বেসরকারি এমপিওভুক্ত ৪ হাজারের বেশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নানা অনিয়মের তদন্ত করেছেন শিক্ষা পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের (ডিআইএ) কর্মকর্তারা। বিগত ৫ থেকে ১০ বছর আগে এসব তদন্ত করা হলেও এখনো জমা দেওয়া হয়নি প্রতিবেদন। অভিযোগ রয়েছে, একশ্রেণির কর্মকর্তার ‘ঘুষ-বাণিজ্যের’ কারণে আলোর মুখ দেখেনি এসব তদন্ত প্রতিবেদন।
ডিআইএ সূত্রে জানা গেছে, প্রতিবেদন জমা না দেওয়ার ঘটনায় বিভিন্ন সময়ে ৪০ কর্মকর্তাকে শোকজ করা হয়েছে। তবে শোকজের জবাব সন্তোষজনক না হওয়ার পরেও কারোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। জড়িতদের কঠোর শাস্তির আওতায় আনার পরামর্শ দিয়েছেন শিক্ষাবিদরা।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের মূল কাজ স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসার আর্থিক বিষয় নিরীক্ষা করা এবং বিভিন্ন অনিয়মের তদন্ত করা। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তারা ৪ হাজারের বেশি নিরীক্ষা ও তদন্ত করেন। এর মধ্যে ৩ হাজার অনলাইনে এবং বাকি তদন্ত সরেজমিনে করা হয়েছে। পাঁচ থেকে ১০ বছর আগে এসব তদন্ত করা হলেও প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়নি। অনুসন্ধানে জানা গেছে, ডিআইএর একশ্রেণির কর্মকর্তা বছরের পর বছর কিস্তিতে ঘুষ নিয়েছিলেন অনিয়মে জড়িত শিক্ষক-কর্মচারীদের কাছ থেকে।
পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের (ডিআইএ) পরিচালক অধ্যাপক মো. আফলাতুন বলেন, ডিআইএর কিছু পরিদর্শক এখানে ছিলেন, যারা তদন্ত প্রতিবেদন জমা না দিয়ে বদলি হয়ে চলে গেছেন। তাদের চিঠি দেওয়া হয়েছে। চিঠি দেওয়ার পর কিছু প্রতিবেদন হালনাগাদ করে জমা দেওয়া হয়েছে। সবকিছু খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্ত করে অনিয়মে জড়িতদের ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে তদন্ত কর্মকর্তার অনেকেই এখন ডিআইএ দপ্তরে নেই। বদলি হয়ে অন্য প্রতিষ্ঠানে চলে গেছেন। তবে ডিআইএ কর্তৃপক্ষ বলছে, তাদের চিঠি দেওয়া হচ্ছে। অধ্যাপক মো. আফলাতুন আরও বলেন, ২০১৬, ২০১৭ ও ২০১৮ সালের অনেক প্রতিবেদন তিনি দায়িত্ব নেওয়ার পর পেয়েছেন, যেগুলো জমা দেওয়া হয়নি। এসব প্রতিবেদন নিষ্পত্তির চেষ্টা চলছে। ফাইনাল রিপোর্ট দেওয়ারও চেষ্টা করা হচ্ছে। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে ফোন করে জানানো হচ্ছে, একটার পর একটা অডিট হয়েছে, কিন্তু রিপোর্ট লেখার সময় পাননি অডিটররা। বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে অডিট করলেও তারা প্রতিবেদন জমা দেননি।
অভিযোগ রয়েছে, কর্মকর্তারা অনৈতিক সুবিধার বিনিময়ে এসব তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেননি। এ ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন শিক্ষাবিদরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের একজন অধ্যাপক ইত্তেফাককে বলেন, এখানে অবশ্যই লেনদেন হয়েছে এবং সেটা বড় অঙ্কের। যদি তা না হতো, তাহলে তদন্ত প্রতিবেদনগুলো সময়মতো জমা পড়ত এবং যারা দোষী, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হতো। যেহেতু তা হয়নি, তাই এতদিন ধরে মানুষের যে ধারণা ছিল, সেটাই আবার প্রমাণিত হয়েছে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নিরীক্ষা ও অনিয়ম তদন্তের দায়িত্বপ্রাপ্ত এই প্রতিষ্ঠানের অনেক কর্মকর্তার বিরুদ্ধেই রয়েছে বিস্তর অভিযোগ। তদন্ত হয়, প্রমাণও পাওয়া যায়; কিন্তু তেমন কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হলে সবার আগে পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরকে জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে।
শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তাদের মূল কাজ পাঠদান করা। অথচ সেই কাজ বাদ দিয়ে তারা মরিয়া হয়ে ওঠেন ডিআইএতে দায়িত্ব পেতে। কারণ, সেখানে পদায়ন মানেই কোটিপতি হওয়া। তৃণমূল পর্যায়ের শিক্ষকদের নানা অনিয়মের সুযোগ নিয়ে ব্ল্যাকমেইল করেন ডিআইএর পরিদর্শকরা। শিক্ষকদের সার্টিফিকেটসহ নানা জালিয়াতির ধরন বুঝে ঠিক হয় ঘুষ এককালীন নেওয়া হবে, নাকি কিস্তিতে। কম জালিয়াতি হলে এক মাসের এমপিওর সমান, বেশি হলে আরও বেশি। অনিয়ম না করলেও কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানের সব শিক্ষক-কর্মচারীর এক মাসের বেতনের সমপরিমাণ টাকা ঘুষ নেওয়ার নজির রয়েছে। দপ্তরটির মূল কাজ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক, নিয়োগ এবং আর্থিক বিষয়াদি নিরীক্ষা। জাল সনদ ধরাও তাদের কাজ। নিয়োগ ও জাল সনদ ধরার দিকেই পরিদর্শকরা বেশি মনোযোগী। কারণ, এখানে অনিয়ম এবং ঘুষের হার বেশি। গত এক দশকে ডিআইএতে এমন ১০ সহস্রাধিক ফাইলের সন্ধান মিলেছে, যেখানে ব্ল্যাকমেইল করে টাকা আদায় করতেন ডিআইএ কর্মকর্তারা। আটকে থাকা প্রতিবেদন জমা দিতে ৪০ পরিদর্শককে গত ২০ আগস্ট চিঠি দেওয়া হয়েছে।
