রং মাখানো ইয়াবা ও সর্বগ্রাসী ভেজালের ছোবল

ভেজাল শুধু পণ্যে নয়, পণ্যের বেড়াজাল ডিঙিয়ে ভেজাল এখন ঢুকে গেছে আমাদের মননে, আমাদের চিন্তায় । এমনকি ইতিহাস চর্চাতেও। আমরা এই বৃত্ত থেকে বেরোতে পারছি না।

আপডেট : ০৩ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:৪০

খাবারে ভেজাল, ওষুধে ভেজাল, এমনকি বিষেও ভেজাল- এসবই বহু পুরোনো খবর।  কিন্তু মাদকেও ভেজাল? এ যেন কল্পনারও অতীত। অথচ ঠিক এমনটিই খবর দিয়েছে একটি অনলাইন সংবাদ পোর্টাল। ২৯ সেপ্টেম্বর তারিখের খবরমতে, রাজশাহীর বাগানপাড়া রেললাইন এলাকায় দীর্ঘদিন ধরেই মাদকের কেনাবেচা চলছে। সম্প্রতি সেখানে জন্মনিয়ন্ত্রণের মায়া বড়ি আর ডুরালাক্স ট্যাবলেটের গায়ে লাল বা গোলাপি মার্কার কিংবা সাইনপেনের কালি মেখে এগুলোকে ইয়াবার রূপ দেওয়া হচ্ছে। তারপর আসল ইয়াবা বলে জন্মনিয়ন্ত্রণ ও কোষ্ঠকাঠিন্যের এই ওষুধগুলো গছিয়ে দেওয়া হচ্ছে মাদকসেবীদের হাতে। কম দামে নেশার বস্তু মেলার আশায় অনেকে ছুটে যাচ্ছেন সেখানে। শোনা যায়, এই ভেজাল ইয়াবা সেবন করে অনেকে অসুস্থও হয়ে পড়ছেন।

নকল ইয়াবার কথা আগেও শুনেছি, কিন্তু গর্ভনিরোধক বড়ি দিয়ে ইয়াবা বানানোর এমন উদ্ভাবনী প্রতিভার কথা আগে কখনো শুনিনি। স্বীকার করতেই হবে, আমাদের দেশের কারবারিরা সাংঘাতিক রকমের উদ্ভাবক বা ইনোভেটিভ—যদিও সদ্য প্রকাশিত বৈশ্বিক উদ্ভাবনী সূচকে দক্ষিণ এশিয়ার ছয়টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান একেবারে তলানিতে। উল্লেখ্য, জাতিসংঘের বিশেষায়িত সংস্থা ওয়ার্ল্ড ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি অর্গানাইজেশন গত ২৯ সেপ্টেম্বর ‘পাওয়ারিং এন্টারপ্রেনারস অ্যাট দ্য ফ্রন্টিয়ার অব সায়েন্স' শিরোনামে গ্লোবাল ইনোভেশন ইনডেক্সে ১৯তম সংস্করণ প্রকাশ করেছে। আসলে বাংলাদেশ এখন ভেজালের ভেলায় ভাসছে। বেঁচে থাকার জন্য যা কিছু প্রয়োজন, তার একটিও যেন ভেজালমুক্ত নেই। চাল থেকে আটা-ময়দা, মসলা থেকে মাছ- মাংস—সবকিছুতেই ভেজালের ছায়া। প্রায় সব ফলই পাকানো হচ্ছে বিষাক্ত রাসায়নিকে।

মাছ-মাংস অনেকক্ষণ তরতাজা দেখাতে মেশানো হচ্ছে ফরমালিনের বিষ। কোনো কোনো খাবারকে চোখধাঁধানো করে তুলতে খাদ্যমানের রঙের বদলে ব্যবহার করা হচ্ছে কাপড়ের রং। এসব এখন সাধারণ মানুষের গা-সওয়া হয়ে গেছে। আরো ভয়ংকর খবর হলো—শিশুখাদ্য আর জীবনরক্ষাকারী ওষুধেও মেশানো হচ্ছে ভেজাল উপাদান। মাঠের ফসলে ছিটানো কীটনাশক খাবারের পাত বেয়ে সরাসরি ঢুকে পড়ছে মানুষের পেটে। এর ফল বিপন্ন জনজীবন; বাড়ছে ক্যানসার, কিডনি ও লিভারের জটিল রোগ। পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের (পবা) সাম্প্রতিক এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে— শুধু ভেজাল খাদ্য গ্রহণের কারণেই দেশে প্রতি বছর ৩ লাখ মানুষ ক্যানসারে, ২ লাখ কিডনি রোগে এবং দেড় লাখ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হচ্ছেন (দৈনিক যুগান্তর, ৪ মার্চ ২০২৬)।

