সিইসি জ্ঞানেশের বিরুদ্ধে আন্দোলন ঠেকাতে দিল্লিতে কঠোর নিরাপত্তা, বন্ধ ইন্টারনেটও

আপডেট : ০২ অক্টোবর ২০২৬, ১৫:৩৯

গত জুন মাসের ঘটনার পুনরাবৃত্তি এড়াতে এবার আগেভাগেই কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়েছে দিল্লি পুলিশ। শুক্রবার (২ অক্টোবর) সিইসি জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে প্রস্তাবিত আন্দোলনকে কেন্দ্র করে রাজধানীর যন্তর মন্তর এলাকায় নেওয়া হয়েছে নজিরবিহীন নিরাপত্তাব্যবস্থা।

বিক্ষোভকারীদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে সকাল থেকেই দিল্লি মেট্রোর ১১টি স্টেশন বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এসব স্টেশনের ওপর দিয়ে মেট্রো চলাচল করলেও যাত্রীদের ওঠানামা করতে দেওয়া হচ্ছে না। একইভাবে ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। স্থানীয় সময় রাত ৯টা পর্যন্ত বন্ধ থাকবে।

যন্তর মন্তরের দিকে যাওয়া বিভিন্ন সড়কের সংযোগস্থলে মোতায়েন করা হয়েছে কয়েক হাজার পুলিশ সদস্য। তাদের সঙ্গে রয়েছে র‍্যাপিড অ্যাকশন ফোর্স (আরএএফ) ও আধাসামরিক বাহিনীর সদস্যরাও।

গান্ধীজয়ন্তীর দিনে দিল্লির কেন্দ্রীয় এই এলাকাজুড়ে কড়া নিরাপত্তায় তৈরি হয়েছে কার্যত অবরুদ্ধ পরিস্থিতি। যন্তর মন্তরের প্রবেশপথগুলোতে রয়েছে পুলিশের কড়া নজরদারি ও ব্যাপক নিরাপত্তা প্রস্তুতি।

নির্বাচনী প্রক্রিয়া অগণতান্ত্রিকভাবে চালানো ও ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধনের (এসআইআর) নামে দেশের ১৩ কোটি মানুষের নাম খারিজ করে শাসক দল বিজেপির সুবিধা করে দেওয়ার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে ভারতের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে। সেই অভিযোগ মান্যতা পেয়ে যায় অন্য দুই নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু ও বিবেক যোশীর আপত্তির খবর সর্বভারতীয় ইংরেজি দৈনিক দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসে প্রকাশিত হওয়ায়।

সেই প্রতিবেদন বিরোধী আন্দোলনকে আরও জোরদার করেছে। বিরোধী জোট ‘ইন্ডিয়া’ আজ থেকে দেশজুড়ে লাগাতার আন্দোলনের কর্মসূচি নিয়েছে। অন্যান্য রাজনৈতিক-অরাজনৈতিক ও নাগরিক সংগঠনও একই রকম আন্দোলনে শরিক হয়েছে। গান্ধীজয়ন্তীর দিন যন্তর মন্তরে বিক্ষোভ সমাবেশের জন্য তারাও প্রস্তুতি নেয়।

তবে দিল্লি পুলিশ অনুমতি দিতে অস্বীকারই শুধু করেনি, কোনো বিক্ষোভকারী যাতে যন্তর মন্তর পর্যন্ত পৌঁছতে না পারেন, তা নিশ্চিত করেছে।

ভারতীয় দণ্ডবিধি অনুযায়ী আগে যা ছিল ১৪৪ ধারা, বর্তমানে ভারতীয় ন্যায় সংহিতায় যা ১৬৩ ধারা, যাতে পাঁচজনের বেশি মানুষের জমায়েত নিষিদ্ধ। যন্তর মন্তর ঘিরে গোটা তল্লাটে দিল্লি পুলিশ তা জারি করেছে।

আজ সকালে আম আদমি পার্টির (আপ) নেতা সৌরভ ভরদ্বাজসহ আরও কয়েকজন আইন অমান্য করে যন্তর মন্তরের দিকে এগোতে চাইলে পুলিশ তাদের গ্রেপ্তার করে। একইভাবে আটক করা হয় অন্যদেরও।

গণতান্ত্রিক আন্দোলনের প্রধান এলাকা হিসেবে যন্তর মন্তর স্বীকৃত ও পরিচিত। লুটেন্স দিল্লির অভ্যন্তরের এই জায়গাতেই আন্দোলনকারীদের জমায়েত করতে অনুমতি দেওয়া হয়।

গত জুনে ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) নেতাদেরও সেই অনুমতি দেওয়া হয়েছিল, যা সামলাতে পুলিশ পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে। দিল্লি পুলিশ এবার আর সেই ভুলের পুনরাবৃত্তি করতে নারাজ। নির্বাচন কমিশন বিরোধী আন্দোলনের অনুমতি তাই কাউকে দেওয়া হয়নি।

আজ সকাল সাড়ে ১০টা নাগাদ প্রথম বিক্ষোভ দেখাতে আসেন আপ নেতা সৌরভ ভরদ্বাজ, আরজেডি নেতা মনোঝ ঝাসহ দলীয় কর্মীরা। কিন্তু ব্যারিকেডের দরুন তারা যন্তর মন্তরের দিকে যেতে পারেননি। পুলিশের বাধা পেয়ে আপ নেতারা রাস্তাতেই শুয়ে পড়েন।

সৌরভের হাতে ছিল বাবাসাহেব আম্বেদকরের ছবি। পুলিশ তাদের আটক করে নিয়ে যায়। দুপুর সাড়ে ১২টায় সিপিএমের ছাত্রসংগঠন এসএফআই ও সিপিআই (এমএল) লিবারেশনের ছাত্রসংগঠন আইসার হাজারখানেক সমর্থক হাতে নানান স্লোগান লেখা প্ল্যাকার্ড নিয়ে যন্তর মন্তরের দিকে এগোতে গেলে পুলিশ বাধা দেয়।

বৃহস্পতিবারই এসএফআই সভাপতি আদর্শ সাজি ও আইসা নেত্রী নেহা বোরা গণমাধ্যমকে জানিয়েছিলেন, পুলিশ অনুমতি দিক না দিক, আন্দোলনে তারা নামবেনই। যন্তর মন্তরে বিক্ষোভের অনুমতি না দেওয়ায় তারা সবাই দিল্লি পুলিশ ও কেন্দ্রীয় সরকারের ‘স্বৈরাচারী’ চরিত্রের সমালোচনা করেন। বলেন, এভাবে শান্তিপূর্ণ গণতান্ত্রিক আন্দোলন দাবিয়ে রাখা যায় না।

বস্তুত ইন্ডিয়া জোটের নেতারা আজ থেকে সারা দেশেই জ্ঞানেশ হটাও, এসআইআর বাতিল ও ইভিএমের বদলে ব্যালট পেপারে ভোট গ্রহণের দাবিতে আন্দোলনের ডাক দেন। একই দিন থেকে একই দাবিতে পৃথকভাবে আন্দোলনে ডাক দিয়েছেন ককরোচ নেতারাও। তারা এই আন্দোলন শুরু করছেন মুম্বাইয়ের শিবাজি পার্ক থেকে।

আজ বিকেল চারটে থেকে শুরু হবে সেই বিক্ষোভ সমাবেশ। যদিও দিল্লির মতো মুম্বাই পুলিশও সিজেপি নেতাদের ওই বিক্ষোভ সমাবেশের অনুমতি দেয়নি।

অনুমতি না মেলায় সিজেপি নেতা অভিজিৎ দিপকে ‘জেল ভরো’ কর্মসূচির ডাক দিয়েছেন। সেই ডাকে সাড়া দিয়ে ইতিমধ্যেই কয়েক লাখ জেন-জি মহারাষ্ট্রের বিভিন্ন এলাকা থেকে মুম্বাই অভিমুখে রওনা হয়েছেন বলে সিজেপির দাবি।

দিপকে গণমাধ্যমকে বলেছেন, শিবাজি পার্কে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী বিজেপি নেতা দেবেন্দ্র ফাডনবিশ জনসভা করতে পারেন। পুলিশ সেই অনুমতি তাদের দেয় অথচ সিজেপিকে শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অনুমতি দেয় না। এটাও স্বৈরাচার। তিনি বলেছিলেন, মহরাষ্ট্রের কারাগারে কত জায়গা আছে, তারা দেখতে চান।

মুম্বাই থেকে জ্ঞানেশবিরোধী আন্দোলন শুরুর কারণ হিসেবে দিপকে বলেন, লোকসভা ভোটে বিপর্যয়ের পাঁচ মাস পর এই মহারাষ্ট্রের ভোটার তালিকায় কারপচুপি করেই বিজেপিকে জেতাতে ষড়যন্ত্র করেছিলেন জ্ঞানেশ কুমার। তারপর সেই কারচুপি করা হয় হরিয়ানা, দিল্লি, বিহার ও পশ্চিমবঙ্গে। তাই মুম্বাই থেকে শুরু করা আন্দোলন ছড়িয়ে দেওয়া হবে সারা দেশে। শেষ হবে অবশ্যই দিল্লিতে।

ইন্ডিয়া জোটের সিদ্ধান্ত, ২ থেকে ৮ অক্টোবর সারা দেশের গণতন্ত্র বাঁচাও আন্দোলন চলবে। ৬ অক্টোবর সব বিরোধী সংসদ সদস্য নির্বাচন কমিশন ঘেরাও অভিযানে শামিল হবেন। সারা দেশের অন্তত ৫টি বড় শহরে ইন্ডিয়া জোট জনসভা করবে। দিল্লির জনসভা হবে ১ নভেম্বর।

ইত্তেফাক/এমএস