ধর্ষণ মামলা

আদালতের রায়ে যাবজ্জীবন বিএনপির সাবেক নেতার, আপিলে জামিন

আপডেট : ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৯:১১

‘এই যে আমাকে সাজা দিল। দুর্নীতি কোথায় গিয়ে ঠেকেছে আপনাদের ধারণা আছে? আমার বিরুদ্ধে মামলা দিল। চারজনের সাক্ষীতে যদি আমাকে যাবজ্জীবন জেল দেয়, তাহলে এখানে কয়েক হাজার লোক আছে এরা তো সবাই সাক্ষী দিচ্ছে প্রতিপক্ষরা কী করেছে। বিচার হবে। বিচার কিন্তু শুরু হয়েছে। আমি আপনাদের কথা দিচ্ছি এই নাজিরপুরের মাটিতেই বিচার হবে।’

ধর্ষণ মামলায় যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত আসামি ও প্রধান শিক্ষক ফিরোজুল ইসলামের বিরুদ্ধে (৪৮) আপিলে বেরিয়ে এসে এমনই হুমকিমূলক বক্তব্য দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এই সংক্রান্ত একটি ভিডিও ইতোমধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে।

ভিডিওকে কেন্দ্র করে আলোচনায় আসা ফিরোজ ফিরোজ গুরুদাসপুর উপজেলা বিএনপির সাবেক সিনিয়র সহ-সভাপতি।

জানা গেছে, এসএসসি পরীক্ষার্থীকে (১৫) বিদ্যালয় থেকে অপহরণের পর আটকে রেখে ধর্ষণের মামলায় একই বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. ফিরোজুল ইসলাম ফিরোজকে (৪৮) যাবজ্জীবনসহ দুই মেয়াদে সাজা দিয়েছিলেন আদালত। উচ্চ আদালতের নির্দেশে মঙ্গলবার রাতে রাজশাহী কারাগার থেকে মুক্তির পর স্থানীয় লোকজন নিয়ে গুরুদাসপুরের নাজিরপুরে সভা করেন তিনি। সেখানে বক্তব্য দেওয়ার সময় ফিরোজ এসব কথা বলেন।

কাকে উদ্দেশ্য করে এমন হুমকিমূলক বক্তব্য দেওয়া হয়েছে তা উল্লেখ করেননি তিনি। তবে লোক মাধ্যমে ভুক্তভোগী ছাত্রীর বাবা মামলার বাদীকে নানা ধরনের হুমকি দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীর বাবা মামলার ও বাদী বলেন, ফিরোজুল ইসলাম জামিনে এসেই আমাকে হত্যার হুমকি দিচ্ছে। নাজিরপুরের মাটিতেই বিচার করার হুমকিও দিয়েছেন। আমি পরিবার নিয়ে আতঙ্কে বসবাস করছেন। বিষয়টি আমি থানাতেও জানিয়েছি।

দণ্ডপ্রাপ্ত ফিরোজ নাটোরের গুরুদাসপুর উপজেলার নাজিরপুর মরিয়ম মেমোরিয়াল বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। তিনি নাজিরপুরের দৌলতপুর গ্রামের গোলাম মোস্তফার ছেলে। ফিরোজ গুরুদাসপুর উপজেলা বিএনপির সাবেক সিনিয়র সহ-সভাপতি ছিলেন। একই বিদ্যালয়ের এক ছাত্রীকে (১৫) অপহরণের পর আটকে রেখে ধর্ষণ করেছিলেন ফিরোজ। সেই ঘটনার ভিডিও ধারণ করেছিলেন। অপরাধ প্রমাণিত হওয়ায় পৃথক দুটি ধারায় গত বছরের ১১ নভেম্বর রায় ঘোষণা করেন রাজশাহী দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারক মলহিদুজ্জামান মুহিত।

স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে, গত মঙ্গলবার দুই শতাধিক গাড়ির বহর নিয়ে রাজশাহী কারাগারের মূল ফটক থেকে ফুলের মালা দিয়ে ফিরোজকে বরণ করেন তার সমর্থকেরা। পরে রাতে নাজিরপুর এলাকায় কয়েকশ’ লোকের উপস্থিতিতে একটি সমাবেশ করেন তিনি। সমাবেশের বক্তৃতায় শিক্ষক প্রধান শিক্ষক ফিরোজ আরও বিভিন্ন ধরনের কথা বলেন। এই ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়লে নানা ধরনের সমালোচনা শুরু হয়।

আদালতের রায়ে যাবজ্জীবন সাজা, আপিলে জামিন

দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের সরকারি কৌঁশলি মুন্সি আবুল কালাম আজাদ জানিয়েছিলেন, প্রধান শিক্ষক ফিরোজের বিরুদ্ধে ধর্ষণ প্রমাণ হওয়ায় যাবজ্জীবন এবং অপহরণের ঘটনায় পৃথক একটি ধারায় ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছিলেন আদালত। নির্যাতিত শিক্ষার্থীর পরিবার আদালতের রায়ে সন্তুষ্ট ছিল। কিন্তু আপিলে আসামি ফিরোজ মুক্তি পাওয়ায় বাদীর পরিবারে ভীতি তৈরি হয়েছে।

ওই ছাত্রীর বাবা বলেন, মামলা দায়ের করার পর থেকে রায় আজ পর্যন্ত তিন বছরের বিভিন্ন সময়ে আসামি ফিরোজ লোকজন নিয়ে নানাভাবে হুমকি দিয়েছেন। টাকার লোভ দেখিয়ে আপোষ মীমাংসা করতে চেয়েছেন। কিন্তু মেয়ের সম্মানের কথা চিন্তা করে তারা সব প্রতিকূলতা পেরিয়ে মামলা চালিয়ে গেছেন। রাজশাহী দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের রায়ে তারা সন্তুষ্ট ছিলেন। কিন্তু ১১ মাস জেল খাটার পর আপিল বিভাগে গিয়ে জামিন পেয়েছেন আসামি। বেরিয়ে এসে বিচার করার হুমকি দিয়েছেন। এখন তারা চরমভাবে নিরাপত্তাহীনতায় পড়েছেন।

মামলার নথিতে যা রয়েছে

মামলার নথি সূত্রে জানা গেছে, নাটোরের গুরুদাসপুর উপজেলার একটি গ্রামের ওই ছাত্রী নাজিরপুর মরিয়ম মেমোরিয়াল বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে লেখাপড়া করতেন। ২০২২ সালের ১ অক্টোবর এসএসসির ব্যবহারিক পরীক্ষা দিতে এলে বিদ্যালয়ের ফটকের সামনে থেকে সেখানকার প্রধান শিক্ষক প্রকাশ্যে ওই ছাত্রীকে জোরপূর্বক মাইক্রোবাসে তুলে নিরুদ্দেশ হন। এক পর্যায়ে রাজশাহীর একটি আবাসিক হোটেলে নিয়ে হাত-পা বেঁধে ধর্ষণ করেন। পরে প্রত্যক্ষদর্শীরা বিষয়টি ভুক্তভোগীর পরিবারকে জানান।

এক পর্যায়ে ওই ছাত্রীর বাবা বাদী হয়ে ফিরোজ ও তার দুই ভাইকে আসামি করে গুরুদাসপুর থানায় ধর্ষণ মামলা করেন। পরে ১১ অক্টোবর রাত সোয়া ১২টার দিকে গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার তকীতলার একটি আবাসিক হোটেল থেকে অভিযুক্ত ওই প্রধান শিক্ষককে গ্রেপ্তার করে তৎকালীন র‌্যাব-৫।

সরকারি কৌঁশলি মুন্সি আবুল কালাম আজাদ বলেন, ২০২৫ সালের ১১ নভেম্বর মামলার রায় ঘোষণার তারিখ ছিল। এর আগে ২৭ নভেম্বর ধার্য তারিখে হাজিরা দিতে গেলে আদালত ফিরোজের জামিন বাতিল করে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। রায় ঘোষণার সময় আসামিদের আদালতে হাজির করা হয়। পুলিশের দেওয়া চূড়ান্ত প্রতিবেদন, সাক্ষীদের সাক্ষ্য এবং ধর্ষণের ভিডিওতে প্রধান শিক্ষক ফিরোজের বিরুদ্ধে দুটি অপরাধ প্রমাণিত হয়। এসময় অপরাধীকে দোষী সাব্যস্ত করে ধর্ষণের ধারায় যাবজ্জীবন ও অপহরণের অপর একটি ধারায় ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেন বিচারক। পরে ফিরোজকে কারাগারে নিয়ে যায় পুলিশ। এ সময় খালাস দেওয়া হয় অপর দুই আসামিকে।

এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বক্তব্য ও মামলার বাদীকে হুমকির অভিযোগ দেওয়া প্রসঙ্গে জানতে চেয়ে ফিরোজুল ইসলামের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও কল রিসিভ করেননি তিনি। এতে তার বক্তব্য জানা যায়নি।

গুরুদাসপুর থানার ওসি আব্দুল হান্নান বলেন, ধর্ষণ মামলার বাদীকে হুমকি দেওয়া হলে অভিযোগ সাপেক্ষে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। 

ইত্তেফাক/এপি