ব্যাংক ও শেয়ার বাজারে পুরোপুরি আস্থা না ফেরায় নিরাপদ বিনিয়োগের মাধ্যম হিসেবে সঞ্চয়পত্রের দিকে ঝুঁকছেন বিনিয়োগকারীদের একটি অংশ। চলতি অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ের বিক্রিতে এর প্রতিফলন দেখা গেছে। এ মাসে নতুন সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছে ২ হাজার ৫৯ কোটি ৪৭ লাখ টাকা। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় যা প্রায় ৫৯ শতাংশ বেশি। আর ২০২৫-২৬ অর্থবছরের পুরো সময়ের নিট বিক্রির তুলনায় জুলাইয়ের বিক্রি প্রায় পাঁচ গুণ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জুলাইয়ে নিট সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছিল ১ হাজার ২৯৩ কোটি ৪৮ লাখ টাকা। আর গত অর্থবছরের পুরো সময়ে নিট বিক্রির পরিমাণ ছিল মাত্র ৪৩৬ কোটি টাকা। অর্থাৎ গত অর্থবছরের ১২ মাসে যে পরিমাণ নিট সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছে, নতন অর্থবছরের প্রথম মাসেই তার কয়েক গুণ বেশি বিক্রি হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে, জুলাইয়ে নিট বিক্রির প্রবৃদ্ধি ছিল ৫৯ দশমিক ২২ শতাংশ।
একক মাস হিসেবে গত চার বছরের মধ্যে জুলাইয়ের এই নিট বিক্রি সর্বোচ্চ। এর আগে ২022 সালের ফেব্রুয়ারিতে ২ হাজার ৫২৩ কোটি টাকার নিট সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছিল। এরপর আর কোনো মাসে নিট বিক্রি ২ হাজার কোটি টাকা ছাড়ায়নি। বরং পরবর্তী সময়ে বেশির ভাগ মাসেই নিট বিক্রি ছিল ঋণাত্মক। অর্থাৎ নতুন সঞ্চয়পত্র বিক্রি থেকে যত অর্থ এসেছে, তার চেয়ে বেশি অর্থ পুরোনো সঞ্চয়পত্রের আসল ও মুনাফা পরিশোধে চলে গেছে।
এর আগে টানা তিন অর্থবছরেও একই প্রবণতা দেখা যায়। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে নিট বিক্রি ছিল ঋণাত্মক ২১ হাজার ১২৪ কোটি টাকা। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ঋণাত্মক ছিল ৬ হাজার ৬৩ কোটি টাকা। আর ২০২৫-২৬ অর্থবছরে পরিস্থিতির কিছুটা পরিবর্তন হলেও নিট বিক্রি দাঁড়ায় মাত্র ৪৩৬ কোটি টাকা। ফলে জুলাইয়ের বিক্রি আগের কয়েক বছরের প্রবণতা থেকে বড় ধরনের বিচ্যুতি হিসেবে দেখা যাচ্ছে।
অর্থনীতিবিদেরা বলছেন, ব্যাংকে আমানতের সুদ কিছুটা বাড়লেও ব্যাংক খাতের প্রতি মানুষের আস্থা পুরোপুরি ফেরেনি। অন্যদিকে শেয়ার বাজারেও দীর্ঘদিন ধরে অনিশ্চয়তা রয়েছে। ফলে তুলনামূলক নিরাপদ এবং নির্দিষ্ট মুনাফার বিনিয়োগ মাধ্যম হিসেবে সঞ্চয়পত্রের প্রতি আগ্রহ বাড়তে পারে। এর সঙ্গে সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার কমে যেতে পারে—এমন আশঙ্কায় কেউ কেউ আগেভাগে বিনিয়োগ করে থাকতে পারেন। জানতে চাইলে ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশ (আইসিবি)'র চেয়ারম্যান অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আবু আহমেদ ইত্তেফাককে বলেন, ব্যাংক
খাতে মানুষের আস্থার সংকট এখনো পুরোপুরি কাটেনি। মূল্যস্ফীতির চাপে সীমিত সঞ্চয়কে তুলনামূলক নিরাপদ জায়গায় রাখতে অনেকেই সঞ্চয়পত্র বেছে নিচ্ছেন। তার মতে, মূলধন সুরক্ষার নিশ্চয়তা, প্রয়োজনের সময় নগদায়নের সুযোগ এবং তুলনামূলক ভালো মুনাফার কারণে সঞ্চয়পত্র বিনিয়োগকারীদের কাছে আকর্ষণ ধরে রেখেছে।
তথ্যমতে, সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হারও আপাতত বিনিয়োগকারীদের পক্ষে স্থিতিশীল রয়েছে। সরকার চলতি বছরের জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সব ধরনের জাতীয় সঞ্চয়পত্রের বিদ্যমান মুনাফার হার অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বর্তমানে পাঁচ বছর মেয়াদি বাংলাদেশ সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগের পরিমাণভেদে সর্বোচ্চ মুনাফার হার ১১ দশমিক ৮৩ শতাংশ। তিন মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্রে সর্বোচ্চ ১১ দশমিক ৮২ শতাংশ, পরিবার সঞ্চয়পত্রে ১১ দশমিক ৯৩ শতাংশ এবং পেনশনার সঞ্চয়পত্রে ১১ দশমিক ৯৮ শতাংশ পর্যন্ত মুনাফা পাওয়া যাচ্ছে।
জুলাই শেষে সঞ্চয়পত্রে সরকারের ঋণস্থিতিও বেড়েছে। জুনে ৩ লাখ ৩৪ হাজার ২ কোটি ৩৫ লাখ টাকা থেকে জুলাইয়ে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩ লাখ ৩৬ হাজার ৬২ কোটি টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যেও জুলাই শেষে স্থিতি ৩ লাখ ৩৬ হাজার কোটি টাকার বেশি দেখানো হয়েছে।
