টেকনাফ পাহাড়ি অঞ্চল অপহরণকারী ও ডাকাতদলের অভয়ারণ্যে পরিনত হয়েছে বলে অভিযোগ ওঠার পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কয়েক দফা অভিযানে ৩০ আস্তানা গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। তবে পাহাড় সংলগ্ন এলাকায় জীবিকার তাগিদে কাজে যাওয়া কৃষক-শ্রমিকদের মধ্যে এখনো আতঙ্কে বিরাজ করছে।
স্থানীয়রা জানান, টেকনাফ উপজেলার পাহাড় সংলগ্ন এলাকায় কৃষক-শ্রমিকরা জীবিকার তাগিদে শাকসবজি, পানের বরজ, মাছ চাষসহ নানা কাজে ব্যস্ত সময় পার করেন। তবে পাহাড়ি ডাকাতদলের ভয়ে ও আতঙ্কে ভয়ভীতিতে তারা নিরাপদে কাজ করতে পারছেন না। যে কোনো সময় ডাকাত ও অপহরণকারী চক্রের কবলে পড়ার শঙ্কায় অনেকেই আতঙ্কের মধ্যে কাজ করছেন। ইতিপূর্বে কয়েক শ কৃষক-শ্রমিক অপহরণের শিকার হয়েছেন। পাহাড়সংলগ্ন এলাকায় বসবাসকারী লোকজনও তাদের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন। একাধিক বার অস্ত্রের মুখে দিনদুপুরে বাড়ি ঘর থেকে লোকজন অপহরণ করে নিয়ে মুক্তিপন আদায়ের ঘটনা ঘটে।
বিশেষ করেন বাহারছড়া, হোয়াইক্যংও হ্নীলা ইউনিয়ন সংলগ্ন পাহাড়ি এলাকায় বসবাসকারীরা বাসিন্দারা প্রায়ই ডাকাতের আতঙ্কে থাকেন। অন্য দিকে পুলিশ-বিজিবিসহ অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা গত দুই সপ্তাহে বাহারছড়া সংলগ্ন পাহাড়ে কয়েক দফা অভিযানে পরিচালনা করেছেন। এসব অভিযানে ৩০টির মতো ডাকাতের আস্তানা গুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। বাহারছড়ার ইউপির জাহাজপুরার কৃষক আলী আকবর বলেন, ‘জীবিকার তাগিদে পাহাড়ি এলাকায় যুগ যুগ ধরে কৃষিকাজ করে আসছি। রোহিঙ্গারা আসার পর থেকে অপহরণ-ডাকাতি বাড়ছে। তবে এসব অপরাধের সঙ্গে স্থানীয় কিছু দুষ্কৃতিকারী জড়িত বলে জানা গেছে।' তিনি আরো জানান, ডাকাতদল কাউকে ধরে নিয়ে গেলে সহজে তাদের কাছ থেকে উদ্ধার করা সম্ভব হয় না। অনেক সময় মুক্তিপন ছাড়া ভুক্তভোগীর মুক্তি মেলে না। ডাকাতদল কখনো কখনো দিনদুপুরে গুলি ছুঁড়ে বাড়িঘর থেকে লোকজন ধরে নিয়ে যায়। এসব কারণে এলাকায় সব সময় আতঙ্ক থাকে।'
হোয়াইক্যংয়ের বাসিন্দা মোহাম্মদ ইসমাইল জানান, বিভিন্ন প্রয়োজনে হোয়াইক্যং-শামলাপুর সড়ক দিয়ে আসা-যাওয়া করতে হয়। কিন্তু ডাকাতদল সুযোগ পেলে সড়কে ব্যারিকেড দিয়ে লোকজন ধরে পাহাড়ের ভেতর নিয়ে যায়। পরে মুক্তিপণ দাবি করা হয়, মুক্তিপণ না পেলে অপহৃ তদের ওপর অমানবিক নির্যাতন চালানো হয়।
সিএনজি অটোরিকশা চালক আব্দুর রহিম বলেন, ‘হোয়াইক্যং থেকে বাহারছড়া, শামলাপুর ও কক্সবাজারে যাত্রী নিয়ে যাতায়াতের সময় আমি নিজেও আতঙ্কের মধ্যে থাকি। এ সড়কে পুলিশের টহল থাকলেও পাহাড়ি সশস্ত্র ডাকাতরা যে কোন সময় তাদের আটক করতে পারে এমন ভয় সব সময়ই থাকে। বিশেষ করে সন্ধ্যার পরে আতঙ্ক আরো বেড়ে যায়।' তিনি আরো জানান, এই সড়কে একাধিক বার অপহরণ ও ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে। ফলে যাত্রী ও চালকদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা কাজ করে। হোয়াইক্যং ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য আবুল হাসেম মেম্বার জানান, অপহরণ ও ডাকাতির রোধে আইনশৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনী কাজ করছে। তবে যারা অপহরণকারীদের সহযোগিতা করেছে, তাদেরকেও আটক করা দরকার। যে হারে অপহরণের ঘটনা ঘটেছে, তাতে কৃষক- শ্রমিকরা পাহাড়ি এলাকায় কাজ করতে গেলে ভয় পাবেন এটাই স্বাভাবিক।
স্থানীয় আরেক শিক্ষক মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ জানান, অপহরণের ঘটনা এখন বিভিন্নভাবে ঘটছে। কেউ কৌশলে বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে বেঁধে রেখে টাকা আদায় করছে। আবার কৃষক- শ্রমিকরা পাহাড়িসংলগ্ন এলাকায় চাষাবাদের জমিতে গেলে অপহরণকারীরা সুযোগ পেলে সেখান থেকে তাদেরকেও ধরে নিয়ে যাচ্ছে। আমরা আশা করব, এই অপহরণ বাণিজ্য বন্ধ হবে।'
টেকনাফ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাইফুল ইসলাম জানান, অপহরণ ও মানব পাচার রোধে টেকনাফের বাহারছড়া ইউনিয়নে পাহাড়ি এলাকায় থানা পুলিশ ও বিজিবির যৌথ অভিযানে ডাকাত ও মানব পাচারকারীদের আনুমানিক ৩০ আস্তানা ভেঙে দেওয়া হয়েছে। তিনি আরো জানান, অভিযানের সময় দুই জন ভিকটিমকে উদ্ধার করা হয়। ডাকাত ও মানব পাচারকারীদের বিরুদ্ধে স্থানীয়দের সহযোগিতায় এই অভিযান অব্যাহত থাকবে বলে ওসি জানান।
