শ্রেণিকক্ষে প্রধানমন্ত্রীর বাংলা উচ্চারণ নিয়ে মন্তব্য করার অভিযোগে আটক কুষ্টিয়ার দৌলতপুরের এক স্কুলশিক্ষককে প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি হস্তক্ষেপে সসম্মানে মুক্তি দিয়েছে পুলিশ। বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) রাত সাড়ে ১১টার দিকে পুলিশ সদস্যরা ওই শিক্ষককে তার নিজ বাসভবনে পৌঁছে দেন।
মুক্ত হওয়া শিক্ষকের নাম গোলাম কিবরিয়া লালন। তিনি দৌলতপুর উপজেলার প্রাগপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের বাংলা বিষয়ের শিক্ষক। দৌলতপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খালেদুর রহমান বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সুস্পষ্ট নির্দেশনায় শিক্ষককে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে এবং পুলিশি নিরাপত্তায় তাকে বাড়ি পৌঁছে দেওয়া হয়।
শিক্ষককে ছেড়ে দেওয়ার পটভূমি ব্যাখ্যা করে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র ও উপদেষ্টা মাহ্দী আমিন বুধবার দিবাগত রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে একটি পোস্ট দেন। সেখানে তিনি উল্লেখ করেন, কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে শ্রেণিকক্ষে প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে এক শিক্ষকের মন্তব্যের জেরে স্থানীয় শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও এলাকার লোকজনের মধ্যে অসন্তোষ ও উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। বিদ্যালয় চত্বরে বিক্ষোভের মুখে অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে পুলিশ ওই শিক্ষককে হেফাজতে নিয়ে থানায় যায়।
মাহ্দী আমিনের ভাষ্য অনুযায়ী, এই আটকের ঘটনা প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টিগোচর হলে তিনি সংক্ষুব্ধ হন এবং তাৎক্ষণিকভাবে সংশ্লিষ্ট থানাকে নির্দেশ দেন যেন শিক্ষককে কোনো প্রকার হেনস্তা না করে সসম্মানে ও নিরাপদে তার বাড়িতে পৌঁছে দেওয়া হয়। প্রধানমন্ত্রীর এই স্পষ্ট নির্দেশনার পরপরই দৌলতপুর থানা পুলিশ শিক্ষক গোলাম কিবরিয়া লালনকে নিরাপত্তা দিয়ে বাড়ি পৌঁছে দেয়।
প্রধানমন্ত্রীর গণতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরে মাহ্দী আমিন তার পোস্টে আরও লেখেন, প্রধানমন্ত্রী মনে করেন ভিন্নমত থাকা অত্যন্ত স্বাভাবিক এবং প্রতিটি মানুষেরই নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি ও মত প্রকাশের অধিকার রয়েছে। কারও মতের সঙ্গে দ্বিমত থাকলেও তার মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে শ্রদ্ধা জানানোই গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির মূল ভিত্তি। পারস্পরিক সম্মানবোধ, ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি ও সহাবস্থানের চর্চাই সমাজকে আরও সুদৃঢ় ও শক্তিশালী করবে বলে প্রধানমন্ত্রী দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন।
এর আগে বুধবার বেলা ১১টার দিকে ভেড়ামারা-প্রাগপুর আঞ্চলিক মহাসড়কের প্রাগপুর এলাকা থেকে শিক্ষক গোলাম কিবরিয়া লালনকে আটক করা হয়েছিল। স্থানীয় বাসিন্দা ও শিক্ষার্থীদের একটি অংশের অভিযোগ ছিল, গত মঙ্গলবার বিকেলে দশম শ্রেণির বাংলা পাঠদানের সময় জাতিসংঘে প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক বাংলা ভাষণের প্রসঙ্গটি আসে। আলোচনা চলাকালে শিক্ষক লালন প্রধানমন্ত্রীর বাংলা উচ্চারণের ধরন নিয়ে বিরূপ মন্তব্য করেন, যা একপর্যায়ে আপত্তিকর রূপ নেয় বলে দাবি করা হয়।
শ্রেণিকক্ষের এই আলোচনার খবর জানাজানি হলে বুধবার সকালে কিছু অভিভাবক ও স্থানীয় বাসিন্দা বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে জড়ো হয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন এবং শিক্ষকের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি তোলেন। পরিস্থিতি ক্রমশ উত্তপ্ত হয়ে উঠলে পুলিশ সেখানে উপস্থিত হয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেয় এবং নিরাপত্তার স্বার্থে শিক্ষক লালনকে নিজেদের হেফাজতে নিয়ে থানায় নিয়ে যায়।
তবে পুরো ঘটনাটি ভুল বোঝাবুঝি থেকে তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রাগপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও প্রাগপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আশরাফুজ্জামান মুকুল। তার ভাষ্যমতে, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের সময় শিক্ষক লালন কোনো প্রকার কটূক্তি বা আপত্তিকর মন্তব্য করার অভিযোগ অস্বীকার করেন। শিক্ষকটি পুলিশকে জানান, দীর্ঘ সময় প্রবাসে থাকার কারণে প্রধানমন্ত্রীর বাংলা উচ্চারণে কিছুটা অস্পষ্টতা তৈরি হয়েছে—শ্রেণিকক্ষে সাধারণ আলোচনা প্রসঙ্গে কেবল এটুকু কথাই তিনি বলেছিলেন, যা পরবর্তীতে অতিরঞ্জিত রূপ পেয়ে ক্ষোভের সৃষ্টি করেছিল।
