ইসরায়েল থেকে গাজায় জীবনরক্ষাকারী ওষুধ, কৃত্রিম অঙ্গসহ প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসামগ্রী প্রবেশে বারবার বিলম্ব হওয়ায় জরুরি চিকিৎসা প্রয়োজনীয় ফিলিস্তিনিদের জন্য ভয়াবহ পরিণতি হতে পারে বলে সতর্ক করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)।
শুক্রবার (২ অক্টোবর) ডব্লিউএইচও জানায়, বর্তমানে অনুমোদিত ত্রাণ শুধু গাজার দক্ষিণ প্রান্তের কেরেম শালোম দিয়েই প্রবেশ করতে পারছে। দক্ষিণের রাফাহ ক্রসিং দিয়ে সীমিতসংখ্যক মানুষের চলাচলের সুযোগ রয়েছে। এর মধ্যে বিদেশে চিকিৎসার জন্য যেতে প্রয়োজন এমন রোগীরাও আছেন।
ফিলিস্তিনে ডব্লিউএইচওর প্রতিনিধি রেইনহিল্ডে ভ্যান দে ভিয়ার্ডট বলেন, অপ্রয়োজনীয় সামগ্রী বোঝাই একটি ট্রাক বা প্রয়োজনীয় সামগ্রী অনেক দেরিতে পৌঁছালে তা জীবন বাঁচাতে পারে না। এটাই মূল বিষয়। তিনি ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের প্রতি চিকিৎসাসামগ্রী প্রবেশের ওপর চাপ কমানোর আহ্বান জানান। তার মতে, প্রয়োজনীয় ওষুধকে দ্বৈত ব্যবহারযোগ্য সামগ্রী হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়। কারণ হাসপাতাল বা ক্লিনিক পরিচালনার জন্য এসব চিকিৎসাসামগ্রী বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত ও অপরিহার্য।
ভ্যান দে ভিয়ার্ডট জানান, কৃত্রিম অঙ্গ ও সহায়ক সরঞ্জামের একটি চালান গত ছয় মাসে চারবার প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। তিনি বলেন, প্রতিবার প্রত্যাখ্যানের অর্থ হলো এমন একজন মানুষের জন্য আরও দেরি, যিনি ইতোমধ্যে একটি অঙ্গ হারিয়েছেন এবং আবার হাঁটার সুযোগের অপেক্ষায় আছেন। তবে ওষুধের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি তুলনামূলক ভালো। প্রায় ৮৭ শতাংশ ওষুধের চালান অনুমোদন পেয়েছে এবং মাত্র এক শতাংশের কিছু বেশি প্রত্যাখ্যাত হয়েছে।
গাজায় মানবিক ও স্বাস্থ্যসামগ্রী বড় পরিসরে নির্বিঘ্ন ও পূর্বানুমানযোগ্যভাবে প্রবেশের সুযোগ দেওয়ার দাবি জানিয়েছে ডব্লিউএইচও। পাশাপাশি ত্রাণ সরবরাহের জন্য একাধিক সীমান্তপথ চালু রাখার আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি, যাতে সীমিতসংখ্যক ক্রসিংয়ের ওপর নির্ভর করে ধীরগতিতে ত্রাণ পৌঁছাতে না হয়।
গাজার আরও চারটি প্রধান প্রবেশপথ কিসুফিম, গেট ৯৬, এরেজ ও এরেজ ওয়েস্ট এখনও বন্ধ এবং পুরোপুরি ইসরায়েলি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। গাজায় এখনও ঝুঁকি নিয়ে কাজ করে যাওয়া স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশংসা করেন ভ্যান দে ভিয়ার্ডট। তবে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দিতে তাদের কাছে পর্যাপ্ত সরঞ্জাম নেই বলেও জানান তিনি।
শীত শুরু হওয়ায় গাজায় ত্রাণ ও চিকিৎসাসামগ্রী পৌঁছানোর প্রয়োজন আরও বেড়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি। তার হিসাবে, ঠান্ডা ও বন্যার ঝুঁকি থেকে সুরক্ষার জন্য প্রায় ২০ লাখ মানুষের আশ্রয় প্রয়োজন। এতে তাদের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার পাশাপাশি মর্যাদাও ঝুঁকিতে পড়েছে।
নিরাপদ আশ্রয় ও বিশুদ্ধ পানির অভাবে প্রতিরোধযোগ্য রোগের প্রাদুর্ভাবের ঝুঁকিও বেড়েছে। এছাড়া গাজায় ইঁদুরের সংখ্যা বেশি হওয়ায় তাদের কামড়ের মাধ্যমে সংক্রমণ ছড়ানোর আশঙ্কা রয়েছে। জনস্বাস্থ্য পরীক্ষাগারগুলো ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় এই পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।
জাতিসংঘের মানবিকবিষয়ক সমন্বয় কার্যালয় (ওসিএইচএ) বৃহস্পতিবার সতর্ক করে বলেছে, গাজা সিটিতে কঠিন বর্জ্য জমে থাকায় জনস্বাস্থ্যের জন্য গুরুতর ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। ভারী যন্ত্রপাতি, ইঞ্জিন তেল, খুচরা যন্ত্রাংশ ও জ্বালানির অর্থায়নের নির্ভরযোগ্য ব্যবস্থা না থাকায় স্যানিটেশন পরিস্থিতির উন্নতিও ভঙ্গুর হয়ে রয়েছে।
গাজায় ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতির প্রায় এক বছর পার হলেও মানবিক পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হয়নি; বিষয়টিকে এখনও ‘অত্যন্ত সংকটপূর্ণ’ বলে সতর্ক করেছে জাতিসংঘ মানবিক সহায়তা বিষয়ক সংস্থা (ওসিএইচএ)। যুদ্ধবিরতির মধ্যেও এ সময়ে অঞ্চলটিতে ইসরায়েলি বিমান হামলা ও অন্যান্য সামরিক তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে।
সূত্র: আল জাজিরা
