বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের প্রেক্ষাপট পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সাধারণ মানুষের আস্থা অর্জনের প্রধান শর্ত হলো আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, মতপ্রকাশের অবাধ স্বাধীনতা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকর সংস্কার। সুদীর্ঘ সময় ধরে এ দেশের জনগণ শাসনের নামে ক্ষমতার অপব্যবহার, দলীয়করণ এবং বাকস্বাধীনতার রুদ্ধদশা প্রত্যক্ষ করেছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের ক্ষমতার মসনদে যে গুণগত ও প্রথাভাঙা পরিবর্তন এসেছে, তা দেশবাসীকে এক নতুন ভোরের প্রত্যাশা দেখাচ্ছে। দেশনায়ক তারেক রহমানের রাষ্ট্রপরিচালনা ও নীতিনির্ধারণী পদক্ষেপগুলোর দিকে নজর দিলে স্পষ্ট হয়ে ওঠে-তিনি কেবল মুখের কথায় বা রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নন; বরং কাজের মাধ্যমে, নিজের নেওয়া একের পর এক নজিরবিহীন সিদ্ধান্ত দিয়ে প্রমাণ করছেন যে তিনি সত্যিই এক নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির সূচনা করতে চান।
স্বাধীনতার ঘোষক, মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক এবং এ দেশের কোটি মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নেওয়া নন্দিত রাষ্ট্রনায়ক শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এবং আপসহীন গণতন্ত্রের প্রতীক, সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সুযোগ্য সন্তান হলেন তারেক রহমান। যোগ্য পিতামাতার যোগ্য উত্তরসূরি হিসেবে ঐতিহ্য ও অভিজ্ঞতার মেলবন্ধনে গঠিত তারেক রহমানের নেতৃত্বের দিকে আজ বাংলাদেশের ১৮ কোটি মানুষ আশার বুক বেঁধে তাকিয়ে আছে। বহু সংকট, চ্যালেঞ্জ এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতার মধ্যেও দেশের মানুষ বিশ্বাস করে, তারেক রহমানের দূরদর্শী ও সংস্কারমুখী নেতৃত্বই পারবে তার পিতার স্বপ্নের এক স্বনির্ভর, উন্নত, সাম্য ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তুলতে।
ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকেই তারেক রহমান যে নতুন ধারার রাজনীতির চর্চা শুরু করেছেন, তার সবচেয়ে উজ্জ্বল ও সাহসী দিকটি প্রকাশ পেয়েছে ‘আইনের শাসন’ প্রতিষ্ঠায় তার জিরো টলারেন্স নীতিতে। বাংলাদেশে রাজনৈতিক সংস্কৃতির একটি দীর্ঘদিনের বদভ্যাস ছিল নিজের দলের বা অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের অপরাধ ঢেকে রাখা বা তাদের বিচারহীনতার সুবিধা দেওয়া। কিন্তু তারেক রহমান সেই পুরনো ব্যাধিকে গোঁড়া থেকে উপড়ে ফেলার সাহসী পদক্ষেপ নিয়েছেন। সম্প্রতি মিরপুরের রাড্ডা স্বাস্থ্য কেন্দ্রে অনাকাঙ্ক্ষিত হামলার ঘটনায় তিনি যেভাবে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছেন, তা বাংলাদেশের ইতিহাসে অত্যন্ত বিরল। দলীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে নিজ দলের সংসদ সদস্যকে (এমপি) পদচ্যুত করতে তিনি বিন্দুমাত্র দ্বিধা করেননি। একই সাথে উক্ত ঘটনার সাথে জড়িত সব নেতাকর্মীকে তাৎক্ষণিক গ্রেফতার এবং আইনের আওতায় আনার নির্দেশ দিয়েছেন। এর মাধ্যমে তিনি বিশ্ব দরবারে ও দেশবাসীর কাছে সুস্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন-আইনের চোখে সবাই সমান, পদ কিংবা রাজনৈতিক দল কোনো অপরাধীর ঢাল হতে পারে না।
একইভাবে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষায় তিনি যে উদারতা ও গণতান্ত্রিক মানসিকতার পরিচয় দিয়েছেন, তা সত্যিই নজিরবিহীন ও প্রশংসনীয়। সম্প্রতি একজন প্রাথমিক বিদ্যালয় শিক্ষক জাতিসংঘে প্রদত্ত তারেক রহমানের বক্তব্যের কঠোর সমালোচনা করেছিলেন। এর জেরে স্থানীয় পুলিশ উক্ত শিক্ষককে গ্রেফতার করলে বিষয়টি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নজরে আসে। ঘটনাটি শোনামাত্রই তিনি গভীর উদ্বেগ ও ক্ষোভ প্রকাশ করেন এবং অনতিবিলম্বে সেই শিক্ষককে মুক্তি দিয়ে সম্পূর্ণ সসম্মানে বাড়িতে পৌঁছে দেওয়ার কঠোর নির্দেশ দেন। ক্ষমতার শীর্ষ পদে বসে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ কিংবা আমজনতার সমালোচনাকে পরম সহনশীলতার সাথে গ্রহণ করার এই মানসিকতা কেবল একজন প্রকৃত বিশ্বমানের ও প্রজ্ঞাবান রাষ্ট্রনায়কের পক্ষেই সম্ভব। এতে প্রমাণিত হয়েছে, তার শাসনামলে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা কোনো অলঙ্কার নয়, বরং এটি নাগরিকদের মৌলিক অধিকার হিসেবে পুরোপুরি সুরক্ষিত।
রাষ্ট্রীয় খরচের লাগাম টানা এবং অপ্রয়োজনীয় অপচয় বন্ধে তিনি প্রথম দিন থেকেই কার্যকর ভূমিকা রেখে আসছেন। সরকারি আমলাতন্ত্র ও প্রটোকল সর্বস্ব রাজনীতির বাইরে এসে তিনি রাষ্ট্রীয় ব্যয়ে মিতব্যয়িতা অর্জনের এক চমৎকার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। রাষ্ট্রীয় অর্থকে জনগণের আমানত মনে করে তিনি প্রতিটি প্রকল্পে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করছেন এবং রাজনৈতিক আড়ম্বর কমিয়ে কাজের গতি বাড়ানোর ওপর জোর দিয়েছেন।
সম্প্রতি রাজধানী ঢাকার প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) আয়োজিত আন্তর্জাতিক সম্মেলন ‘বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন’-এ প্রধান অতিথি হিসেবে দেওয়া তার উদ্বোধনী বক্তব্যটি ছিল তার বিশ্বমানের রাষ্ট্রদর্শন ও প্রজ্ঞার এক উজ্জ্বল দলিল। বিশ্বের ১০০টিরও বেশি দেশের প্রায় দেড় হাজার প্রতিনিধি, ২০০ জন আন্তর্জাতিক বক্তা এবং সার্বিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট বরিস তাদিচ, মালির সাবেক প্রধানমন্ত্রী মুসা মারা ও মালদ্বীপের সাবেক প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ নাশিদের মতো হেভিওয়েট বিশ্বনেতাদের উপস্থিতিতে তিনি যে গতিশীল দিকনির্দেশনা দিয়েছেন, তা প্রশংসিত হয়েছে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও। ‘পুনর্লিখিত এক বিশ্বে ক্ষমতা, প্রযুক্তি ও আস্থার নতুন পথচলা’ (Fragments, Frontiers, Futures: Navigating Power, Technology and Trust in a World Rewritten) প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে তিনি অত্যন্ত সুনির্দিষ্টভাবে বাংলাদেশের আগামীর রূপরেখা তুলে ধরেন।
সম্মেলনে তিনি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন, ‘উন্নয়নের জন্য শক্তিশালী রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান অপরিহার্য। মানবাধিকার, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সুরক্ষার পাশাপাশি আইনের শাসন সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য হতে হবে। আমরা এমন একটি প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতি গড়ে তুলব, যেখানে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো সত্যিকার অর্থেই বাংলাদেশের জনগণের সেবায় নিয়োজিত থাকবে।’
তাঁর এই বক্তব্য কেবল সুন্দর কথা নয়, এটি বাস্তবায়নের জন্য সরকারের ৫ বছর মেয়াদি সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা ইতিমধ্যেই প্রণীত হয়েছে। জাতীয় স্বার্থ সুরক্ষা, নীতিমালার ধারাবাহিকতা বজায় রাখা, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা আনয়ন এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের মাধ্যমে প্রতিশ্রুতিকে বাস্তবতায় রূপ দিতে তিনি দিনরাত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন। বিশেষ করে গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার মাধ্যমে দেশকে স্বাবলম্বী করার যে দূরদর্শী চিন্তাভাবনা তিনি উপস্থাপন করেছেন, তা এ দেশের সাধারণ মানুষের ভাগ্যোন্নয়নে মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করবে।
জনগণের দোরগোড়ায় আধুনিক ও বৈষম্যহীন সরকারি সেবা পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে তার প্রবর্তিত সংস্কারমূলক পদক্ষেপগুলো অত্যন্ত যুগান্তকারী। সরকারের ‘ফ্যামিলি কার্ড’, ‘কৃষক কার্ড’ এবং ‘হেলথ কার্ড’-এর উদ্যোগ ইতিমধ্যেই দেশের প্রান্তিক জনগণের কাছে নতুন আশার সঞ্চার করেছে। শুধু তা-ই নয়, ভবিষ্যৎ বাংলাদেশকে প্রযুক্তিনির্ভর ও এক ছাতার নিচে নিয়ে আসতে তিনি ‘ইউনিভার্সেল কার্ড’-এর পরিকল্পনা করেছেন, যার মাধ্যমে একজন নাগরিক খুব সহজেই সমন্বিত সকল সরকারি সেবা গ্রহণ করতে পারবেন। এই ধরনের আধুনিক প্রযুক্তিভিত্তিক সেবা প্রদান ব্যবস্থা কেবল প্রশাসনিক জটিলতা ও দুর্নীতিই কমাবে না, বরং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে বহুগুণ সহজ করে তুলবে। এ ব্যাপারে আমার নূন্যতম সন্দেহ নেই।
অন্যদিকে আন্তর্জাতিক নীতি ও মানবাধিকার রক্ষায় তারেক রহমানের পররাষ্ট্রনীতিও অত্যন্ত সুদৃঢ় ও দূরদর্শী। বে অব বেঙ্গল কনভারসেশনে বাংলাদেশে অবস্থানরত প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীর মানবিক সংকটের কথা তুলে ধরে তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান। মানবিক কারণে এই বিশাল সংকট বাংলাদেশ বহন করলেও, এর স্থায়ী ও সম্মানজনক সমাধানের জন্য আন্তর্জাতিক অর্থায়ন ও সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক সহযোগিতার তাগিদ দিয়েছেন তিনি। তিনি বিশ্ববাসীকে অনুধাবন করিয়েছেন যে, রোহিঙ্গা সংকটের মূল উৎপত্তিস্থল মিয়ানমারে, সুতরাং এর টেকসই ও সঠিক সমাধানও হতে হবে মিয়ানমারেই।
তারেক রহমান ক্ষমতার মোহে নয়, বরং রাষ্ট্র গঠনের ও জনগণের কল্যাণের মহান ব্রত নিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। তিনি প্রথাগত রাজনীতির গণ্ডি ভেঙে এমন এক প্রশাসনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতি গড়ে তুলছেন, যেখানে থাকবে না রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, থাকবে না প্রশাসনিক নিপীড়ন কিংবা বাকস্বাধীনতা হরণের চেষ্টা। প্রশাসনিক সংস্কারে তার গ্রহণ করা প্রতিটি পদক্ষেপ বাস্তবায়নের মুখে এবং তার দূরদর্শী দৃষ্টিভঙ্গি বাংলাদেশকে বিশ্ব মানচিত্রে এক উন্নত, আত্মমর্যাদাশীল ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে সাহায্য করছে।
পরিশেষে বলতে চাই, আমাদের সংকট শতভাগ কেটে যায়নি, পথ চলাটাও খুব সহজ নয়; কিন্তু যে রাষ্ট্রনায়ক নিজের প্রজ্ঞা, সততা, উদারতা এবং কঠোর সিদ্ধান্তের মাধ্যমে প্রতি পদে নিজেকে জনগণের প্রকৃত সেবক হিসেবে প্রমাণ করেন-তার হাতেই দেশের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত। ১৮ কোটি মানুষের আশার প্রতীক, রাষ্ট্রনায়ক তারেক রহমানের হাত ধরেই বাস্তবায়িত হবে শহীদ জিয়ার স্বপ্নের সোনার বাংলা এবং বেগম খালেদা জিয়ার লালিত অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক সমৃদ্ধ বাংলাদেশের স্বপ্ন-এ বিশ্বাস আজ দেশের প্রতিটি নাগরিকের মনে সুদৃঢ় রূপ নিয়েছে। মহান আল্লাহ সুবহানাতায়ালা আমাদের সহায় হোন।
লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সম্পাদক, আমার দিন
ই-মেইল: [email protected]
