দেশে ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে আরও ৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে চলতি বছরে নিশ্চিত হামে ১০১ জন এবং হামের উপসর্গ নিয়ে ১ হাজার ৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। সব মিলিয়ে হামে ও এর উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ১০৪ জনে।
মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়মিত হেলথ বুলেটিনে এ তথ্য জানানো হয়। বুলেটিনে বলা হয়, সোমবার সকাল ৮টা থেকে পরবর্তী ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে ঢাকা বিভাগেই ৩ জন করে মারা গেছেন। এ সময়ে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে হাম ও উপসর্গ নিয়ে নতুন করে ১ হাজার ৩৩৯ জন রোগী এসেছে।
বাংলাদেশের ইতিহাসে এত মৃত্যু কখনোই হয়নি। এত সংক্রমণও হয়নি আগে; বরং বিশেষ করে শিশুদের জন্য মারাত্মক ওই রোগ প্রায় নির্মূলের পথে ছিল বাংলাদেশ।
২০২৫ সালের ডিসেম্বরেই এ ঘোষণা দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু গত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় টিকাদানে অবহেলায় প্রায় ভুলে যাওয়া হাম বীভৎস চেহারা নিয়ে ফিরে এসেছে। বর্তমান সরকারের সময় চিকিৎসায় গাফিলতি এবং হামের গণটিকাদানের সময় অন্তত ৪০ লাখ শিশুর বাদ পড়ে যাওয়ার ঘটনায় হাম আরও বেড়েছে। দেশের নানা প্রান্তে হামে সন্তান হারানোর কান্না এখন নৈমিত্তিক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
চলতি বছরের শুরু থেকেই হামের প্রকোপ বাড়তে থাকে। কিন্তু উদাসীন ছিল তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার। মার্চে এসে হামের প্রকোপ ব্যাপক হারে বাড়তে শুরু করে। সরকারের নির্বিকার ভাব তবু যায়নি।
চিকিৎসক, জনস্বাস্থ্যবিদ ও গবেষকেরা বলছেন, বাংলাদেশে হামে এত মৃত্যু ও সংক্রমণ আগে ঘটেনি। আবার গণটিকাদানের পর হামে এত সংক্রমণ বিশ্বে বিরল। এ ঘটনাকে রাষ্ট্রীয় অবহেলার চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ বলেছেন বিশিষ্ট জনস্বাস্থ্যবিদ ডা. মুশতাক হোসেন। এই অবহেলার জন্য দায়ীদের চিহ্নিত করা এবং বিচারের মুখোমুখি করার দাবি তার। তিনি বলেছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় টিকায় অবহেলা করা হয়। এ সরকারের সময় চিকিৎসা এবং টিকা উভয় ক্ষেত্রেই অবহেলা করা হয়। এসব অবহেলার দায় নিতেই হবে।
আরেক জনস্বাস্থ্যবিদ বে-নজির আহমেদ মনে করেন, হাম প্রতিরোধে কার্যত ব্যর্থ হয়েছে সরকার। সরকারের স্বাস্থ্যমন্ত্রী এর দায় নিয়ে পদত্যাগের কথা বিবেচনা করতে পারেন বলে মনে করেন তিনি।
বিভাগভিত্তিক হিসাবে, গত ২৪ ঘণ্টায় ঢাকা বিভাগে ৫১৬ জন, রাজশাহীতে ২৯, সিলেটে ২০৬, চট্টগ্রামে ২৭৯, বরিশালে ১০৭, ময়মনসিংহে ৮৬, খুলনায় ৮৯ এবং রংপুরে ২৭ জনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে হামের উপসর্গ নিয়ে মোট ১ লাখ ৬৮ হাজার ৬৫৫ জন রোগী ভর্তি হয়েছে। তাদের মধ্যে ১ লাখ ৬১ হাজার ৭৯৮ জন চিকিৎসা নিয়ে হাসপাতাল ছেড়েছে।
গত ১৫ মার্চ থেকে দেশে সন্দেহজনক হামের রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৯০ হাজার ৫৫০ জনে। এর মধ্যে নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত হয়েছেন ২১ হাজার ৩৯২ জন।
এদিকে দেশজুড়ে হামের সংক্রমণ বেড়ে যাওয়া এবং শত শত শিশুর মৃত্যুর পরিপ্রেক্ষিতে এর কারণ অনুসন্ধানের দাবি করছেন জনস্বাস্থ্যবিদেরা। সরকারের মন্ত্রীসহ একাধিক ব্যক্তি বিষয়টি তদন্তের কথা বলেছিলেন।
বে-নজির আহমেদ বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে হামের এ পরিস্থিতির নেপথ্যের কারণ অনুসন্ধানে ব্যবস্থা নেওয়ার কিছু কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু এখন পর্যন্ত কথাতেই সব শেষ হয়েছে। বাস্তবে কোনো কিছু করা হয়নি। এ ধরনের একটি তদন্ত হলে আমাদের ভবিষ্যতের সমস্যা সমাধানে করণীয় সম্পর্কেও দিকনির্দেশনা পাওয়া যেত; কিন্তু এখন হাম পরিস্থিতির নেপথ্যের কারণ বিশ্লেষণ দরকার।’
এসময় দায়ীদের চিহ্নিত করা দরকার বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