ভেজাল ঠেকাতে সরকার অবশ্য আইনের কমতি রাখেনি— ফরমালিন নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৫; নিরাপদ খাদ্য আইন, ২০১৩ ও ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯ প্রণীত হয়েছে। এমনকি ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনে খাদ্যে ভেজাল দেওয়া ও বিক্রির সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। কিন্তু বাস্তবতা হলো—এসব আইন কাগজে যতটা শক্তিশালী, প্রয়োগে ততটাই অকার্যকর। মাঝেমধ্যে খবরের কাগজে ভেজালবিরোধী অভিযানের খবর আসে, কিছু বিক্রেতার জরিমানাও হয়। কিন্তু অবস্থার কোনো উন্নতি নেই; ভেজাল বন্ধের কোনো লক্ষণও চোখে পড়ে না। বরং পরিস্থিতি দিনের পর দিন আরো খারাপের দিকেই গড়াচ্ছে। মায়াবড়িকে ইয়াবা বলে বিক্রির ঘটনা তারই প্রকৃষ্ট উদাহরণ।

ভেজাল শুধু পণ্যে নয়, পণ্যের বেড়াজাল ডিঙিয়ে ভেজাল এখন ঢুকে গেছে আমাদের মননে, আমাদের চিন্তায়। এমনকি ইতিহাস চর্চাতেও। আমরা এই বৃত্ত থেকে বেরোতে পারছি না। ছোটবেলায় দেখা সার্কাসের মোটরসাইকেলের মতো একই বৃত্তের মাঝে অবিরাম ঘুরপাক খাচ্ছি। দেশে যখন ক্ষমতার হাতবদল হয়, সেই ভেজালের হাঁড়িতে পড়ে নতুন ফোড়ন; তাকে পরিবেশন করা হয় আরো সুস্বাদু আর মুখরোচক করে। এই তো কয়দিন আগে পাকিস্তানের জাতির পিতা মোহাম্মদ আলি জিন্নাহকে নিয়ে ঢাকায় খুব তোলপাড় হয়ে গেল। কয়দিন ধরে ফেসবুকসহ নানা সামাজিক মাধ্যমে লেখার বান বইতে শুরু করল এ দেশের জন্মের ইতিহাস নিয়ে। এ সবই হলো চিন্তার ভেজাল। জিন্নাহ একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। তাকে তার জায়গাতেই থাকতে দিতে হবে। শুধু জিন্নাহকেই-বা কেন গান্ধী, নেতাজি সুভাষ, ফজলুল হক, প্যাটেলসহ সবাইকেই। এদেরকে এদের নিজের জায়গা থেকে টেনে জোর করে অন্যত্র নিয়ে গেলে ভেজাল ইতিহাসের জন্ম হবে। অবশ্য একটা কথা আছে—ভেজাল খাদ্যে নাকি স্বাদ বেশি। বলা হয়—ম্যালেরিয়ার রোগীর পান্তা ভাত আর কাঁচা লংকাতেই রুচি বেশি। আমরা এখন সবাই চিন্তা আর মননের ম্যালেরিয়ায় ভুগছি। আর এখানেই ভেজালের মাহাত্ম্য।

ভেজাল তো অর্থনীতিতেও। আমি অর্থনীতির ছাত্র নই। তবে দেশ-বিদেশে চাকরির সুবাদে অর্থনীতির দুই একটি পরিভাষার সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ হয়েছিল। তার একটি ড্রাগ ইকোনমি, আরেকটি ওয়ার ইকোনমি। বাংলাদেশের সার্বিক অবস্থা বিবেচনায় আমার মনে হয়, ‘ভেজালের অর্থনীতি' বলেও কিছু একটা আছে, আর বাংলাদেশ এখন সেই অর্থনীতির ওপর ভর করেই চলছে। এই যে খাবার বা খাদ্য পণ্যে ভেজাল, ওষুধে ভেজাল, এমনকি বিষেও ভেজাল—এসবের সঙ্গে রয়েছে সেই অর্থনীতিরই যোগসূত্র; আর এই যোগসূত্রটি কার্যকর আছে অনেক বছর ধরেই। ভেজালের এই অর্থনীতির কল্যাণেই সমাজের একটা শ্রেণি দিনের পর দিন প্রথমে আঙুল ফুলে কলাগাছ, তারপর ধীরে ধীরে কলাগাছ থেকে বটগাছে রূপান্তরিত হচ্ছে। যারা এর সাথে তাল মেলাতে পারছে না তারা ক্রমেই তলিয়ে যাচ্ছে দুঃখ যন্ত্রণার গভীর থেকে গভীরে।

