চঞ্চল প্রমোদতরিতে বসে বাঙালি খাবার খাবেন। এর চেয়ে আনন্দের আর কী আছে। হাতের প্লেটে সাদা ভাত, খাশির মাংস, ডাল, মুরগির মাংস, ছোট মাছের তরকারি-এসব নিয়ে ক্রুজশিপের জানালায় বসে যতদূর চোখ যায় সাগরের ঢেউয়ে রোমাঞ্চিত হবেন আর দুপুরের খাবেন। গতকাল দুপুরে বাংলাদেশের আরচাররা বাঙালি খাবারের স্বাদ নিয়েছেন।
এশিয়ান গেমসে পদকের লড়াইয়ের মঞ্চের ধারে কাছেও যেতে না পারা আরচারদের খুব ইচ্ছে হলো বাঙালি খাবার খাবেন। কর্তাদের কাছে আরচারদের আবদার ছিল, কারণ জাহাজে যেসব খাবার দিয়েছে তাতে মুখের স্বাদ পূর্ণ হয় না। তাই রুই মাছের ঝোলে ভরা খাবার নিয়ে বান্দা হাজির। যা খাওয়ার খেয়ে নাও, এশিয়ান গেমসেই সিনিয়রদের শেষ পর্ব। ইরাকে যাবেন নতুনরা। আর যারা জাপানে আইচি-নাগোয়া এশিয়ান গেমসে খুব ভালো পারফরম্যান্স করেছেন সেই আরচারও ইরাকে যাবেন।
এশিয়ান গেমসে বাংলাদেশের আরচাররা হতাশ করেছেন। ২০১০ এশিয়ান গেমস থেকে আরচারি যুক্ত হয়েছে। ২০২২ গুয়াংজু এশিয়ান গেমসে ছেলেদের রিকার্ভ ইভেন্টে সেমিফাইনাল খেলেছিল। চার বছর পর আবার এশিয়ান গেমসে এসে সেমিফাইনালেই উঠতে পারেনি। কোয়ার্টার ফাইনাল হতেই বিদায়। গত চার বছরে কী উন্নতি হয়েছে। বছরের পর বছর অলিম্পিকে স্বর্ণ জয়ের গল্প শুনেছেন সবাই। গো ফর গোল্ড। যারা গোল্ড জিতবেন কিংবা গোল্ড জয়ের ফাইনালে খেলবেন সেই উচ্চ আসনের ধারে কাছেও যেতে পারছেন না বাংলাদেশের আরচাররা।
দুনিয়ার নানা জায়গায় খেলতে যাচ্ছেন আরচাররা, কর্মকর্তা যাচ্ছেন। নামকাওয়াস্তে ফল পাচ্ছেন। তা নিয়ে দেশ জুড়ে হইচই হচ্ছে। অথচ এশিয়ান গেমস আর অলিম্পিক গেমসে গিয়ে পাত্তাই পাচ্ছেন না। কোথায় গলদ? বছর জুড়ে আরচারি নিয়েই স্বপ্ন দেখানো হয়। আরচারির কি কি সুবিধা লাগবে, কোথায় কি নিশ্চিত করতে হবে, ফেডারেশন বলার আগেই সরকারের ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের ভাবনা হয়ে দাঁড়ায়। আরচারির অগ্রাধিকার আগে। অথচ দিন শেষে আরচারি এশিয়ান গেমসে, অলিম্পিক গেমসে পদক জিততে পারে-কথাটা বার বার উঠে আসছে।
আরচারি ফেডারেশন বলে আসছে স্বর্ণপদকের কথা। ২০৩২ অলিম্পিকে স্বর্ণ জিতবে বাংলাদেশ। ফেডারেশন সভাপতি কাজী রাজীব উদ্দিন আহমেদ চপল বললেন, 'গোল্ড জিতবে এ কথা বলা যায় না। তোমরা (সাংবাদিক) এই একটা জিনিস বেশি বেশি বইলা ফালাও। এ তো সহজ না।' আপনারা গোল্ড লিখে রাখেন কেন, গোল্ড বলেন কেন? চপল বলেন, 'আমাদের টার্গেট গোল্ড। গোল্ড যে পাইতেই হইব এইটা কোনো ইয়ে না। আমরা পদকের সন্ধানে ২০৩২ টার্গেট করেছি।' পদক তো তিনটা নাকি চারটা? চপল বলেন, 'পদক এক জিনিস আর গোল্ড আরেক জিনিস।' তাহলে গো ফর গোল্ড বলা হচ্ছে কেন? চপল বলেন, 'টার্গেট না থাকলে পোলাপানে খেলব কি।'
তিনি বলেন, 'এখন যাদের বয়স ১৪ বছর বা ১৬-তে আছে, তাদেরকে নিয়ে আমরা ২০৩২ অলিম্পিক গেমসের টার্গেট করছি। এখন থেকেই যদি নতুন টার্গেট হয় তাহলে বছরের পর বছর বলা হচ্ছে টার্গেট অলিম্পিক গেমস। সেটি কোনটি। সিনিয়র আরচারদের নিয়ে চপলের কথা হচ্ছে পুরানদের চেয়ে নতুনদের পারফরম্যান্স ভালো। ফল যাই হোক নতুনরা যাবে। পুরোনোদের মধ্যে শিথিলতা চলে এসেছে। ইরাকে নতুন টিম যাবে অক্টোবরে, শারজায় ইয়ুথ এশিয়ান আরচারি হবে। সম্পূর্ণ নতুন দল যাবে।
সাত বছর ধরে জার্মানির কোচ ফ্রেডরিক বাংলাদেশে কোচ হয়ে কাজ করছেন। তাকে দিয়ে সাফ গেমস আরচারিতে পদক পাওয়া গেছে। তাকে দিয়ে আরচারি সব সময় আলোচনায় ছিল। কিন্তু বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের আরচাররা নিজেদের অবস্থান জানিয়েছেন তলানিতে। তারপরও ফ্রেডরিক আছেন চপলের আশীর্বাদে। আর কিছু কি পাওয়ার আশা আছে? চপলের মতে ফ্রেডরিক উঁচুমানের কোচ। 'শুনো একটা কথা বলি, ফ্রেডরিকে নিয়ে টানাটানি চলছে। ফ্রেডরিক হচ্ছেন ওয়ার্ল্ডের টপ টেন-এর মধ্যে একজন। আমি মনে যে কোনো কোচের চেয়ে অভিজ্ঞ। অনেক দেশই তাকে কোচ হিসাবে নিতে চায়।' যায় না কেন? চপলের উত্তর, এখানে রিসোর্স আছে।'
জাপানে এশিয়ান গেমসে অংশগ্রহণ করতে এসে ভোগান্তিতে পড়েছিলেন আরচাররা। জাপানে পৌঁছে বিমানবন্দরে ১০ ঘণ্টা ধরে অপেক্ষায়, হোটেল পাচ্ছিল না। এশিয়ান ওয়ার্ল্ড আরচারি এশিয়ার সভাপতি রাজীব উদ্দিন আহমেদ চপল। আপনি থাকতে কেন আরচাররা সমস্যা পড়েছিলেন। 'এটা এশিয়ার চাপটার না। আপনাকে বললাম আপনি ডাইনেও গেলেন না, বায়েও গেলেন না। অ্যাকোমোডেশন আমার দায়িত্বে না। আমাদের দায়িত্ব মাঠে খেলা পরিচালনা করা।' গেমসে একজন শেফ দ্য মিশন একজন থাকেন। 'এটা তাকে প্রশ্ন করেন। এটা আমার পার্ট না। আবাসন, পরিবহন এগুলো এনওসির দায়িত্ব হওয়া উচিত। আমরা খেলা পরিচালনা করি। আমি বিব্রতকর কোনো প্রশ্নের জবাব দিব না। যা বলার ঢাকায় গিয়ে বলব।'
একটা দেশে খেলতে এসে যদি খেলোয়াড়রা ১০ ঘণ্টা বিমানবন্দরে বসে থাকেন, তাহলে সেটা মাঠের পারফরম্যান্সে বিরূপ প্রভাব পড়ে। পদকই যদি চাও তাহলে সেভাবেই তো অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত ছিল। আমার খেলোয়াড়রা বিমানবন্দরে পড়ে আছে। আমার প্রেসার নেমে গিয়েছিল, অসুস্থ নিজে হয়ে গিয়েছিলাম। এই বিচার আমি কার কাছে দেব। আপনি কাউকে রাখবেন হোটেলে জামাই আদর করে...। পদকই যদি চাইবেন তাহলে তাকে গুরুত্ব দেবেন, আপনি দেননি। আমার রিটায়ারমেন্টের সময় এসে গেছে। নো মোর স্পোর্টস।'
