস্থা ও ক্ষতিগ্রস্ত যোগাযোগব্যবস্থা কত দ্রুত স্বাভাবিক হয় তার ওপর।
সূত্র: আল জাজিরা