রাজনীতিতেও ভেজাল। দেশটা স্বাধীন হয়েছে ৫৫ বছর হয়ে গেছে। সেই স্বাধীনতাও আবার কোনো শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে বসে কোমল কিংবা কঠিন পানীয়ের গ্লাসে চুমুক দিতে দিতে পাওয়া স্বাধীনতা নয়—রীতিমতো যুদ্ধ করে অর্জিত স্বাধীনতা। এর জন্য ৩০ লাখ মানুষকে শহিদ হতে হয়েছে। ধারণা করা হয়েছিল, স্বাধীনতার পর ঔপনিবেশিক ধারার রাজনীতির অবসান ঘটবে। কিন্তু হতে হতেও তা হলো না; ভেজালের নানা উপসর্গ এসে আমাদের রাজনীতিকে কলুষিত করে রাখল। আমরা আর তা থেকে বেরোতে পারলাম না। এই ৫৫ বছরে অনেক বারই সরকারের পরিবর্তন হয়েছে। সবশেষ ২০২৪-এর আগস্টে। তখন অনেক কথাই শোনা যাচ্ছিল। বলা হচ্ছিল—দেশে চলমান রাজনীতির সংস্কার করা হবে। কিন্তু গত দুই বছরে পূর্বের কয়েক দশক ধরে চলা অসুস্থ ধারার রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসার কোনো লক্ষণই দেখা যাচ্ছে না। বরং কোনো কোনো ক্ষেত্রে ভেজাল আরো ঘনীভূত হয়েছে। আদর্শিক রাজনীতি তো এখন সব জায়গা থেকেই তিরোহিত প্রায়। তার জায়গা নিয়েছে স্লোগান আর দখলের রাজনীতি—চলছে রং বদলানোর খেলা। অনেকেই মনে করেন, এসবের মাধ্যমে
সুপরিকল্পিতভাবে দেশকে ক্রমেই বিরাজনীতিকরণের দিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে—যা ভেজাল রাজনীতিরই নামান্তর মাত্র।

সেই যে ৮০-এর দশক থেকে দেশের অর্থনীতিতে মুনাফাকেন্দ্রিক লুটপাটের পুঁজিবাদী ধারা চালু হয়েছিল, তার সঙ্গে অসুস্থ ধারার এই রাজনীতি মিশে জন্ম দিয়েছে এক সর্বগ্রাসী ভেজাল সংস্কৃতি। সবাই এখন রাতারাতি ধনশালী হতে চায়। অল্প বিনিয়োগে কীভাবে সর্বোচ্চ মুনাফা করা যায়—সেদিকেই সবার নজর। কে কাকে ঠকিয়ে উপরে উঠবে, চলছে তারই প্রতিযোগিতা। সামষ্টিক চিন্তাকে ছাপিয়ে বড় হয়ে উঠেছে ব্যক্তি চিন্তা। সে কারণেই ভেজাল খেয়ে কে মরল আর কে বাঁচল, এ নিয়ে কারো মাথাব্যথা নেই। মুনাফা-চিন্তা এমনই এক জিনিস, যা নিজের সন্তানকেও ভুলিয়ে দেয়। ফলে, যারা বিভিন্ন পণ্যে ভেজাল করে বা ভেজাল মেশায়, তাদের মধ্যে কোনো মানবিকতা কাজ করে না। তাদের একটাই চিন্তা-মুনাফা, মুনাফা এবং মুনাফা। যতদিন অসুস্থ রাজনীতি আর ভেজাল অর্থনীতির এই দুষ্টচক্র থেকে বের হওয়া না যাবে, ততদিন পণ্যের ভেজাল দূর করা সম্ভব নয়। সে কারণেই জন্মনিরোধক মায়া বড়িতে রং মাখিয়ে যে ইয়াবা হিসেবে বিক্রি করা হচ্ছে, এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। রাজনীতিতেই যেখানে চলছে রং মাখানোর খেলা—মাদকই বা তাতে বাদ যাবে কেন?

লেখক : সাবেক জাতিসংঘ কর্মকর্তা

ইত্তেফাক/এনএন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন