গণতন্ত্র ও আইনের শাসন : সংকটের মূল কারণ

আপডেট : ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩:৫৯

কথায় বলে : বন্যেরা বনে সুন্দর, শিশুরা মাতৃক্রোড়ে। উন্নত গণতান্ত্রিক দেশের যেই সকল নাগরিক মনেপ্রাণে চাহেন সমগ্র বিশ্বে গণতন্ত্রের জয় হউক, দেশে দেশে আইনের শাসন সুপ্রতিষ্ঠিত হউক, তাহারা তৃতীয় বিশ্বের দেশে আসিয়া সকল কিছু দেখিয়া হতাশায় নিমজ্জিত হন। কিছুদিন বসবাস করিবার পর সেই দেশ ছাড়িয়া চলিয়া যাইবার জন্য অস্থির হইয়া পড়েন। তাহারা হাঁপাইয়া উঠেন, তাহাদের দম বন্ধ হইবার জোগাড় হয়। এমন পরিবেশ তাহাদের অচেনা এবং ইহাতে তাহারা বসবাসে অভ্যস্ত নহেন।

উপর্যুক্ত পরিস্থিতির কারণ কী? কেননা এই সকল দেশের গণতন্ত্র আর উন্নত দেশের গণতন্ত্র এক নহে। ইহাতে রহিয়াছে আকাশ-পাতাল ফারাক। এই সকল দেশে গণতন্ত্রের নামে অনেক সময় যাহা করা হয়, তাহা স্বৈরতন্ত্রকেও হার মানায়। উন্নয়নশীল দেশে গণতন্ত্রের ধ্যানধারণা ও চালচলন অদ্ভুত! এই সকল দেশে গণতন্ত্র অনেক সময় মনের মাধুরী মিশাইয়া নির্মাণ করা হয়। নিজেদের মতো করিয়া তৈরি করা হয় গণতন্ত্রের সংজ্ঞা। তাই গণতন্ত্রের দেশের মানুষ এই সকল দেশে আসিয়া অস্বস্তি বোধ করিবেন ইহাই স্বাভাবিক। শুধু বিদেশি নাগরিক কেন, এই সকল দেশের শিক্ষিত ও মেধাবী তরুণরা কেন মাতৃভূমি ছাড়িবার জন্য এতটা ব্যাকুল থাকেন? প্রকৃতপক্ষে যেই সকল দেশে গণতান্ত্রিক চর্চা নাই, সেইখানে মেধা ও মননের মূল্যায়নের আশা করা বাতুলতা মাত্র। সর্বত্র অন্যায়-অনিয়ম, ঘুষ-দুর্নীতি, মারামারি-কাটাকাটি, আহাজারি-রাহাজানি, দারিদ্র্য-বেকারত্ব ইত্যাদি বজায় থাকে বলিয়া একসময় মেধাবী তরুণ-তরুণীটির জীবনের লক্ষ্য থাকে জীবনের ঝুঁকি লইয়া হইলেও দেশ ছাড়িয়া চলিয়া যাওয়া। গণতন্ত্র মানে কেবল নির্বাচন নহে। নির্বাচন গণতন্ত্রে উত্তরণের প্রাথমিক ধাপ মাত্র; কিন্তু ইহার পর নাগরিকদের সহিত গণতান্ত্রিক আচরণ করা হইতেছে কি না, তাহাই দেখিবার বিষয়। গণতন্ত্রের কথা বলিলে আইনের শাসনের কথা এমনিতেই চলিয়া আসে। ইহা একে অপরের পরিপূরক; কিন্তু উন্নয়নশীল দেশে কি আইনের শাসন রহিয়াছে? এই সকল দেশে কি খুনখারাবি ও নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড নিয়মিত ঘটনা নহে? বড় ধরনের অপরাধ করিয়াও ক্ষমতাবান ও প্রভাবশালী অপরাধীরা কি ধরা পড়ে? ধরা পড়িলেও কি ঠিকই আইনের ফাঁকফোকর দিয়া বাহির হইয়া আসে না? তাহা হইলে সেই সকল দেশে নানা অপরাধ বন্ধ হইবে কীভাবে? কীভাবে সেই সকল দেশ হইবে বসবাসযোগ্য?

উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ও আইনের শাসনের প্রয়োগ পদ্ধতির বৈষম্যই এই সংকটের মূল কারণ। উন্নত বিশ্বের রাষ্ট্রসমূহে আইনের চোখে সকলেই সমান। এইখানে আইন সার্বজনীন ও নিরপেক্ষ। সেইখানে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী ব্যক্তি হইতে শুরু করিয়া সাধারণ নাগরিক পর্যন্ত কেহই আইনের ঊর্ধ্বে নহেন। সেইখানে ন্যায়বিচার সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনের এক জীবন্ত বাস্তবতা। বিচার বিভাগীয় স্বাধীনতা সেইখানে স্বৈরাচারের উল্লম্ফনকে ঠেকাইয়া দেয়; কিন্তু হতভাগ্য তৃতীয় বিশ্বের দেশসমূহ! এইখানে আইনের শাসন প্রায়শই রাজনৈতিক অভিলাষ ও প্রভাবশালী গোষ্ঠীর স্বার্থরক্ষার হাতিয়ারে পরিণত হয়। আইনের প্রয়োগ ঘটে অধিকাংশ ক্ষেত্রে দুর্বল, সাধারণ কিংবা বিরুদ্ধমতের নাগরিকদের কণ্ঠরোধ করিবার উদ্দেশ্যে। ইহাতে বিচারব্যবস্থার প্রতি নাগরিক সমাজের আস্থা বিনষ্ট হইয়া যায়।

এই পরিস্থিতি হইতে উত্তরণের পথ অত্যন্ত কঠিন ও সময়সাপেক্ষ হইলেও অসম্ভব নহে। উন্নয়নশীল দেশসমূহকে যদি বাস্তবিকই উন্নত বিশ্বের ন্যায় প্রকৃত গণতন্ত্র ও আইনের শাসনের সুফল ভোগ করিতে হয়, তাহা হইলে সর্বপ্রথম প্রয়োজন সদিচ্ছা ও ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ। কেবল আনুষ্ঠানিক নির্বাচন অনুষ্ঠিত হইলেই কোনো রাষ্ট্র গণতান্ত্রিক তকমা লাভ করে না। গণতন্ত্রের জন্য দরকার পরমতসহিষ্ণুতা, প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা, দুর্নীতি প্রতিরোধ এবং বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতা। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানসমূহকে রাজনৈতিক অসততা ও দুর্বৃত্ততা হইতে প্রভাবমুক্ত করিয়া স্বাধীন ও শক্তিশালী রূপে গঠন না করা পর্যন্ত এই অবস্থার পরিবর্তন কখনো ঘটিবে বলিয়া প্রতীয়মান হয় না।

ইত্তেফাক/এনএন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন