ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। বড় থেকে ছোট—সব বয়সি ব্যক্তি আক্রান্ত হচ্ছে ডেঙ্গুতে। হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীর চিকিৎসা দিতে হিমশিম পেতে হচ্ছে চিকিৎসক-নার্সদের। গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে রাজধানীর শহিদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়—বড়দের পাশাপাশি ব্যাপক সংখ্যক শিশু রোগী হাসপাতালে ভর্তি। বেডের অভাবে এক বেডেই চিকিৎসা নিচ্ছে দুই থেকে তিন জন করে শিশু।
৩১৪ নম্বর শিশু ওয়ার্ডের ভেতরে প্রবেশ করতেই দেখা যায় ২ নম্বর বেডে চিকিৎসা নিচ্ছে ফাতিহা নামের ২২ মাস বয়সি এক শিশু। শরীয়তপুর ভেদরগঞ্জ থেকে শিশুকে নিয়ে ঢাকায় এসেছেন তার মা রুমা বেগম। তিনি বলেন, ‘আমার বাচ্চার অনেক জ্বর, পা ফুলে গেছে, ঘাড় নাড়াতে পারে না, চিকিৎসক অনেকগুলো পরীক্ষা করাতে দিয়েছে, এখনো রিপোর্ট হাতে পাইনি।’ একই বিছানায় আছে আট বছরের ইলামনি। সঙ্গে থাকা ইলামনির মা দিলরুবা বেগম বলেন, গত শুক্রবার থেকে মেয়ের জ্বর। মেয়ে প্রতিদিন স্কুলে যায়; জানি না সেখানেই মশা কামড়িয়েছে কিনা। দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী ইলামনি হাসপাতালে আসার পর শনাক্ত হয়, ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত সে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য: ডেঙ্গুতে সোমবার সকাল ৮টা থেকে গতকাল মঙ্গলবার সকাল ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে আরো ছয় জনের মৃত্যু হয়েছে। এই সময়ের মধ্যে মশাবাহিত এই রোগে নতুন করে আরো ১ হাজার ৯৪২ জন আক্রান্ত হয়ে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছে। এ নিয়ে চলতি বছর ডেঙ্গুতে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াল ২৩৯ জনে। অন্যদিকে মোট আক্রান্তের সংখ্যা হয়েছে ৭৭ হাজার ৬৭২ জন। মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) বিকালে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোলরুমের প্রকাশিত ডেঙ্গুবিষয়ক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।
এর আগে সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) ডেঙ্গুতে সারা দেশে আট জনের মৃত্যু হয়। এদিন আক্রান্ত হয় ২ হাজার ৩৬ জন, যা ছিল চলতি বছরে এক দিনে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ আক্রান্তের রেকর্ড। গত রবিবার (২৭ সেপ্টেম্বর) ডেঙ্গুতে সারা দেশে ২ হাজার ১৫৮ জন আক্রান্ত হয়, যা ছিল চলতি বছরে এক দিনে সর্বোচ্চ আক্রান্ত রোগী।
শিশু ওয়ার্ডের সিনিয়র স্টাফ নার্স কৃষা রানী ও শামীমা আক্তার জানান, ‘আমাদের প্রয়োজনের তুলনায় নার্স-সংকট আছে, আর রাতের শিপটে বেশি কষ্ট হয় একটা বাচ্চার ক্যানুলা করাতে তিনর থেকে চার জনার সহায়তা দরকার হয়। আর এক বেডে দুই থেকে তিন জন রোগী রেখে আমাদের চিকিৎসা দিতে হচ্ছে।’
শহিদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহযোগী অধ্যাপক ডা. ফারজানা আফরোজ ইত্তেফাককে বলেন, ‘সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে ডেঙ্গুতে বড় এবং শিশু রোগীর মধ্যে মৃত্যু শূন্য। ডেঙ্গু চিকিৎসায় নতুন গাইডলাইন মেনেই আমরা চিকিৎসা দিচ্ছি। আমাদের সার্ভিস দেওয়ার প্রসিডিউরটা ভালো। গত তিন/চার বছর ধরে আমাদের এই হাসপাতালে ডেঙ্গুর চিকিৎসা ভালো হচ্ছে। ডেঙ্গুর ফোকাল পরসন এই চিকিৎসক জানান, হামের শিশুরোগী শেষ না হওয়ার কারণে আমরা ডেঙ্গুর ডেডিকেটেড ওয়ার্ড করতে পারছি না। জায়গা নেই। একটা বেডে তিনটা বাচ্চা রাখতে হচ্ছে। সেখানে একটা বাচ্চার সঙ্গে একজন করে এটেনডেন্টস থাকছে, তার মানে এক বেডে ছয় জন থাকছে। এটা একটা হরেবল অবস্থা। এরমধ্যে চিকিৎসা দেওয়া খুবই কষ্টসাধ্য।’
এই শিশু বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘আমাদের তিনটা শিশু ওয়ার্ড আছে, সেখানে ২০টা করে মোট ৬০টা বেড আছে। সেখানে ডেঙ্গুর জন্য ১০টা করে ৩০টা বেড় রাখা হয়েছে। তবে এই ৩০ বেডের বিপরিতে রোগী আছে ৭০-এর ওপরে। তবে চিকিৎসার ক্ষেত্রে আমাদের আন্তরিকতার কোনো অভাব নেই। দীর্ঘ সময় ধরে হামের রোগী সামলাতে গিয়ে এর মধ্যে আবার ডেঙ্গুর চাপ শুরু হয়েছে, এতে করে চিকিৎসক-নার্সদের হিমশিম পেতে হচ্ছে।’
ডেঙ্গু রোগীদের পরামর্শ হিসেবে এই চিকিৎসক জানান, ডেঙ্গু মশাবাহিত রোগ, তাই বাড়ির চারপাশ পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে, যাতে এডিস মশা না জন্মায়। ঘুমানোর সময় বাচ্চাকে অবশ্যই মশারি লাগিয়ে ঘুমাতে দিন। ফুল স্লিভের ড্রেস পরতে হবে। শিশুর জ্বর হলেই অভিভাবকদের প্যানিক হওয়া যাবে না। বাচ্চার বমি নেই বা ড্যাঞ্জার সাইন নেই, তাহলে বাড়িতে রেখে চিকিৎসা দেওয়া যেতে পারে। তবে ২৪ ঘণ্টায় বাচ্চা যেন ছয় বার প্রসাব করে, সেটা মায়েদের খেয়াল রাখতে হবে, এটা ভালো সাইন। এছাড়া জ্বরে শিশুদের ওরস্যালাইন, ডাবের পানি, ফলের রস, সুপ খাওয়াতে হবে।’
