ময়মনসিংহে বাসচাপায় নিহত ৭ জনের দাফন সম্পন্ন, স্বজনদের আহাজারি

আপডেট : ০৩ অক্টোবর ২০২৬, ১৩:৩৩

চারটি খাটিয়া, সারি সারি নতুন কবর আর স্বজনদের বুকফাটা বিলাপে এক ভারী ও বেদনাবিধুর পরিবেশ তৈরি হয়েছে জামালপুরের কয়েকটি গ্রামে। ময়মনসিংহে রাজীব পরিবহনের বাসচাপায় নিহত সিএনজিচালিত অটোরিকশার চালকসহ সাতজনেরই দাফন সম্পন্ন হয়েছে তাদের নিজ নিজ গ্রামের পারিবারিক কবরস্থানে। একসঙ্গে একই পরিবারের চার সদস্যসহ সাতটি তাজা প্রাণের মর্মান্তিক বিদায়ে পুরো জেলায় নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া।

এর আগে শুক্রবার (২ অক্টোবর) দুপুরে ময়মনসিংহ নগরীর আকুয়া বাইপাস এলাকায় রাজীব পরিবহনের একটি দ্রুতগতির যাত্রীবাহী বাস যাত্রীবাহী অটোরিকশাটিকে চাপা দিলে ঘটনাস্থলেই চালকসহ সাতজন প্রাণ হারান। নিহতদের মধ্যে ছয়জনেরই বাড়ি জামালপুর সদর উপজেলার রানাগাছা ইউনিয়নে; যার মধ্যে চারজন একই পরিবারের সদস্য। এ ছাড়া অপর দুজন দম্পতি এবং একজন অটোরিকশাচালক।

শুক্রবার রাতেই সদর উপজেলার রানাগাছা ইউনিয়নের বীর গোবিন্দী গ্রামে অটোরিকশাচালক সুজন মিয়ার প্রথম জানাজা শেষে দাফন কাজ সম্পন্ন হয়। এরপর শনিবার (৩ অক্টোবর) সকাল ৯টায় একই ইউনিয়নের ঘোড়াকান্দা গ্রামে নিহত অন্তঃসত্ত্বা গৃহবধূ মর্জিনা বেগম (২৫) ও তার পাঁচ বছর বয়সী ছেলে মিনালের জানাজা অনুষ্ঠিত হয় এবং স্থানীয় কবরস্থানে তাদের শায়িত করা হয়। সকাল ১০টায় দড়িহামিদপুর ভাটিপাড়া গ্রামে মর্জিনার বাবা মোফাজ্জল হোসেন লেবু (৫৫) ও তার ৮৫ বছর বয়সী দাদি রাশিদা বেগমের জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়। পরবর্তীতে শরিফপুর ইউনিয়নের বাদেচান্দি গ্রামে নিহত দম্পতি আকরাম আলী ও তার স্ত্রী মমতা বেগমের জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তাদের দাফন সম্পন্ন হয়।

নিহতদের স্বজনেরা জানান, পেশায় রাজমিস্ত্রি মোফাজ্জল হোসেন লেবু স্ত্রী ও এক সন্তানকে নিয়ে গাজীপুরের হুতাপাড়া এলাকায় বসবাস করতেন। মা, অন্তঃসত্ত্বা মেয়ে ও নাতিকে নিজের কাছে নিয়ে যাওয়ার উদ্দেশ্যেই বৃহস্পতিবার তিনি গ্রামের বাড়িতে এসেছিলেন। শুক্রবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে নান্দিনা থেকে অটোরিকশায় চড়ে ময়মনসিংহের উদ্দেশে রওনা হন তারা, সেখান থেকে বাসে করে গাজীপুর যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু আকুয়া বাইপাসে পৌঁছাতেই ঘাতক বাসের চাকায় পিষ্ট হয়ে নিভে যায় তাদের সব স্বপ্ন।

একসঙ্গে পরিবারের চারজনকে হারিয়ে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন স্বজনেরা। মোফাজ্জলের স্বজন ইসমতারা কান্নাজড়িত কণ্ঠে জানান, সবাইকে নিয়ে যাওয়ার জন্য লেবু বাড়িতে এসেছিলেন, কিন্তু এক নিমেষেই তাদের পুরো পরিবারটি নিঃস্ব হয়ে গেল। স্থানীয় বাসিন্দা আজাদ ফারাজি স্তব্ধ হয়ে বলেন, টেলিভিশনে বহুবার এমন মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনার খবর দেখলেও এবার নিজের গ্রামের চারজনসহ এতগুলো মানুষের অকালমৃত্যু পুরো এলাকাকে শোকে অসাড় করে দিয়েছে।

জানাজায় অংশ নিয়ে গভীর শোক ও সমবেদনা প্রকাশ করেছেন জামালপুর-৫ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট শাহ মোহাম্মদ ওয়ারেছ আলী মামুন। তিনি বলেন, শোকার্ত পরিবারগুলোর পাশে সব ধরনের সহায়তা নিয়ে দাঁড়ানো হবে এবং ভবিষ্যতে সড়কে এমন মর্মান্তিক দুর্ঘটনা রোধে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সঙ্গে বসে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

এদিকে স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, গত ২০ মাসে রাজীব পরিবহনের বেপরোয়া বাসের কারণে অন্তত ৯টি পৃথক দুর্ঘটনায় ১৮ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। দুর্ঘটনার কারণ নিরপেক্ষ তদন্ত করে দায়ী বাসচালক ও পরিবহন কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে দ্রুত কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি নিরাপদ সড়কের দাবিতে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন এলাকাবাসী ও নিহতের স্বজনেরা।

ইত্তেফাক/এনএন