নিরাপত্তাব্যবস্থাই যেথায় নিরাপত্তাহীন!

আপডেট : ০৩ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:৩০

কিছু বিষয় সত্যিই ব্যথিত করে, মর্মে আঘাত করে। বিশেষত, রাষ্ট্রের বিপুল অর্থ ব্যয়ে নির্মিত কোনো গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো যখন অবহেলা ও লুটপাটের শিকার হয়, তখন ক্ষতিটা কেবল অর্থের অঙ্কে মাপা যায় না; বরং ইহার সঙ্গে জড়াইয়া থাকে জননিরাপত্তা, রাষ্ট্রীয় সম্পদের প্রতি আমাদের দায়িত্ববোধ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অধিকার। পদ্মা সেতু রেল-সংযোগ প্রকল্পে সাম্প্রতিক চুরির ঘটনাগুলি যেন সেই উদ্বেগই গভীর করিয়া তুলিয়াছে। ২৩৬ কিলোমিটার দীর্ঘ এই রেলপথ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সঙ্গে রাজধানীর যোগাযোগে নূতন সম্ভাবনার দ্বার খুলিয়া দিয়াছে। অথচ চালুর অল্প সময়ের মধ্যেই ইহার বিভিন্ন স্থাপনা ও যন্ত্রপাতি চোরচক্রের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হওয়া নিঃসন্দেহে অত্যন্ত উদ্বেগজনক।

রেলওয়ে সূত্রের বরাতে প্রকাশিত তথ্যে বলিতেছে, রেললাইন, সেতু-কালভার্ট, স্টেশন, বৈদ্যুতিক এবং সিগন্যাল-টেলিযোগাযোগ-ব্যবস্থাসহ অন্তত ৯৩ ধরনের সরঞ্জাম চুরির তথ্য পাওয়া গিয়াছে। চুরি যাওয়া সামগ্রীর মধ্যে রহিয়াছে ফিশ বোল্ট, ইলাস্টিক রেল ক্লিপ, ফিশ প্লেট, গেজ প্লেট, টার্ন-আউট বোল্ট, পয়েন্ট মেশিন, অ্যাক্সেল কাউন্টার, ট্র্যাক ট্রান্সফরমারসহ গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ। প্রকল্পের বিভিন্ন স্থানে স্থাপিত প্রায় ৫০টি ট্রান্সফরমারও চুরি হওয়ার তথ্য আসিয়াছে। আরো ভয়াবহ বিষয়, নজরদারির জন্য স্থাপিত সিসি ক্যামেরাও চোরের হাত হইতে রেহাই পায় নাই! অর্থাৎ, যেই ব্যবস্থার মাধ্যমে অবকাঠামোকে নিরাপদ রাখিবার কথা, খোদ সেই নিরাপত্তাব্যবস্থাই চুরি হইয়া যাইতেছে। সুতরাং প্রশ্ন উঠা স্বাভাবিক-নজরদারি আসলে কোথায়?

বিষয়টি কেবল রাষ্ট্রীয় সম্পদ চুরির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখিলে ভুল হইবে। কারণ, সিগন্যালিং ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ চুরি হওয়ায় কোথাও কোথাও আধুনিক স্বয়ংক্রিয় সিগন্যাল-ব্যবস্থা অকার্যকর হইয়া পড়িয়াছে এবং ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে ট্রেন পরিচালনা করিতে বেগ পোহাইতে হইতেছে। রেলপথে নিরাপত্তাব্যবস্থার প্রতিটি স্তরই একটি আরেকটির সহিত সম্পর্কিত। ফলে ছোট একটি যন্ত্রাংশের অনুপস্থিতিও কখনো কখনো বড় দুর্ঘটনার ঝুঁকি সৃষ্টি করিতে পারে। উন্নত দেশগুলিতে রেল-অবকাঠামোর নিরাপত্তা কেবল প্রহরী নিয়োগের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। নিয়মিত পরিদর্শন, রিমোট মনিটরিং, অ্যালার্ম-ব্যবস্থা, ক্যামেরা ও সেন্সরভিত্তিক নজরদারি, প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রণ এবং যন্ত্রাংশের ডিজিটাল তালিকাভুক্তির মাধ্যমে সম্পদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয় সেই সকল দেশে। গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় কোনো ত্রুটি বা অস্বাভাবিকতা দেখা দিলে দ্রুত কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণকক্ষে সংকেত পৌঁছানোর ব্যবস্থাও থাকে। আমাদেরও কি প্রযুক্তিনির্ভর এমন সমন্বিত নিরাপত্তাব্যবস্থার দিকে দ্রুত অগ্রসর হওয়া প্রয়োজন নহে?

সব চাইতে বড় প্রশ্ন হইল, কোনো প্রকল্প নির্মাণ করিয়াই কি রাষ্ট্রের দায়িত্ব শেষ হইয়া যায়? নিশ্চয়ই নহে। বরং প্রকল্প নির্মাণের পর তাহার রক্ষণাবেক্ষণ, নিরাপত্তা ও কার্যকারিতা নিশ্চিত করাই দীর্ঘমেয়াদি সাফল্যের প্রধান শর্ত। হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে অবকাঠামো নির্মাণ করিয়া পরে রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে তাহা ক্ষতিগ্রস্ত হইতে দেওয়া অর্থের অপচয়কে আরো বাড়াইয়া দেয়। অর্থাৎ, পদ্মা রেল-সংযোগ প্রকল্পে জনবলসংকট কিংবা সীমিত ট্রেন চলাচল চোরচক্রের সুযোগ সৃষ্টি করিয়া থাকে-ইহা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য অজুহাত হইতে পারে না। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবিলম্বে চুরির পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করিয়া দায়ীদের শনাক্ত ও আইনের আওতায় আনিতে হইবে। একই সঙ্গে চুরি হওয়া প্রতিটি যন্ত্রাংশের তালিকা, ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এবং নিরাপত্তাব্যবস্থার দুর্বলতা প্রকাশ করা প্রয়োজন।

অনিয়ম-দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার মাধ্যমে আমরা রাষ্ট্রীয় সম্পদের যে ক্ষয় সাধন করিয়াছি, তাহার পুনরাবৃত্তি আর কাম্য নহে। পদ্মা সেতু রেল-সংযোগ শুধু একটি রেলপথ নহে, ইহা জনগণের অর্থে নির্মিত জাতীয় সম্পদ। ইহার একটি নাট-বোল্ট হারানোও তাই নিছক চুরির ঘটনা নহে। ইহা রাষ্ট্রের নিরাপত্তাবোধ ও দায়িত্বশীলতার পরীক্ষাও বটে। আজ যদি চোরের হাত হইতে রেললাইনের একটি যন্ত্রাংশও নিরাপদ না থাকে, কাল বড় কোনো দুর্ঘটনার দায় কে লইবে? অতএব, এখনই প্রশ্ন তুলিতে হইবে, রেললাইন রক্ষার দায়িত্বে রহিয়াছেন যাহারা, তাহারা কি যথেষ্ট নজর রাখিতেছেন?

ইত্তেফাক/এএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন